ঢাকা | শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

প্রথম প্রেমই শ্রেষ্ঠ প্রেম, এ কথা সঠিক নয়

সহস্র সুমন
প্রকাশনার সময়: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:৫৫ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:১১

রাহাত ঢাকার একখানা মদ্যশালা হইতে রাত্রি এগারোটার দিকে বাহির হইলো। পকেটে আর মোটে একশত কুড়ি টাকা অবশিষ্ট রহিয়াছে। মাসের বেতন যাহা পায় তাহার বেশিরভাগ এখন মদ্যশালায় চলিয়া যায়। জীবনে সুখ নাই, শান্তি নাই, কোন গোছালো ভাব নাই। সংসার বলিয়া কিছু নাই, প্রেম নাই, একান্ত ব্যক্তিগত আপন বলিয়া কেহ নাই তাহার। কেহ তাহার ব্যথা বুঝিতে চায় না, কেহ তাহার সাথে সুখের স্বপ্ন দেখিতে চায় না। অঘোরে বেঘোরে এক হতাশার জীবনের দিকে ক্রমশই অগ্রগামী হইতেছে সে, এটা নিজেও অনুধাবন করিতে পারে। তাই নেশায় বুদ হইয়া থাকিতে খারাপ লাগে না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা খুব স্মরণে আসে। কোন দুশ্চিন্তা ছিল না। বন্ধুর অভাব ছিল না। সারাদিন অনর্গল কথা হইতো। আর এখন কথা বলিবার জন্য লোক ভাড়া করিবার দশা। তখন জীবনের যৌবন ছিল, বয়সেরও যৌবন ছিল। প্রেম ছিল, প্রেম করিবার উদ্দিপনা ছিল। সুবর্ণা নামে এক মেয়ের সাথে চঞ্চলা প্রকৃতির ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে তাহাদের প্রেম পাকাপোক্ত হয়। এখানে-ওখানে ঘুরিতে যাওয়া, বাহিরে রেস্টুরেন্টে এটা সেটা খাইতে যাওয়া তখন চলিত। মাঝে মাঝে কি জানি লইয়া মান অভিমান হইলে একদিন দুদিন যোগাযোগ বন্ধ করিয়া দুজনই থাকিতো নিজেদের মতো। কিন্তু নিজেদের মত কি আর থাকা হইতো! বারে বারে মনে হইতো একটু তাহাকে ডাকি, একটু তাহার হোস্টেলের সামনে গিয়া চুপিসারে তাহাকে দেখিয়া আসি। থাকিয়া থাকিয়া মনে হইতো জানটা বাহির হইয়া যাইবে তাহার সাথে সম্পর্ক ঠিক না হইলে। প্রতি পলে পলে যাহারে মনে পড়ে, তাহারে কি ভোলা যায় অবাঞ্চিত ঘোরে? সুবর্ণাও তেমনই ভাবিত। কদিন পর মান অভিমান কমিলে একে অন্যকে পাইয়া কাঁদিয়া ভাসাইতো চোখ। মান অভিমান টিকিতো না কখনো। আইসবার্গের মত ভাঙ্গিয়া পড়িত লোনা জলে। মাস্টার্সে উঠিতে উঠিতে সুবর্ণা ভার্সিটিতে আসা বন্ধ করিলো। বন্ধ করিল ফোন ধরা। কথা বলা। কথা বলার লোক তখন হইতেই কমিতে লাগিলো। একদিন জানা গেলো সুবর্ণা আর লেখাপড়া করিবে না, পিতা মাতা তাহার বিবাহ দিয়াছে।

খবর শুনিয়া রাহাত বারে বারে সুবর্ণাকে ফোন করিতে থাকে। ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কি করিবে, কোথায় যাইবে, কাহাকে বলিবে মাথায় কিছুই আসে না ওর। কোথাও যাইতে ভালো লাগে না, কিছু খাইতে ভালো লাগে না। এক মুহূর্তে সব কেমন অর্থহীন হইয়া পড়িল। সিগারেটের ওপর সিগারেট চলিতে থাকে। বন্ধুদের সাথে হতাশায় গাজা-মদও খাইলো কদিন। রাতের বেলা বসিয়া নিজের হাত নিজেই ব্লেড দিয়া চিরিলো অহেতুক। কদিনের মধ্যে চেহারা বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি চলিয়া আসিলো। চোখ লাল, চোয়াল শক্ত, চুল ময়লা-জটা, দাত হলদে, মুখে গন্ধ। এভাবে দিন কাটিয়া গেলো, মাস কাটিলো। একদিন সুবর্ণার ফোন নাম্বার ভাসিয়া উঠিল রাহাতের ফোনে। কল দিচ্ছে সুবর্ণা। কি বলিবে রাহাত, শোকে পাথর হইবার প্রক্রিয়া গত এক মাসে পরিপূর্ণ রূপে সম্পন্ন হইয়াছে। এখন আর তাহার কিছু বলিবার নাই। রাহাত একবার ভাবিলো ফোন ধরিবে না। কিন্তু নিজেকে সে আটকাইতে পারিল না। ফোন ধরিয়া আস্তে করিয়া বলিল, হ্যালো।

