ঢাকা, শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯, ২৪ জিলকদ ১৪৪৩
মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

সবল ও দুর্বল মুমিনের পরিচয়

প্রকাশনার সময়: ২৩ জুন ২০২২, ১১:০৩

মুসলিমগণ! আল্লাহকে ভয় করুন। ধার্মিকতা, ইবাদত ও তাকওয়া দিয়ে মর্যাদার শীর্ষচূড়ায় যে আরোহণ করেছে সেই কেবল সফল হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আল ইমরান: ১০২)

হে মুসলিমগণ! শ্রেষ্ঠত্বের জন্য চেষ্টাসাধনা করা প্রত্যেক অধ্যবসায়ী, জাগ্রত, দৃঢ় প্রত্যয়ী ও উচ্চাভিলাষীর বৈশিষ্ট্য। তার হিম্মত তথা উচ্চাকাঙ্ক্ষা আকাশের তারকা স্পর্শ করে এবং এমন লক্ষ্য যা মেঘমালার উচ্চতা ছাড়িয়ে যায়। সে দুর্গম সোপানে আরোহণ করে এবং শ্রেষ্ঠত্ব, উন্নত গুণাবলি ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সংগ্রাম করে। কোনো বাধা তাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে না এবং কোনো প্রতিবন্ধকতা তার উদ্দেশ্য অর্জন রুখতে পারে না।

শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন একটি কঠিন কাজ— যা শুধু দাবি ও আশা পোষণের মাধ্যমে লাভ হয় না। তদ্রূপ অলসতা, মন্থরতা, অক্ষমতা ও বিরতি প্রদান এবং পিছপা হলে অর্জন হয় না। কবি বলেন, ‘যে সাধনা-পরিশ্রম ছাড়া উচ্চ আকাঙ্ক্ষা প্রত্যাশা করে, সে অসম্ভব তালাশে জীবন নষ্ট করল।’

আরবরা বলেছেন, ‘মানুষের পরিচয় তার পরিশ্রমে, ঘোড়া ক্ষিপ্র গতিতে এবং তলোয়ার তার ধারাল তেজে’। যে মর্যাদার পথে সুউচ্চ হিম্মত ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে চেষ্টা করবে, সে তাই অর্জন করবে যা খ্যাতিমান বিচক্ষণ ব্যক্তিবর্গ করেছেন। কবি বলেন, ‘যখন ব্যক্তির প্রচেষ্টা হয় তার লক্ষ্যের সিঁড়ি, তখন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছা অসম্ভব নয়।’

দৃঢ় সংকল্প ব্যক্তি তার সুচিন্তিত বিবেচনায় দোটানায় থাকে না এবং যা নিয়ত করে তা থেকে সরে আসে না। ইচ্ছা ও প্রত্যাশার পর তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে শিথিল হয় না। উঁচু মর্যাদা ও আশা বাস্তবায়ন হয় কেবল চলমানতা, পরিকল্পনা ও সাধনায় ধৈর্য প্রদর্শনের মাধ্যমে। কত ইলম অর্জনে আগ্রহী ছিল, কিন্তু কিছুই পাঠ করতে পারেনি। কত ফসল ফলনে উচ্চাভিলাষী ছিল, কিন্তু কিছুই বপন করতে পারেনি।

এর মূল কারণ হচ্ছে, দীর্ঘসূত্রতা, গড়িমসি ও ঢিলেমি করা, মনোবল ও ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতা। আর এগুলোই হচ্ছে সব অবহেলাকারী, অলস, দুর্বল ইচ্ছাশক্তি ও সিদ্ধান্তে ইতস্ততকারীর বৈশিষ্ট্য।

হে মুসলিমগণ! মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব হিম্মত ও লক্ষ্য অনুযায়ী কম- বেশি হয়। সুউচ্চ মনোবলের ঘোড়াকে নাগালে পাওয়া যায় না, তার পদাঙ্ক অনুসরণ করা যায় না। পক্ষান্তরে দুর্বল ইচ্ছাশক্তি আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নৈশ্যগল্প করে, অবসন্নতার সঙ্গে আড্ডা মারে। আর মানুষ হচ্ছে অবস্থার সঙ্গে পরিবর্তনশীল। নিজেরা ছোট হলে হিম্মতও ছোট হয়ে যায়। বড় হলে হিম্মতও বড় হয়। মানুষের মর্যাদা নিহিত যা সে অন্বেষণ করে।

উচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারীগণ যা চেয়েছেন তা অর্জন করা ও তাদের সুদৃঢ় লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে কষ্টের তিক্ততা অনুভব, কষ্টক্লেশ সহ্য করা এবং কঠিন হলেও তাকে পছন্দ করার কারণে। ফলে তারা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে সফল হয়েছেন এবং কষ্ট সহ্য করার পরই মর্যাদায় উন্নীত হয়েছেন। উচ্চ মর্যাদা অর্জনের পেছনে রাতের বিভীষিকা আছে।

যে উচ্চ হিম্মত বলে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছেছে, পক্ষান্তরে যার মৃত ইচ্ছাশক্তি, নির্বাপিত অন্তর, নিস্তেজ হূদয় ও বেখেয়ালি বিবেক তারা কি এক সমান? যে পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় মর্যাদায় স্থানান্তরিত হয়, যে শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষচূড়ায় তারকার ন্যায় আরোহণ করে, সে কি তার সমান; যে তার জীবনকে খেলতামাশা, অলসতা ও শৈথিল্যে নষ্ট করেছে? কবি বলেন, ‘তোমরা মনে করো না যে, মর্যাদা তুচ্ছ বিষয় এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন সহজ সাধারণ বিষয়। যে চেষ্টা-সাধনা ব্যতীত সুউচ্চ মর্যাদার প্রত্যাশা করে তাকে বলে দাও, তুমি অসম্ভব জিনিসের আশায় বসে আছ।’

সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা হচ্ছে সুদূরপ্রসারী আকাঙ্ক্ষা ও মহৎ উদ্যোগ, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জন’। কাজেই যার আকাঙ্ক্ষা বড় হয় সে সাধনা করে, যে তার রবের সাক্ষাতের বিষয়কে স্মরণ করে সে তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে যার মনোবল ও আকাঙ্ক্ষা দুর্বল হয়, সে কর্ম পরিত্যাগ করে, অযথা তর্কে লিপ্ত হয়, সুন্নত বর্জন করে এবং আখেরাতের ওপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়। কিছু মানুষ পিছপা হতে থাকে, অবশেষে আল্লাহও তাদের (তার রহমত থেকে) দূরে সরিয়ে দেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পালন কর্তার ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ছুটে যাও, যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্য।’ (সুরা আল ইমরান: ১৩৩)

অর্থাৎ প্রতিযোগিতার মাঠে প্রতিযোগীদের ন্যায় তোমরা ক্ষমা ও জান্নাত অর্জনের পথে দৌড়াও। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিন অপেক্ষা উত্তম ও প্রিয়। যা তোমার উপকার করবে তাতে আগ্রহী হও। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা কর এবং অক্ষম হইও না। (মুসলিম)

ইমাম নববি (রহ.) বলেন, এখানে ‘শক্তি’ বলতে আখেরাতের বিষয়ে মনের ইচ্ছাশক্তি বুঝানো হয়েছে। হুসাইন বিন আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক কাজের শ্রেষ্ঠ ও উৎকৃষ্ট পছন্দ করেন এবং যা খারাপ (নিম্নমানের) তা অপছন্দ করেন।’ (তবরানি)

ইলম হলো শ্রেষ্ঠত্বের মূল এবং সর্বোত্তম গুণ। আর যে ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তি বিশাল হবে সে মূর্খতাকে অবজ্ঞা করবে এবং ইলম অর্জনে আগ্রহী হবে। আর শরয়ি ইলমই হচ্ছে কাঙ্ক্ষিত বস্তু ও সম্পদ। যে তা অর্জন করবে তার গৌরব কখনো নিশ্চিহ্ন হয় না এবং তার ধনভাণ্ডার নিঃশেষ হয় না।

ইমাম শাফেয়ি (র.) বলেন, ‘যে কোরআন শিক্ষাগ্রহণ করে তার মর্যাদা সুউচ্চ হয়, যে ফিকহে কথা বলে তার মর্যাদা উন্নীত হয়, যে হাদিসে লিপিবদ্ধ করে তার দলিল মজবুত হয়, আর যে আরবি ভাষায় দৃষ্টিপাত করে তার স্বভাব নরম হয়, আর যে গণিতশাস্ত্রে দৃষ্টি দেয় বুদ্ধিশক্তি বেশি হয়। যে স্বীয় আত্মা হেফাজত করতে পারেনি তার ইলম তাকে কোনো উপকার করবে না।’ বদিউজ জামান তার ভাগিনার প্রতি পত্র লিখেন, যেখানে ইলম চর্চার উৎসাহ ও বিমুখ হলে ধমক দেয়া হয়।

