ঢাকা, সোমবার, ৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

শরৎ শুভ্রতায় প্রভু প্রেমের আহবান 

প্রকাশনার সময়: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:২৪
ছবি : সংগৃহীত

রিমঝিম বর্ষার পরেই সুন্দরের রানি শরতের আগমন। শরতের আগমনে বাংলার প্রকৃতিতে লাগে শুভ্রতার ছোঁয়া। শরতের প্রত্যুষে শিশিরস্নাত সবুজ পাতায় যখন সূর্যের সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ে, তখন পাল্টে যায় প্রকৃতির চেনা রূপ।

গ্রামের দুর্বাভেজা মেঠো পথে যখন পা পড়ে, তখন মন উতলা হয়ে ওঠে। শিশিরভেজা অজস্র শেফালির সুগন্ধে বিমোহিত করা চারদিক, দুপুরে রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি খেলা আর ঝিরঝিরে বাতাসে ধান ক্ষেতের সবুজ ঢেউ, আনমনা করে তোলে উদাসী মন। নদী, খাল কিংবা বিলের ধারে শুভ্র কাশফুলের হাতছানি উপেক্ষা করে সাধ্য কার? শরৎ যেন সাদা কাশফুলের বিমুগ্ধ শুভ্রতায় মহান আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনের নিমন্ত্রণ।

কবির ভাষায় ‘আমি অবাক নয়নে চাহিয়া যে রই/বাতাসে হেলে দুলে ওঠা ওই/কাশফুলের পানে, মুগ্ধ প্রভু আমি মুগ্ধ/এই সৃষ্টিরাজির শানে।’

শরৎ মানেই যেন সুদূর নীলিমায় ধূসর আর শুভ্র মেঘের অবাধ বিচরণ। আকাশ যেন মেঘেদের মিলনমেলা। পালতোলা নৌকার মতো নীল আকাশ দাপিয়ে বেড়ানো মেঘমালা, হূদয়ে এনে দেয় প্রশান্তির আবেশ। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ মেঘও কিন্তু আল্লাহ তাআলার নেয়ামত। এরশাদ হয়েছে, ‘তুমি কি দেখ না আল্লাহ মেঘমালা চালিত করেন, অতঃপর সেগুলো একত্রে জুড়ে দেন, অতঃপর সেগুলো স্তুপীকৃত করেন, অতঃপর তুমি তার মধ্য থেকে পানির ধারা বের হতে দেখতে পাও...।’ (সুরা নুর: ৪৩)

শরতের সৌন্দর্য শুধু মেঘমালা দিয়েই শেষ নয়; স্নিগ্ধ বাতাসে ভেসে আসা শিউলী, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা, বেলী, জারুল, রঙ্গন, টগর, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, নয়নতারা, সন্ধ্যামণি ও জয়ন্ত্রীসহ নাম না জানা আরও অসংখ্য ফুলের সৌরভ হূদয়কে করে মুগ্ধ বিহ্বল। আর এ রূপ সৌন্দর্য সে তো কেবল মহিমান্বিত আল্লাহরই দান। তিনিই শরৎকে এমন সৌন্দর্যময় করে সাজিয়েছেন। কারণ তিনি নিজে যেমন সুন্দর, তেমিন ভালোও বাসেন সৌন্দর্যকে।

ভরা নদীর স্বচ্ছ জলে ঝকঝকে রোদের ঝিলিক শরতের একরকম সৌন্দর্য। আবার সন্ধ্যায় অস্তগামী সূর্যের রঙিন প্রভায় আরেক রকমের সৌন্দর্য। এক কথায় শরৎ হচ্ছে সৌন্দর্যের আঁধার। এমন অপূর্ব সৌন্দর্যের সঙ্গে মিতালি করেছে আরেক যে সৌন্দর্য, তার নাম আকাশ। মাথার ওপরের এই বিস্তীর্ণ আকাশ যেন এক বিশাল নীল সমুদ্র। এই মস্ত আকাশের দিকে তাকালে জ্ঞানীদের মনের গভীরে প্রথমেই যে প্রশ্ন উঁকি দেয়, তা হচ্ছে ‘কে সেই স্রষ্টা? কোরআনের ভাষায়, ‘তোমরা কি দেখ না, কীভাবে আল্লাহ সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন একের ওপরে আরেকটিকে (স্থাপন করে)?’ (সুরা নুহ: ১৫-১৬)