ওপাশ থেকে নিস্তব্ধতা, মৌনতা। এ মৌনতা অর্থহীন ও নাটকীয় ঠেকিল রাহাতের কাছে। ও আবার বলিল, হ্যালো। স্তব্ধতা কাটিল না। রাহাত আর কথা বাড়াইলো না। ফোন কাটিয়া দিবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। কিন্তু হঠাৎই কান্নার ছটায় রাহাতের হৃদয় ভিজিলো। সুবর্ণা বলিল, "আমাকে মাফ করে দিও রাহাত। আমি খুব বড় অপরাধ করেছি।"

এমন দিনও রাহাতের জীবনে আসিবে সে ভাবে নাই কোন কালে। প্রেমিকার বিবাহের পরে সে যদি ক্ষমাপ্রার্থী হয়, ফোন করিয়া কান্নার ছটায় হৃদয় আদ্র করিতে চায় তাহলে সে অবস্থায় কি করিতে হয় বা কি বলিতে হয় তাহার জানা নাই। রাহাত চুপ করিয়া থাকে। সুবর্ণার কান্না বাড়ে, তবে কী সুখে নাই সুবর্ণা! একবার মনে হয় তুমী অসুখী হও এই আমি চাই।তোমার অসুখেই ক্ষয় হউক আমার অশান্তির। কিন্তু এসবও ন্যাকামি ও প্রলাপ মনে হয় ওর কাছে। এখন প্রতিশোধ পরায়ণ নয়, নির্লিপ্ত হইতে ইচ্ছে হয়। চরম অবহেলা নিয়ে ফোন কেটে দেয় রাহাত। যে কান্না সুবর্ণা কাঁদিতেছে তাহাতে রাহাতের হৃদয়ের কোন পরিবর্তন হইবে না, সুখ মিলিবে না। ওর চেয়ে অজস্র গুণ কান্না জমে আছে তার নিজের হৃদয়েই। সুবর্ণার স্মৃতি ভোলা যাইবে না কোনকালে, যে স্বপ্ন বুকে বাঁধিয়া একটি সুন্দর জীবন গঠন করিবার তাগিদে রাজ মিস্ত্রির মত কাজ করিতেছিল, সে স্পৃহাও আর আসিবে না। জীবনের বাকিটা সময় ধ্বংসস্তূপের পাশে বসিয়া মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করিয়া যাওয়া ভিন্ন অন্য কিছু মাথায় খেলিতেছে না। হুট করিয়া প্রেমে ব্যর্থতা নামিয়া আসিলে মাথা কেমন ফাকা ফাকা হইয়া যায়। ঘোর কাটে না, অসহায় ও নিঃসঙ্গ লাগে। এমনই ভাবে কাটিয়া যাইতে থাকে। উদ্দেশ্যহীনতাও বিরামহীন নয়, নিঃসঙ্গতাও অসীম নয়। জীবনের স্রোতের বেগে প্রেমে ব্যর্থতার মত ধংসস্তুপ গুলো খড়কুটোর মত ভাসিয়া যায় একদিন। পূর্বতন দুঃখ গুলো সামনে আসতে থাকা বড় বড় দুঃখের নিচে চাপা পড়ে অথবা নতুন কোন সুখে ইতঃপূর্বে পাওয়া দুঃখগুলোকে হাস্যকর মনে হয়। রাহাতের একখানা চাকরি হইলো। আহামরি কিছু না। তবে শুষ্ক জীবনের নদীতে খানিকটা নাব্যতা আনতে যথেষ্ট বৈকি! অফিস চলিতে থাকিলো। মোটরসাইকেল পাওয়া গেলো অফিস হইতেই। কতিপয় নারী সহকর্মীও আছে। কাজের ব্যস্ততা আছে, অবসরে চা নাস্তা হাসাহাসি আছে। আছে বিবাহ বিষয়াদি নিয়ে আলাপ আলোচনা। কখনও কখনও কবিতা নামের একটা মেয়ের চোখে চোখ পড়িয়া যায়। মেয়েটা রাহাতের সাথে সহাস্যে কথাও বলে। তখন মাঝে মাঝে সুবর্ণার কথা মনে পড়ে। আহ, এ জন্যই বুঝি লোকে বলে, "প্রথম প্রেম শ্রেষ্ঠ প্রেম। তাহাকে কখনও ভোলা যায় না। কোন প্রেম, প্রথম প্রেমের মত হয় না। " একদিন বাংলামোটর দিয়ে মোটর সাইকেল চালাইয়া যাওয়ার সময় রাহাত লক্ষ করে কবিতা রিক্সার জন্য দাঁড়াইয়া আছে।

কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করিলেও কেহ তাহাকে সাড়া দিলো না। রাহাত তখন তাহার সামনে পড়িয়া গেলো। অগত্যা ভদ্রতা করিয়াই বলিতে হইলো, অফিসে যাচ্ছেন?

হ্যাঁ, আপনি?

আমিও।

ও আচ্ছা, আমি রিক্সা পাচ্ছি না। কেউ যাবে না ওদিকে।

এমন পরিস্থিতিতে কাউকে লিফটের জন্য না বলাটাই অন্যায়। রাহাত খানিক ইতস্তত করিয়া বলিল, "আমি অবশ্য অফিসেই যাচ্ছি। যাবেন আমার সাথে? "

কবিতাও একটু ভাবিলো, শান্ত কণ্ঠে বলিল, "যাওয়া যায়, তবে কে কি ভাবে! "

তাও ঠিক, তাহলে রিক্সা খুজেঁ দেবো একটা?

