ঢাকা | সোমবার ২ আগস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮, ২২ জিলহজ ১৪৪২

আমাদের সাদা-কালো ঈদ

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

প্রকাশনার সময়: ২০ জুলাই ২০২১, ০০:০০ | আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ০৩:১৫

বন্ধুদের ঈদের জামা কেনা শেষ। অথচ আমারটা তখনো কেনাই হয়নি। আব্বা বোনাস পাবেন তারপর কেনা হবে। এ ঘর ও ঘর ঘুরি। ভাবছি আমার জামাটা কেমন হবে! ছোট মেয়ে হওয়ায় ছোটবেলায় ঈদে পছন্দ করে জামা কেনায় আমার কোনো স্বাধীনতা ছিল না। বড় আপু আর আম্মার পছন্দ মতো জামা পরতে হতো।

একবার ঈদে জেদ করে কিনতে গিয়েছিলাম। নিয়ে এসেছিলাম কটকটে কমলা রঙের জামা। আব্বা ছাড়া সবাই হেসেছিল। সেই শেষ। ওরা সবসময় পরাত ফ্রক, স্কার্ট আর জুতা। আমার তখন প্রচ- রাগ হতো। আহা দোকানে কি সুন্দর সুন্দর দুই ফিতের স্যান্ডেল। না, ওগুলো পড়া যাবে না। পা বড় হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে আমি জুতা পায়ে ঘুরি। ঘনিয়ে আসছে ঈদের দিন। তখনো কাপড় কেনা হয়নি। উসখুস করে মন। আব্বা বোনাস পেলেন। মার্কেটে গেলেন আম্মাকে সঙ্গে নিয়ে। আমরা ৫ ভাই-বোন। সঙ্গে দুজন সাহায্যকারী মেয়েসহ মোট ৭ জনের জামা কেনা কম কথা নয়! রাতে বাসায় ফিরে আম্মা বসলেন কাঁচি কাপড় আর সেলাই মেশিন নিয়ে। আমার আর মেজ বোনের একইরকম ডিজাইন।

আমার এখনো মনে আছে জামার পুরো রং ছিল খয়েরি তার ভিতর ছোট ছোট ফুল। আম্মা কারটা আগে বানাবে। ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা। মেজ আপুর ভাবটা ছিল আমিই বড় আমারটা আগে। তাই সই! ছোট ছোট পায়ে এ ঘর ওই ঘর ঘুরি আমি। একটু কাপড়ের টুকরো নেই পুতুলের জামা বানানোর জন্য। আম্মা একবার মেশিনে বসে সেলাই করে। কিছুক্ষণ পর উঠে যেয়ে সেমাই রান্না করেন। রাত বাড়তে থাকে। আমার জামা তখনো সেলাই করা হয়নি। কখন হবে কখন পড়ব। মেজ আপুর জামার ফ্লিল বাঁকা হয়েছে, আবার খুলতে হবে। আম্মা সুই নিয়ে খুলতে বসলেন। বড় আপু ওর সালোয়ার কামিজ আয়রন করে। কাল পড়বে। বড় আর ছোট ভাইটা বারবার নেড়ে চেড়ে দেখে ওদের ঈদের শার্ট-প্যান্ট। শুধু আমারই কিছু নেই। ঘুর ঘুর করি আম্মার পেছন পেছন। আম্মা হাসেন তোমারটাও হবে। রাত বাড়তে থাকে। এবার আম্মা ধরেন আমার জামা। আমি সেলাই মেশিনের গা ঘেঁষে বসে থাকি। একটুও কাপড় যেন বাইরে না যায়। কাউকে দেখানো যাবে না। তাহলেই ঈদ শেষ।

পাশের বাসার আব্বার সহকর্মীর মেয়ে সালমা মেহেদী হাতে উঁকি দেয়। দৌড়ে যাই। দেখতে দেয়া যাবে না। ফ্লিল লাগানো হয়ে গেছে। আম্মা একমনে মেশিনে কাজ করে যাচ্ছেন। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ আর ভেতরে মেশিনের ঘরঘর শব্দ। কোনটা যে প্রিয় তা আজও বুঝি না।

পরদিন ঈদ। ধীরে ধীরে ফর্সা হচ্ছে আকাশ। আম্মারও দুটো জামা বানানো শেষ। আমরা দু’বোন এরই ফাঁকে ঘুমিয়ে আবার উঠেও পড়েছি। আম্মা ঘুমাননি। সারারাত জামা বানিয়েছেন। ফাঁকে ফাঁকে কখন রোস্ট আর সেমাই বানিয়েছেন তার অনেক কিছুই টের পাইনি। আজ পাই। মনে হলে বুকের ভেতর কেমন টনটন করে উঠে। নতুন জামা আমাদের পরিয়ে সেলাই মেশিন সরিয়ে রাখেন। উঠে যান রান্না ঘরে। লুচি বানাবেন।

ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে খেয়ে যাবেন আব্বা ভাইয়ারা। ওরা নামাজে চলে গেলে ¯œানে যেয়ে নতুন কেনা লাক্স সাবানের মোড়ক যখন খুলি তখন এর গন্ধে মনে হয় আজ সত্যি ঈদের দিন। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! হৈহৈ করতে করতে ক্যাম্পাসের সব ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে যায়।

সারা গায়ে মায়ের ভালোবাসার ছোঁয়া। এখন কত মার্কেট, কত ঝলমলে আলো। চাইলে আমাদের ছেলেমেয়েদের ৫-৬টা জামা যখন-তখন কিনে দেই। ঈদে অনেক জামাও পাই। কিন্তু ময়মনসিংহ টিচার্স টেনিং কলেজ ক্যাম্পাসে থাকা সেই ছোটবেলায় সারারাত জেগে মার হাতে তৈরি করা জামা মনে হয় এখনো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ঈদের জামা। তাই এখনো ঈদে বোনাস, সেলাই মেশিনের শব্দ আর লাক্স সাবানের গন্ধ বাতাসে ভেসে এলে মনটা কেমন করে উঠে। একবার আম্মাকে প্রশ্ন করলাম তোমার ঈদ কেমন ছিল। নানিও কি তোমার জন্য রাত জেগে জামা বানাতো?

আম্মা হাসলেন। ফিরে গেলাম আমরা দু’জনই ১৯৫৩ সালে। আম্মা পড়তেন তখন ক্লাস টুতে। বললেন, ঈদের সময় আম্মাসহ আরো দু’বোনকে পরতে হতো ছেলেদের সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি। পাড়ার দর্জি বানাতো সেটা। চুল কাটা হতো ছেলেদের মতো করে।

কারণ আম্মার তখন কোনো ভাই ছিল না। নানা-নানি তাদের ছেলেদের মতো পোশাক পরাতেন। তখন ছোটরা স্যান্ডেল পরত না। সান্ডেল পরে বড়দের সামনে গেলে অসম্মান করা হতো বলে মনে করা হতো। শুধু ঈদের দিন স্যান্ডেল পরতে পারত ছোটরা। তো পাঞ্জাবি-পায়জামা আর জুতা পড়ে আম্মা আর দুই বোন নানার সঙ্গে যেতেন ঈদের মাঠে।

এরপর ফিরে এসে খেতেন সেমাই-পায়েস। পরে ট্রেতে করে সেমাই-পায়েস নিয়ে যেতেন বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি। খাবার ঢাকা থাকত কুরুস কাজ করা ঢাকনা দিয়ে। হিন্দু-মুসলিম সব বাড়িতে সেসব খাবার দিতে হতো। যখন ক্লাস থ্রি, তখন একদিন কান্নাকাটি করলেন ৩ বোন মিলে। তারা ফ্রক পরতে চান। সেই প্রথম ঈদে তাদের কিনে দেয়া হলো ফ্রক। পায়জামা-পাঞ্জাবি থেকে মুক্ত হলেন আমার মা আর খালারা। বলতে বলতে আম্মার চোখ ঝলমল করে ওঠে। যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন তার মা রান্না করছেন। সারা বাড়িজুড়ে উৎসব। অতিথি আসছে-যাচ্ছে।

নানা হেডমাস্টার হওয়াতে প্রচুর ছাত্র ছিল তার। যেমনটা ছিল আমার মা-বাবার বাড়িতে। কি অদ্ভুত মিল আমার আর আমার মার জীবনে। সারাজীবন আমরা দেখলাম বাড়ি ভর্তি অতিথি! তবু কখনো কাউকে বিরক্ত হতে দেখিনি! শুনলাম নানা কোনো দিন গরু কোরবানি দেননি। তার বাড়ির আশপাশে সব হিন্দু পরিবার ছিল। তাদের অসম্মান হবে ভেবে উনি সবসময় খাসি কোরবানি দিতেন। এখন এ বিষয়গুলো নিয়ে কি আমরা ভাবি? নানান স্বার্থপর ধুসর ভাবনা এখন আমাদের! আমাদের সঙ্গে ঈদ নাকি তোমার ছোটবেলার ঈদ কোনটা প্রিয়? বলতেই হেসে উঠলেন আম্মা। থেমে বললেন, আমার ছোটবেলার ঈদ! মার হাতে রাঁধা পায়েস-পোলাও মনে পড়ে খুব! একটু কি ঈর্ষা হলো আমার! আমি কী শুনতে চেয়েছিলাম তার সন্তানদের সঙ্গে কাটানো

ঈদ তার বেশি প্রিয় হবে! জানি না। এখনকার ঈদের মতো আগের ঈদ হয়তো অত রঙিন নয়, তবে বুঝলাম আমার আর আমার মার দু’জনেরই প্রিয় আমাদের সাদা-কালো ঈদ। দু’জনেই খুঁজে ফিরি তালপাতার বাঁশির সুর, লাক্স সাবান, কুরুসের কাজ করা নকশা, ঢাকনা কিংবা কোনো এক আতর সুরমার গন্ধ!

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এই পাতার আরও খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x