ঢাকা | শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮

ওটিপির ফাঁদে ইমো হ্যাক

তানভীর হাসান

প্রকাশনার সময়

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:০৯

আপডেট

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:১২

প্রবাসীদের অনেকেই দেশে থাকা স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মোবাইল ফোনের অ্যাপ ‘ইমো’ ব্যবহার করেন। তাদের একটি বড় অংশ প্রযুক্তি বিষয়ে ততটা ওয়াকিবহাল নন। এমন ব্যক্তিদেরই খুঁজে বের করে চক্রের সদস্যরা। এরপর তার নম্বরে ফোন করে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়। কখনো ইমো নম্বরে মেসেজ পাঠিয়ে তাদের অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করে। পরে সমাধানের পথ বাতলে দেয়ার নামে প্রয়োজনীয় নানা তথ্য জেনে নেয়। বিশেষ করে তাদের ফোনে ওটিপি বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড পাঠানোর ব্যবস্থা করে। কোনো অজুহাতে সেই ওটিপি জেনে নেয় এবং সেটি কাজে লাগিয়ে ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে। পরে ওই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তার আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইনে প্রতারণার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ইমো। বিশেষ কোনো পরিশ্রম ছাড়াই সহজ-সরল মানুষকে বোকা বানিয়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। অনেক তরুণ-যুবক এতে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে প্রকৌশলী যেমন আছে, তেমনি সাধারণ মুদি দোকানিও আছে। আর ইমো হ্যাকারদের আখড়া বা হেড অফিস হয়ে উঠেছে নাটোরের লালপুর। এই চক্রের অর্ধশতাধিক সদস্যের অবস্থান পাওয়া গেছে ওই এলাকায়। এর মধ্যে অন্তত ২০ জনকে সম্প্রতি অভিযানে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র‌্যাব। ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জুনায়েদ আলম সরকার নয়া শতাব্দীকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষের উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকরাও এখানে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মানুষকে নানাভাবে ফাঁদে ফেলে বা ভুল বুঝিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। এ ধরনের প্রতারকের বিরুদ্ধে আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি। সন্দেহজনক তৎপরতা বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সর্বশেষ গত ২৪ আগস্ট পলাশ আলী ও সাব্বির হোসেন নামে দু’জনকে নাটোরের লালপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, পলাশ আলী প্রকৌশল বিষয়ে পড়ালেখা করে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করত। আর সাব্বির এইচএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। তারা ২০১৮ সাল থেকে ইমো হ্যাক করে অর্থ আদায় শুরু করে। সাব্বির প্রবাসী বাংলাদেশিদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তা পলাশকে দিত। প্রযুক্তি বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখা পলাশ ওইসব নম্বরে ওটিপি পাঠানোর পর তাদের ফোন করত। এটা-সেটা বলে ওটিপি জেনে তাদের ইমো অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতারণা শুরু করত। সাধারণত ওই অ্যকাউন্টধারীর আত্মীয়-স্বজনের কাছে কল করে বা মেসেজ পাঠিয়ে বিপদে থাকার কথা বলে টাকা ধার চাইত তারা। অনেক সময় তারা গলা পাল্টে বা বিশেষ অ্যাপ/সফটওয়্যার ব্যবহার করে কথা বলায় স্বজনরাও প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারতেন না। তারা বিপদের কথা শুনে দ্রুত বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দিয়ে দিতেন। পরে যখন তারা প্রকৃত ঘটনা জানতে পারতেন, তখন আর কিছু করার থাকত না।

এ ছাড়াও মাঝে মধ্যেই ইমো হ্যাক চক্রের সদস্যরা ধরা পড়ছে ডিবিসহ পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের অভিযানে। তাদের প্রায় সবাই নাটোর বা আশপাশের এলাকার। ২৯ আগস্ট রাজশাহীর বাঘা থেকে আরব আলী নামে একজনকে গ্রেফতার করে স্থানীয় পুলিশ। সে ওই অঞ্চলের ইমো হ্যাক চক্রের হোতা ছিল বলে জানানো হয়। দীর্ঘদিন ধরে সে প্রবাসীদের ইমো হ্যাক করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আদায় করে আসছিল। স্থানীয় মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকের পর তাকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এর আগে মে মাসের শেষ সপ্তাহে নাটোরের লালপুর থেকে ইমো হ্যাক চক্রের ১৬ সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৫। লালপুরের মোহরকয়া গ্রামে ওই অভিযান চালানো হয়। তখন প্রতারণায় ব্যবহƒত ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।

র‌্যাব জানায়, প্রথমে পাপ্পু আলী, আজিম উদ্দিন, অন্তর আলী, স্বাধীন ও সজীব আলীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভাঙ্গাপাড়া গ্রাম থেকে ফরিদ, রবিউল ইসলাম, মোহন, শাহপরান, আশিকুর, মাহিন, শাহাবুল, রুবেল, আলম, সিরাজুল ইসলাম ও নাজিম আলীকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তারা দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের ইমো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তাদের স্বজনের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কথা স্বীকার করেছে।

পুলিশ-র‌্যাবের কর্মকর্তারা বলছেন, মোবাইল ফোনে কোনো ওটিপি বা কোড এলে তা কারো সঙ্গে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। আত্মীয়-স্বজন পরিচয়ে কেউ টাকা চাইলে যাচাই না করে দেবেন না। আর আপনার ইমো অ্যাকাউন্ট অন্য কারো দখলে আছে কিনা জানতে ‘অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি’ অপশনে ঢুকে ম্যানেজ ডিভাইসে ক্লিক করুন।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x