সে আমি নিজেই খুজেঁ নেবো। আপনি চলে যান। আপনার দেরি হয়ে যাবে রাহাত।

কিন্তু এভাবে ফেলিয়া রাখিয়া যাইতেও ইচ্ছে করে না। "আচ্ছা বাদ দেন, ওঠেন মোটর সাইকেলে, একসাথেই যাই "

এরপর হইতে উভয়েই একসাথে বেশ কয়েকবার অফিসে যাতায়াত করিবার সুযোগ হইলো তাহাদের। অফিস হইতে ফেরার পথে কবিতা সুপার শপ, মার্কেটে ঢুকিয়া এটা ওটা কিনিতেও লাগিলো। রাহাতও তাহাকে সঙ্গ দিয়া যায়। কেনাকাটা শেষে একটু চা কফি, কোন কোন দিন স্টার সিনেপ্লেক্সে ভালো চলচিত্রের খবর থাকিলে সেটাও দুজনে উপভোগ করিতে থাকে। এভাবে ছয় মাস পর উদ্ঘাটিত হইলো যে তাহারা একে অন্যের সঙ্গও বেশ উপভোগ করিতেছে। সুবর্ণার কথা হঠাৎ যদিও বা মাথায় আসে রাহাত দ্রুত তাহাকে দূরে ঠেলিতে ব্যস্ত হইয়া পড়ে। ও অনুমান করিতে পারে যে অনতিভবিষ্যতেই তাহাদের মাঝে মন বিনিময়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হইতে যাইতেছে। রাহাত কি কবিতাকে বলিবে যে তাহার ইতঃপূর্বে একটি সম্পর্ক ছিল? একটি ব্যর্থ প্রেমের ইতিহাস তাহার হৃদয়ে প্রত্নতত্ত্ব হইয়া আছে! একবার ভাবে বলিবে, একবার ভাবে বলিবে না। সে রাত্রে ওরা অনেকক্ষণ কথা বলিল। কবিতাই ফোন রাখিতেছিল না। কি একটা বলিবে বলিবে করিয়া রাত তিনটা বাজিলো। ভোর রাত্রের দিকে আসিয়া কবিতা বলিল, "রাহাত, আমি একজন ডিভোর্সী, আমার আগেও বিয়ে হয়েছিল। ছয় মাস সংসার করেছি, পরে ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমার কেন যেন মনে হলো কথাটা তোমার জানা দরকার " রাহাত কি বলিবে বুঝিয়া উঠিতে পারে না। ভদ্রতার সুরে প্রশ্ন করে, কি হয়েছিল তোমাদের মধ্যে?

কবিতা বলে, "আমাদের মাঝে প্রেম ছিল না। সে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করত, জায়গায় জায়গায় ঘুরতো, বাড়ি আসতো কম। আর আমি তার বাবা মার দেখাশোনা করতাম। যার হাত ধরে একটা সংসারে আসলাম সেই যখন থাকে না তখন সে সংসার কত কষ্টের তোমাকে বোঝাতে পারবো না। প্রতিদিন কিছু না কিছু নিয়ে লাগতো। সে বাড়ি এলেই আমার গায় হাত তুলতো। আমার বাবা মাও আসলে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এখন তো টিভি খুললেই গৃহবধূ হত্যা। তাই আমাকে আর রাখে নি ও সংসারে।"

রাহাত একটু দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়া বলিল, "এটাই ভালো হয়েছে হয়তো। সুখে থাকাটাওতো দরকার। সংসার করলে কিন্তু সুখ হলো না তাহলে সে সংসার দিয়ে কি হবে! " রাহাতের দীর্ঘ নিঃশ্বাসটা কি কবিতার জীবনের দুঃখ হইতে নিঃসৃত নাকি অনেক দিন পর একটা প্রেমের কাছাকাছি হইবার পর সেটির মধ্যে খুঁত খুঁজিয়া পাওয়ার হতাশা হইতে নির্গত তাহা অনুধাবন করা মুশকিল। সেদিনের মত তাহারা ঘুমাইয়া পড়ে। রাহাত আর ওসব প্রসঙ্গ একটি বারের জন্যও আলোচনায় লইয়া আসে নাই। আগের মতোই অফিস চলিতে লাগিলো। কেনাকাটা, সিনেমা দেখাতেও কোন ঘাটতি হইলো না। মাস দুয়েকের মধ্যে তাহাদের সম্পর্কের আলোচনা বিবাহ পর্যন্ত গড়াইলো। দুই পরিবারেই আলোচনা করিবার মত খুব বেশি আগ্রহী মানুষ নাই। দুই পরিবারই পূর্ণ সম্মতি জ্ঞাপন করিল যে তোমাদের হৃদয়ে যাহা চায় তোমরা তাহাই করিয়া লও।