শরতের রূপ বর্ণনা শেষ করা যায় না। শরতের চাঁদনী রাতের সেই স্নিগ্ধতা না ভাষায় ব্যক্ত করা যায়, আর না অক্ষরের রেখা টেনে তৃপ্তি পাওয়া যায়। শরতের ধবল রাতের সৌন্দর্য সৃষ্টি করে অন্যরকম মায়াবী মনকাড়া পরিবেশ। সতেজ সজীব গাছপালার ওপর দিয়ে বয়ে যায় ঝিরিঝিরি বাতাস। ফুরফুরে হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় নীল জোনাকির দল। ফর্সা আকাশ থেকে উড়ে আসে দুধের সরের মতো জ্যোৎস্না। আল্লাহ বলেন, ‘কতই না কল্যাণময় তিনি যিনি আসমানে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটিয়েছেন আর তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ আর আলো বিকিরণকারী চন্দ্র।’ (সুরা ফুরকান: ৬১)

শরতের এই রূপসৌন্দর্য একদিকে যেমন মানুষের মনকে প্রকৃতিপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি মনের বাগিচায় রোপণ করে প্রভু প্রেমের সবুজ চারা। শরতের সাদা কাশফুলের মতোই কোমল আর শুভ্রতায় পবিত্র হয়ে উঠে মুমিনহূদয়। শরৎকালকে নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদেরও আগ্রহের শেষ নেই। সে কারণেই শরৎ নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ।

শরতে নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে টুইটম্বুর হয়ে থাকে। যার ভেতরে ঝাঁক বেঁধে মনের আনন্দে ঘোরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। পানির ওপর ভেসে থাকে শুভ্র শাপলা, লাল পদ্ম। বিলের হাঁটু পানিতে চুপচাপ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে সাদা সাদা বক। সব মিলিয়ে শরৎ যেন শুভ্রতার ঋতু, পবিত্রতার প্রতীক। সে জন্যই হয়তো শিল্পী-সাহিত্যিকরা শরৎকে বিবেচনা করেছেন ‘শুভেচ্ছাবাহক ঋতু’ হিসেবে। কিন্তু আজ আর শরতের মনপাগল করা সৌন্দর্য চোখে পড়ে না। চোখে পড়ে না নদীর তীরে কাশফুলের অরণ্য।

এখন কাশফুলের বসুন্ধরাগুলো খেয়ে ফেলেছে কোম্পানির বিষাক্ত পেট, মিল-কারখানার জিহ্বা। যদি এভাবে প্রকৃতির অনিষ্ট সাধনে মানুষ মেতে থাকে, তাহলে একদিন হয়তো শরতের সাদা কাশফুলের সঙ্গে আমাদের আর দেখা হবে না। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার করণেও যে কোনো সময় নেমে আসতে পারে আসমানি গজব। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের জন্যই জলে ও স্থলে বিপর্যয় ঘটে।’ (সুরা রুম: ৪১)

আসুন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রকৃতির প্রতি উদার হই এবং শরতের এই বিমুগ্ধ রূপমাধুর্যে মোহিত হয়ে মহান আল্লাহর কুদরতি পায়ে অবনত মস্তকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি। দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে এই প্রার্থনা করি, ‘প্রভু, সকলের মনের পুঞ্জীবনে জমাটবাঁধা কষ্টগুলো শরতের শুভ্রতায় ধুয়ে মুছে দিন। নির্মল আকাশের বুকজুড়ে রাশি রাশি সাদা মেঘ মানবহূদয়ে প্রভু প্রেমের যে বার্তা নিয়ে আসে, সেই শাশ্বত বাণী জীবনে অটুট রাখুন চিরদিন।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