তিনি লেখেন, ‘তুমি আমার সন্তান যতক্ষণ ইলম চর্চায় থাকবে, মাদরাসা হবে তোমার বাসস্থান, কলম হবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। খাতা থাকবে সঙ্গী। কিন্তু যদি অলসতা কর, তাহলে (জেনে রাখো) আমি ভিন্ন অন্য কেউ তোমার মামা।’

এই প্রযুক্তির যুগে, যেখানে পৃথিবী মহাকাশ অতিক্রম করেছে, আমরা মুসলিম দেশসমূহের প্রত্যেক প্রতিভাবান মেধাবী ও সৃজনশীল উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারীকে উৎসাহ দিচ্ছি আধুনিক বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করার জন্য। যা থেকে বিশ্বব্যবস্থাপনার কাঠামো, মানুষের জীবনযাত্রা ও রাষ্ট্রের উন্নতি-অগ্রগতি অমুখাপেক্ষী নয়। যেমন: উদ্ভিদ ও শিল্পবিদ্যা, চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং, রসায়ন, পদার্থ, গণিতশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদা, ভূবিদ্যা, সিভিল এভিয়েশন, সমরাস্ত্র নির্মাণ, প্রযুক্তি, আইটি ও ইলেক্ট্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। এসব বিষয়গুলো আজ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ময়দানে আবশ্যকীয় হয়ে গেছে। জরুরি বিষয়াদির রক্ষণাবেক্ষণ, মানুষের জীবনে লেনদেন সহজীকরণ ও কষ্ট লাঘবকরণে এগুলো এখন অপরিহার্য। এ ছাড়া অন্যান্য জ্ঞানবিজ্ঞান (অর্জন করা চাই) যা কোনো দেশ বর্জন করলে সেই জাতি কষ্টে পড়ে যায়, তার কল্যাণ বিনষ্ট হয়, তার উন্নতি ও অগ্রগতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। যে দেশ জ্ঞানবিজ্ঞানে উৎকৃষ্ট হয়েছে তার সমৃদ্ধি উর্বর হয়েছে এবং সে সম্মান ও মর্যাদা উৎপন্ন করেছে।

আমরা সৌদি বিজ্ঞানী গবেষক ও উদ্ভাবকদের প্রশংসা করছি, যাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবান্বিত অতীত রেকর্ড আছে। আর এরা তাদের দেশকে (অতীত) মর্যাদা ও গৌরবের সঙ্গে সম্পৃক্ত করাচ্ছে। তারা সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষচূড়ায় পৌঁছে গেছে এবং বিশ্বের অপরাপর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছে।

আমাদের নতুন প্রজন্মের হূদয়ে আরো আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। তাদের যোগ্যতা বৃদ্ধিকরণ ও প্রতিভার পরিচর্যা এবং উৎসাহ প্রদান করা চাই। যেন তারা উন্নত মাথা ও সুউচ্চ বক্ষ নিয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এটা কিভাবে না হয়ে পারে, যেখানে তাদের দেশ হচ্ছে মেধা ও প্রতিভার খনি, চিন্তাশক্তি ও প্রজ্ঞার ঝরনা, ওহির ভূমি ও পবিত্রতম দেশ। তাই অন্য কোনো মর্যাদাই তার সমতুল্য হতে পারে না তা যতই বেশি বা প্রাচীন হোক না কেন।

হে মুসলিমগণ! সবচেয়ে দুর্ভাগা ব্যক্তি হলো যার মনোবল ভেঙে গেছে, যার ইচ্ছাশক্তি দুর্বল, যার সংকল্প ক্লান্ত ও মনের তীব্রতা নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। যেন কোনো কিছুর দিকে আঙ্গুল কাটা হস্ত প্রসারিত করে, দৃষ্টিহীন চোখ দিয়ে তাকায়। সে অলস অকর্মণ্য ও নিম্ন লোকদের সঙ্গে মিশে। হীনতায় সন্তুষ্ট থাকে। আর যে নিচু প্রকৃতির সেই কেবল হীনতায় তুষ্ট হয়।

১৮ জিলকদ ১৪৪৩ হিজরি (১৭ জুন ২০২২) মদিনার

মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার

সংক্ষিপ্ত অনুবাদ— মুশাহিদ দেওয়ান

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