রাহাত আর কবিতা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। জীবন নতুন এক উত্তেজনায় ভরপুর হইয়া ওঠে। নতুন বাসা ভাড়া করিয়া ঘরদোর গোছাইতে ব্যস্ত হইয়া পড়ে। সংসারে নতুন ফার্নিচার, জানালার নতুন পর্দা, ডোরবেল সব কিছু বাছিয়া বাছিয়া কেনাকাটা চলিতে থাকে। রান্নাবান্নায়ও একসাথে চলে প্রেমের খুনশুটি। সন্ধ্যে, রাত, সকাল একসাথে জাপটা জাপটি করিয়া লাগিয়া থাকাতেও এক পরম আনন্দ খুঁজিয়া পায় তাহারা। বেলকনির গ্রিল বেয়ে লতানো গাছে ছেয়ে যায়। নতুন গাছের পাতার মতো তাদের জীবনেও বর্নিল রঙ্গের রেণু উদ্ভাসিত হয়। অফিস হইতে দিন সাতেক ছুটি লইয়া কক্সবাজার, বান্দরবান ঘুরিয়া আসে। সেখানে সমুদ্রের তীরে গভীর রাত্তিরে যে ঢেউ আছড়ে পড়ে তাতে তাহাদের জীবনের সকল অপ্রাপ্তি ধুইয়া মুছিয়া ভাসিয়া যায়। পাহাড়ের ওপর পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় অন্ধকার জীবন নতুন দিশা খুঁজিয়া পায়। এভাবে চলিতে চলিতে দুজনের আয় রোজগারে সংসারেও ফিরিয়া আসে স্বচ্ছতা। দু বছর ঘুরিতে না ঘুরিতে সন্তান সম্ভবা হয় কবিতা। সুখের মিছিলে পড়িয়া যাইবার ঘটনার বিস্তার হইতেছে। সংসারে নতুন শিশু। এর চেয়ে আনন্দের, এর চেয়ে পরম সুখের ও শান্তির আর কি হইতে পারে! নতুন অতিথির নাম লইয়া উত্তেজনা সৃষ্টি হইয়াছে, তাহার প্রথম পোশাক কি হইবে তাহা লইয়া উত্তেজনা সৃষ্টি হইয়াছে।

দিন যত গড়াইতে থাকে, খেলনা-দোলনা, জুতা - স্যান্ডেল, ন্যাপি-ফিডার এসব লইয়া তামাম বাড়ি হুলস্থুল হয় আরো বেশি। যখন আট মাস চলে তখন আগত অতিথির নাম হইয়া গেছে গোটা কুড়িটা। তার মধ্যে দশটা ছেলে বাচ্চার, আর দশটা মেয়ে বাচ্চার। কিন্তু হঠাৎ কবিতার শরীরটা খারাপ হইতে থাকে। ডাক্তার সাহেব বলিলেন, প্রেগনেন্সি ডায়বেটিস। সুগার অনেকটা বেশি। উত্তেজনায় ভাটা পড়িল, আতঙ্ক গ্রাস করিল। পনের দিন পর পর ডাক্তার দেখাইবার প্রয়োজন হইতে লাগিল। কবিতা কেমন যেন ভিতু হইয়া পড়িতেছে। ইদানিং রাহাতকে কুকথা বার্তা বলে। বলে, " আমি যদি মরে যাই, যাবো ; আমার বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে নিও। তোমার দোহাই। " জীবনে এতো নতুন নতুন মুহুর্ত, এতো নতুন নতুন প্রশ্ন! নতুন নতুন কষ্ট! কিভাবে এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে হয় কে জানে! দিন ঘনাইয়া আসিতে থাকে, কবিতার চোখের নিচটা কৃষ্ণ হইয়া আসে। ডাক্তারদের চোখেও ইদানিং আতঙ্ক ধরা পড়িয়া যায়। তাহারাও শঙ্কা লুকাইতে পারেন না। এক পর্যায়ে, একদিন বিকেলে বলিয়া বসিলেন, "আজই সিজার করতে হবে। এখুনি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিন। " রাহাত এক মুহুর্ত দেরি করিল না। কবিতার লেবার পেইন তখনও প্রকাশিত হয় নাই। ডাক্তার সাহেবরা কবিতাকে কেবিনে লইয়া স্যালাইন লাগাইলেন, নানা রকম ইনজেকশন দিলেন। রাহাতের শরীর ঠান্ডা হইয়া আসে। গ্রাম হইতে বোন আর আত্মীয়রা আসিয়াছে। তাহারাও সাহস দেয়ার চেষ্টা করিয়া যায়। ছয় ঘণ্টা সময় চলিয়া যায় ওষুধ পত্র দিয়া কবিতাকে সার্জারির জন্য প্রস্তুত করিতে। ঝকঝকে হাসপাতালের করিডোরে কত লোকে দৌড়াইতেছে। সবারই বিপদ। সবারই জীবনে আজ বড় পরিবর্তন হইতে যাইতেছে মনে হয়। অপারেশন শুরু হইলো। সময় থামিয়া গেলো। রাহাত রক্তচাপ বাড়িয়া ঘাড়ে প্রদাহ অনুভব করে। কিছু সময় পর ডাক্তার সাহেব মুখ অন্ধকার করিয়া অপারেশন থিয়েটার হইতে বাহির হইলেন। বলিলেন, রাহাত অবস্থা খুব বেশি ভালো না। শক্ত হতে হবে। "

রাহাত ভাঙ্গিয়া খানখান হইয়াছে, অতএব ভাঙ্গিবার আর ভয় নাই। ও বলিল, কী সমস্যা ডাক্তার সাহেব? বাচ্চা ও মা উভয়ই সংকটে। আমরা হয়তো একজনকে বাঁচাতে চেষ্টা করব। আপনার মতামত চাই। আপনি কি বাচ্চাকে প্রায়োরিটি দিচ্ছেন নাকি মা?

