ঢাকা | বৃহস্পতিবার ৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮, ২৫ জিলহজ ১৪৪২

অস্তিত্ব সংকট নিরসনে করোনাকে নয়, লকডাউনকে ভয় পায়!

সাইফুল ইসলাম সায়েম

প্রকাশনার সময়: ০৬ জুলাই ২০২১, ১৬:২৮ | আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২১, ১৬:৫৪
নিজস্ব ছবি

বাংলাদেশ বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রকোপের তীব্রতম আঘাতের মধ্যে রয়েছে। দেশে দৈনিক করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা তিন ডিজিটে পদোন্নতি পেয়েছে। করোনা পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতি হওয়ার কারণে সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বলা হয়েছে, যারা বিধিনিষেধ মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিন্তু এই লকডাউনে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করা মানুষগুলোর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে অসহায়ত্বের ছাপ। ছাপটি করোনায় আক্রান্ত হবার নয়, সরকার কর্তৃক প্রদত্ত লকডাইনের ভয়; অস্তিত্ব বিপর্যস্ত হবার ভয়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের এবং রেল স্টেশন, বাস স্টেশন, রাস্তার পাশে বসবাস করা মানুষগুলোর চোখে-মুখে এমন দৃশ্যটির দেখা মিলেছে।

ভ্রমণ পিপাসু লোক হওয়ায় দেশের বিভিন্ন নগর ও মফস্বলে পদচারণা হয়ে থাকে। কিছুদিন আগে পাহাড়ের দেশ সিলেট ভ্রমণ শেষে ব্যস্ত নগরী ঢাকাতে আসা। কিন্তু ঢাকায় এসে কঠোর লকডাউনে ঘরবন্দি হয়ে পড়া। কিন্তু ভ্রমণ পিপাসু মানুষ হওয়ায় ঘরবন্দি হয়ে থাকা যে বড় দায়, তাই সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনকে তোয়াক্কা না করেই বের হয়ে গেলাম ব্যস্ত শহরের অলিগলিতে। সে সময় কথা বলার সুযোগ হয়েছিল উদ্বাস্তু জীবনযাপন করা কিছু মানুষ সাথে।

রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে সবুজ নামক এক যুবকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল। বয়স আনুমানিক ১৫-১৬ কোঠায়। কুলির কাজ করেন। যাত্রীদের মালামাল নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁচ্ছে দিয়ে যা আয় হতো তা দিয়ে পেট চালায়। ছেলেটি শুনিয়েছেন তার করুণ আর্তনাদের কথা। বলেছিলো, কয়েকদিন ধরে দূরপাল্লার বাস না চলায় পকেটে কোন টাকা নেই তার। সারাদিন ঘুরে ফিরে সময় পার করছে সে। বলতে গেলে এই কয়েকদিন না খেয়েই দিন পার করতেছে সে। তার কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, অস্তিত্ব সংকটে ফেলার জন্য লকডাউন যেনো তার কাছে কালজয়ী অভিশাপ।

যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার নিচে কথা হয় ৬০ বছর বয়সী নারী ফাতেমা বেগমের সঙ্গে। তার কাছে করোনা নয়, লকডাউনই গরিবের মৃত্যুর কারণ হবে। তিনি জানান, ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন পার করেন। চলমান লকডাউনে সাধারণ মানুষ ঘর হতে বের হতে না পারায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিক্রম হওয়ার পরেও তার মিলছেনা কোনো সাহায্য। ফলে জীবনের অস্তিত্ব রক্ষায় সংকটে তিনি।

অন্যদিকে সমাজের বসবাসরত নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো রয়েছে লকডাইন নিয়ে ঢের অভিযোগ। তাদের অভিযোগ, করোনা থেকেও লকডাউনকে বেশি ভয় পায় তারা।‌ কারন হিসেবে বিবেচিত করা যায়, লকডাউন এলে খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পায়। যা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন পরিচালনায় বা অস্তিত্ব রক্ষায় ক্ষেত্রে সহজলভ্য নয়।

বর্তমান এমন পরিস্থিতি যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে তাহলে বড় ধরনের দূর্যোগ নেমে আসবে জনসাধারণের অস্তিত্ব রক্ষায় ক্ষেত্রে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে একটা অস্বাভাবিক জীবনযাপন করা মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। মানুষ যদি অবাধে চলাফেরা করতে না পারে, কাজ করতে না পারে, তাহলে একটা সময় এই মানুষগুলির বেঁচে থাকার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। সবকিছু বন্ধ রেখে মানুষকে ঘরের মধ্যে রাখতে পারলে হয়তো কিছু লোক এই মারামারীতে মারা যেতে পারে, কিন্তু তার থেকেও ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু কোলে ঢলে পরবে নিম্ন আয়ের ও উদ্বাস্তু জীবনযাপন করা হাজারো মানুষগুলি। ধারণা করা যায়, এই লকডাউন অনেকদিন বহাল রাখলে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।

তবে এই লকডাউনকে ঘিরে যে সংকটটি ঘনীভূত হচ্ছে তা হলো জীবন ও জীবিকার সংকট। এ যেনো জলে কুমির ডাঙায় বাঘের মতো অবস্থা। একটি শিথিল করলে অপরটি অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। জীবন বাঁচাতে গেলে মানুষ জীবিকা সংকটে ভুগছে আবার জীবিকার প্রতি নজর দিলে মানুষের জীবন হুমকির মুখে চলে যাচ্ছে।

সর্বোপরি মনে রাখতে হবে, জীবন ও জীবিকার এই কঠিন বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই। জীবন ও জীবিকা দুটিই আমাদের কাছে সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটোই আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কোনো একটির ক্ষেত্রেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। তাই স্বাস্থ্যবিধি মনে চলার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ছাড় নিঃসন্দেহে আমাদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে।

সাইফুল ইসলাম সায়েম সাংবাদিক ও লেখক

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এই পাতার আরও খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x