আবার নতুন প্রশ্ন। কোথা থেকে এর উত্তর দিতে সক্ষম হইবে রাহাত? চোখ ভরিয়া গেলো লোনা জলে, বুকের শ্বাস রোধ হইয়া আসিল ক্ষণিকের জন্য। কবিতা বারে বারে বলিয়াছে যে, "আমি মরলেও বাচ্চাকে বাঁচিয়ে নিও। " কিন্তু এও কি সম্ভব? এটা সম্ভব না। কবিতাকে তাহার লাগিবে। কবিতা বাঁচিলে আবার বাচ্চা হইতেও পারে। না হইলে না হইবে, কিন্তু এমন স্বার্থপর হওয়া সম্ভব না। পারিবে না সে। জানাইয়া দিল ডাক্তারকে। আমার কবিতা চাই।

ডাক্তার সাহেব, মুখ নাড়িয়া অপারেশন থিয়েটারে ঢুকিলেন। উত্তেজনাকর সময় চলিতে থাকিলো। আরো একঘণ্টা পর বাহির হইলেন ডাক্তার। বলিলেন, "বেবিকে সুস্থভাবে বের করা গেছে। তবে এখন কাছে যাওয়া ঠিক হবে না।" সে দুর্বল। তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হইয়াছে। আর মায়ের অবস্থা খারাপ। তাহাকেও আইসিইউ তে নেয়া হইতেছে। সেই রাতটা রাহাতের জন্য ছিল অন্ধকারতম, ভয়ঙ্করতম। দুশ্চিন্তা করিতে করিতে একসময় সে হাল ছাড়িয়া দেয়, শুধু প্রার্থনা ছাড়া, ভিখিরির মত চাওয়া ছাড়া মনুষ্য জাতির আসলে খুব বেশি কিছু করিবার নাই, সেটা সে সেদিন পলে পলে অনুভব করিয়াছিল। সকাল হইতে থাকে। বাচ্চা ক্রমেই শক্তি ফিরিয়া পায়, মা নিস্তেজ হইতে থাকে। তবে কি তাহলে মায়ের প্রার্থনাই কবুল হইতে যাইতেছে? তাহার দিব্যি কি তবে ইশ্বর শুনিয়া ফেলিলো? সকাল দশটার দিকে কবিতার লাশ বাহির হইলো। একটিবারের জন্য জ্ঞান ফিরিলো না তাহার। রাহাত চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া লইলো। হাসপাতাল ভর্তি মানুষ সেদিন এক অদ্ভুত, বিভৎস দৃশ্যের স্বাক্ষী হইলো। এক প্রাপ্তবয়স্ক সুঠামদেহী পুরুষ কেমন অসহায় ও সর্বহারা হইয়া উচ্চস্বরে বিলাপ করিতেছে। সেদিনের সেই বিষন্ন সন্ধ্যায় কবিতাকে দাফন করিতে করিতে কন্যার নাম রাখিলো পংক্তি। একেবারে ছোট্ট মেয়েকে রাহাত তাহার বোনের কাছেই সোপর্দ করিল।

যে জীবন হইবার কথা ছিল পার্কে, লেকে, স্কুলে ও শপিং মলে ; সেই জীবন আচ্ছাদিত হইলো হাসপাতালের প্রেসকিপশনে। প্রতি দু সপ্তাহ অন্তর পংক্তিকে লইয়া হাসপাতালে যাইতে হয়। কবিতার রাখিয়া যাওয়া আমানত, ভালোবাসার চিহ্ন বুকে লইয়া সংগ্রাম করিয়া যাওয়া ছাড়া আর কিবা উপায়! অফিসেও মন বসাইতে পারা যায় না। সবাই স্বান্তনা দিতে আসে। ভালো করে কাজ করি কি হইবে? কি অর্থ আছে জীবনের আর? ঘরে ফিরিতে ইচ্ছে করে না। ঘরময় ছড়িয়ে আছে কবিতা, ওর হাতে সাজানো সংসার। ওর লাগানো গাছেরা বাঁচিয়া আছে, ওর পোষা বিড়ালটা বাঁচিয়া আছে, ও নাই। মনে হয় বিড়ালটার গলা টিপিয়া ধরিয়া বলিবে এই শুয়োরের বাচ্চা, তুই বাঁচিয়া আছিস কেন? তোর জীবন কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ? গাছেদের টব হইতে ছুড়িয়া ফেলিল ও। জন উইক সিনেমার মত অত উদার হওয়াটা বেশি নাটকীয় ঠেকে রাহাতের কাছে। তাই বিড়ালটিকেও পিটাইয়া খেদাইলো পরের দুদিনের মধ্যে।

ঘরে ফেরা কমাইয়া মদ্যশালায় যাতায়াত বাড়াইলো। হুইস্কি-ব্রান্ডি-ভোদকাময় হইয়া উঠিল জীবন। অফিসে গিয়া কোনরকম চাকরিটা বাঁচাইয়া আসে প্রতিদিন। বেসরকারি চাকরি, তবু কর্তৃপক্ষ তাহার অনিয়ম মানিয়া লইতে থাকে কিছু দিন। কষ্টের ধাক্কা সামলাইতে সময় লাগে, খানিকটা সময় তাহাকে দেয়া যায়। কিন্তু কষ্ট সামলাইয়া ওঠার কোন লক্ষণ নাই। ও খুব চুপচাপ হইয়া গেলো। কর্তৃপক্ষ না পারিয়া ওকে ফিল্ড হইতে উঠাইয়া একটা সহজ ডেস্কে এসাইন করিয়া দেয়। এভাবে ছয় মাস গত হয়। ঘর বাড়ি জঞ্জালে পরিণত হইয়াছে, কবিতা না থাকায় সংসারে ছন্দ-মাত্রা আর যেন কিছুই নাই। ছয় মাসে পংক্তিকে দুইবার দেখিতে গিয়াছে ও। কিন্তু মেয়ের দিকে তাকাইতে পারে না। অপরাধী লাগে নিজেকে, মনে হয় এক অভিশপ্ত জীবন উপহার দেয়া হইয়াছে এই অবুঝ শিশুকে। এর মধ্যে আরেকটা খারাপ সংবাদ আসিল। পংক্তি ক্রমেই অসুস্থ হইতেছে। দুর্বল, দুধ খায় না, বমি করে, নিস্তেজ হইয়া পড়ে। রাহাত ছুটিয়া যায়। আবারো ঢাকায় চিকিৎসার জন্য লইয়া আসে। ডাক্তার জানাইয়া দেয় মেয়ের থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ আছে। তবে খুব প্রকট নয়, সাবধানে রাখিতে হইবে।

ছোট্ট একখানা বাচ্চা, কোমল তুলতুলে সরিসৃপের মত হামাগুড়ি দিয়া সামনে আগায়। চোখ ভরতি পৃথিবী দেখিবার নেশা। এ ঘর হইতে ও ঘর যাইতে চায়, এটা সেটা ধরিতে চায়। কখনো কখনো অতি উৎসাহী হইয়া মুখে পুরিয়া দেয় অনুচিত বস্তুর গোছা। মায়া হয়, মায়ায় বুক ফাটিয়া যায়। উহাকে জড়াইয়া কলিজার অভ্যন্তরে গাথিয়া রাখিতে মন চায়। রাহাত তাহাকে চুম্বনে চুম্বনে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিলে শিশু ত্বকে যে আনন্দের অনুভব সঞ্চারিত হয় তাহাতে সে হাসিয়া কুটিপাটি হইয়া যায়। এই হাসি তাহার মা না দেখিয়াই মরিয়া গেলো। এই ত্বকে চুম্বন না করিয়াই চলিয়া গেলো। তবে এই এতোটুকু বাচ্চার যে রক্তের রোগ হইলো সেটা সে জানিতে পারিলো না, এটা অন্তত তাহাকে দেখিতে হইলো না। পংক্তিকে পরের মাসে একবার রক্ত দিতে হইলো। রক্ত দেয়ার পর সে খানিকটা সুস্থ হয়। মাস দুয়েক ভালো থাকিলেও আবারো সেই আগের মতোই। উপায় না দেখিয়া তাহাকে হাসপাতালে লম্বা চিকিৎসার আওতায় লইয়া আসার সিদ্ধান্ত হইলো। অনেক টাকার ব্যাপার। অনেক সেবা যত্নের ব্যাপার। পংক্তির সেবা যত্নের প্রয়োজনে অনেকেই রাহাতকে আবারও বিবাহ করিতে অনুরোধ করিতে থাকে। কিন্তু তাহার মন হইতে আর বিবাহের বিষয়টি সাড়া দেয় না। কবিতাকে সে ভুলিতে পারে না। পংক্তির চিকিৎসা যে অনেক ব্যয়বহুল সেটা বুঝিতে বেশিদিন সময় লাগিলো না। মাসের বেতনের টাকা দু সপ্তাহেই শেষ। মেয়ে কদিন ভালো থাকে আবার রক্ত দেবার প্রয়োজন হয়। দামী দামী ওষুধ তো আছেই। ডাক্তার বলিলেন একটানা দুই মাস ভর্তি থাকিতে হইবে হাসপাতালে। এমন ধারাবাহিক চিকিৎসা দিলে মেয়ে সুস্থ হইয়া উঠিতে পারে।

রাহাত একটু শক্ত হয়, মন দিয়ে কাজ করিতে থাকে। ফিল্ডে পোস্টিং চাহিয়া লয়। সেলস টার্গেট পূরণ হইলে কিছু টাকা বোনাস আর কমিশন পাওয়া যায়। ওর বোন বেশি দিন হাসপাতালে ও ঢাকায় থাকিতে পারে না। তাহারও স্বামী সংসার আছে। উপায় না দেখিয়া রাহাত সেই হাসপাতালের হেড নার্সের সাথে বিস্তারিত আলাপ করে। সেখানে সে জানিতে পারে যে এখন অনেক প্যারা মেডিক্যাল ও নার্সিং পড়ুয়া মেয়ে বেসরকারি হাসপাতাল গুলোতে মাসিক সাত-আট হাজার টাকা বেতনে কাজ করিয়া থাকে। প্রতি দিন এমন অসংখ্য মেয়ে চাকুরির খোঁজে ঘুরে বেরায়। রাহাতও চাইলে এমন একজনকে হায়ার করিতে পারে। এই হাসপাতালের কাউকে বলিলেও হইবে। অর্থাৎ সারা দিন তো হাসপাতালের তত্বাবধানে থাকিবে, একটা বেকার নার্সকে এক্সট্রা পয়সা দিলেই সে খাটিয়া দিবে। তাহার সাথে খেলিবে, কথা বলিবে, একান্ত তাহাকে সময় দিবে। এতে নার্সেরও কিছু কর্মসংস্থান হইবে, তাহার মেয়ের চিকিৎসাও ভালো হইবে। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলিতে হইবে যে মেয়েটা তাহার আত্মীয়। প্রস্তাব মন্দ না। বাড়তি আট হাজার টাকায় একটা মেয়েকে পাওয়া গেলো। সে রাজি হইলো। অর্থাৎ পংক্তি যে দুই মাস ভর্তি থাকিবে সেই দুই মাস সে পংক্তির সাথে সাথেই থাকিবে। খেলিবে, গোসল করাইবে, খাওয়াইবে। মেয়েটির নাম অর্চনা। বয়স বেশি না। বাইশ তেইশ হইবে। কিন্তু বাচ্চা কোলে নেয়া দেখিলে বোঝা যায় যে তাহার পরিবারের কাহারো না কাহারো বাচ্চা মানুষ করিবার অভিজ্ঞতা তাহার আছে। দেখে আশ্বস্ত হয় রাহাত। পরক্ষণে ভয়ও লাগে। হাসপাতাল হইতেও আজকাল বাচ্চা চুরি হইয়া যায়। তাই উহার ব্যাপারে ভালো করিয়া খোঁজ খবর লইয়া লয়। বাড়ি জামালপুর। দরিদ্র বাবার দুই কন্যার একজন সে। বড় বোনের বিবাহ হইয়াছে। বোনের এক বাচ্চাকে সেই কোলে পিঠে করিয়া বড় করিয়াছে গত চার বছর। এখন নিজের কাজের সন্ধানে বাহির হইয়াছে।

কথাবার্তা শুনিয়া ভালোই মনে হইলো। রাহাত তাহাকে নিয়োগ করে। মন লাগাইয়া নিজের চাকুরিও করিতে থাকে। ধারাবাহিক চিকিৎসা আর অর্চনার সেবাযত্ন পাইয়া পংক্তি বেশ প্রাণ চঞ্চল হইয়া ওঠে সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই। রাহাত দু দিন পরপরই হাসপাতালে আসিয়া সারা রাত থাকিতে শুরু করে। অর্চনা আর পংক্তি বিছানায় ঘুমায়, রাহাত মেঝেতে শুইয়া থাকে, দরজা খোলা রাখিয়া ভিজাইয়া দেয়। মেয়ে সাহসী। চোখে মুখে কোন ভয় নাই, দ্বিধা নাই। পংক্তিকে দারুণ আদর করে। দিনে দিনে ভরসা আসিতে থাকে, আস্থা বাড়িতে থাকে। কদিন পর পংক্তিকে লইয়া বাহিরে যাইতে ইচ্ছে হয়। ঘরের মধ্যেই হাত পা ছোড়াছুড়ি করে সে। একটু বাহিরের আলো বাতাসে নিয়া যাইতে পারলে ভালো হইতো। এক পা দু পা করিয়া হাটিতে চায়। রাহাত পংক্তিকে লইয়া বাইরে যাইবার পরিকল্পনা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্ত্বরের সবুজ ঘাসে ছাড়িয়া দিলে ও আনন্দে আটখানা হইবে সে কথা ওর জানা। রাহাত অর্চনাকে বলে মেয়েকে একটু রেডি করিয়া দিতে। জামা কাপড় পড়াইতে। অর্চনা বলে, "কিছু মনে না করলে আপনাকে একটা কথা বলি। আপনার মেয়ের জামা কাপড় খুব কম। যা ছিল ছোট হয়ে গেছে। ওর তো এখন একটু করে ওজন বাড়ছে। তাহলে কিছু জামা কাপড়ও কিনে নিয়ে আসবেন।"

রাহায় অপ্রস্তুত হইয়া যায়। ওর পোশাক যা কেনার সব রাহাতের বোন কিনেছিল। রাহাতের তেমন আইডিয়া নাই। রাহাত বলিল, 'তাহলে তুমিও চলো আমাদের সাথে। কাপড় চোপ্র কেনা যাবে।'

অর্চনা একটু চুপ করিয়া থাকিলো। তারপর বলিল, "একটু সময় দিতে হবে। ওর জন্য আলাদা একটা ব্যাগ করব। সেটায় দুধের ফিডার, কৌটা, পানি, ডায়পার নিতে হবে।" রাহাত ওকে সময় দিলো। মেয়েটা আস্তে আস্তে বাবুকে রেডি করিলো, ওর ব্যাগ গোছাইলো। তারপর নিজে রেডি হইলো। এবার একসাথে তাহারা রওনা হইলো। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্ত্বরে গিয়া বসিলো। মেয়েকে এক পা দু পা করিয়া হাটা শেখাইলো। পংক্তির নির্মল হাসি আর সবুজ ঘাসে আলোর কোমল বিকিরণ বিকেলটাকে এক মোহনীয় স্নিগ্ধতা দান করিলো। ওরা পানি পুরি খাইলো, বাবুকে একটু কেক খাওয়াইলো। মাঠের মধ্যেই দুধ বানাইয়া খাওয়াইতে হইলো। তারপর ওরা গেলো মার্কেটে। নিউ মার্কেটে কোথায় কেমন জামা কাপড় কিনতে পাওয়া যায় অর্চনা সবই জানে। বাছিয়া বাছিয়া দাম করিয়া কিনিতে থাকে ও। রাহাত তাহাকে স্বাধীনতা দিয়া পাশে দাড়াইয়া থাকে নিজের মতো। পংক্তি নতুন কাপড় ধরিয়া টানাটানি করে। কাপড় নষ্ট হইবার আসঙ্কায় রাহাত সেটা সরাইয়া লইলে মেয়ে অভিমান করে। অর্চনা বলে, "আহা টানছে টানুক না। ওকে ওর মত খেলতে দিন। কতই বা আর নষ্ট হবে? " দোকানদারও তাই বলে, বাচ্চা মানুষ, করুক যা খুশি।

রাহাত সরিয়া আসে। এ পৃথিবী বড় অদ্ভুত লাগে ওর। জীবনটা বড্ড অদ্ভুত লাগে। নিউ মার্কেটে শত শত মানুষ কেনাকাটা করিতেছে। সবার জীবনই কি এমন? সবার জীবনেই কী এতো ভাঙ্গা গড়া, এতো রহস্য এতো বেদনা! রাহাত দোকানের বাহিরে দাঁড়াইয়া মানুষ দেখিতে থাকে।

পরিশিষ্ট :

আজ পংক্তির আঠারোতম জন্মদিন। এই আঠারো বছর ধরিয়া তাহার থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা চলিতেছে। প্রথম ছয় বছর রক্ত দিয়ে হইয়াছিল বেশি। তারপর বারো বছরে তিনবার রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হইয়াছে। ডাক্তার সাহেবরা বলিয়াছেন তাহার রোগ অনেকটা ভালোর পথে। আর বাসায় সেই সেবিকা এখনো আছে, তবে তাহার মা হইয়া। পংক্তির বয়স যখন দেড় বছর তখনই তাহারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাহাদের ঘরেও এক পুত্র সন্তান আসিয়াছে। নাম রাখা হইয়াছে আদিত্য। চাকুরিতেও পদন্নতি পাইয়া রাহাত এখন সব লইয়া ভালোই আছে। সময় পাইলে সে কবিতার কবর জিয়ারত করিতে যায়। জীবনে অনেক বাঁক সে দেখিলো, প্রেম পাইলো, প্রেম হারা হইলো। সবই জীবনের অংশ। আমাদের আসলে কিছুই করিবার থাকে না, বাঁচিবার তাগিদে, অন্যকে বাঁচাইবার তাগিদে আমরা শক্ত হই, বাঁচিয়া থাকি, একে অন্যকে ভালোবাসি। প্রেম আসলে যতটা না যৌবনের সাথে জড়িত, তার চেয়ে জড়িত জীবনের সাথে। ছেলে-মেয়ে দুটো সারা দিন হইচই করিতেছে, মারামারি করিতেছে, আবার মিল হইতেছে। রাহাত সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অফিস করিয়া বাসার ছাদে কফি হাতে দাঁড়ায়। ছাদ থেকে শহরের বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায়। যেন নিজের জীবনের অনেকটা পেছনেও। অর্চনা ঘরের কাজ সারিয়া ওর সাথে যোগ দেয়। কিগো, খালি পেটে কফি খাচ্ছো? আমাকে বললেই পারতে, কিছু একটা নাস্তা বানিয়ে দিতাম। রাহাত কফির মগ রেলিং এর ওপর নামাইয়া অর্চনার হাত ধরিয়া বলে, তোমাকে ভালোবাসি অর্চনা। জানি এ কথা দুনিয়া বিশ্বাস করবে না। তবু বলি, তোমাকে ভালোবাসি।

অর্চনা শান্ত ভঙ্গিতে চোখের পাতা ফেলে, ওকে আশ্বস্ত করে, তোমার ভালোবাসা আমি প্রতি মুহুর্তে অনুভব করি। তাইতো আমিও তোমাকে ভালোবাসি। পংক্তি ছুটিয়া আসিলো কোথা হইতে, বলিল, মা, মা, দেখে যাও আদিত্য আমার ব্যাগে তেলাপোকা ঢুকিয়ে দিয়েছে।

এই ছেলেটা এতো দুষ্টু, আর তুই কি করেছিলি ওর সাথে বলতো?

আমিও ওরটাতে তেলাপোকা ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। হা হা। এই বলে পংক্তি দৌড়াইয়া নিচে চলিয়া গেলো। রাহাত আর অর্চনা একে অন্যের দিকে তাকাইয়া হাসিয়া ওঠে। তারপর হাতে হাত ধরিয়া দাঁড়াইয়া থাকে দূর দিগন্তের দিকে দৃষ্টি দিয়া। পাখি উড়িয়া যাইতেছে এক ঝাক। কখন কোন গাছে ওরা বাসা বাঁধে খুব জানিতে ইচ্ছে হয়।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন