ঢাকা, সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

বিক্রীত পণ্য ফেরত নিলে যে সওয়াব

প্রকাশনার সময়: ১৪ মে ২০২২, ০৮:২৪

মানবজাতিকে আল্লাহর ইবাদত করার পাশাপাশি রিজিক অন্বেষণের তাগিদ দেয়া হয়েছে। হালাল রিজিক অন্বেষণ ইবাদতের মতো গুরুত্বপূর্ণ। হালাল রোজগার হলো ইবাদত কবুলের পূর্বশর্ত। ব্যক্তির ইনকাম হারাম হলে ইবাদত কবুল হবে না। আল্লাহ তার ইবাদতের দিকে ফিরেও তাকাবেন না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা হালাল রিজিক তালাশ করো, যা আমি তোমাদের দিয়েছি।’ (সুরা বাকারা: ১৭২)

ইসলাম মানুষকে অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো পেশা গ্রহণ করতে বাধ্য করেনি। তবে হালাল পেশার ওপর জোড় তাগিদ দিয়েছে। হালাল রিজিক উপার্জনকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘ফরজ ইবাদতসমূহের পরে হালাল উপার্জন করাও একটি ফরজ এবং ইবাদতের গুরুত্ব রাখে।’ (হাদিস)

ব্যবসায় দ্বিপাক্ষিক স্বার্থে মানবিকতার শিক্ষা দেয় ইসলাম। সততা, আস্থা আর বিশ্বাস— ইসলামের আদর্শ। হাদিসে এসেছে: ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি : ১২০৯)

সুতরাং ব্যবসা শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়; বরং ইহ-পরকালীন বিচারে ব্যবসা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রায় সকল নবী-রাসুলই ব্যবসা করেছেন। তারা মানবসেবা হিসেবে ব্যবসা করেছেন। এ জন্য আমাদেরও ব্যবসায় মানবিক হতে হবে। তবে বর্তমান সমাজে বড় ধরনের একটি সমস্যা দেখা দিচ্ছে, সেটা হলো, বিক্রীত পণ্য ফেরত নেয়া হয় না। এমনকি পাল্টে দিতেও অনেকে গড়িমসি করে। অনেক দোকানের ব্যাগ বা তাদের সাইনবোর্ডে লেখা থাকে, ‘বিক্রীত পণ্য ফেরত নেয়া হয় না।’ এই ব্যাধি এখন প্রায় জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর থেকে উত্তরণের সুন্দর সমাধান দিয়েছেন ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘বিক্রীত পণ্য ফেরত নেয়া; কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন।’ (আবু দাউদ : ৩৪৬০)

একজন মানুষ পণ্য ক্রয় করার পর অনর্থক ফেরত দিতে আসে না। কোনো না কোনো বিপদে পরেই আসে। বিষয়টি যদিও ঐচ্ছিক। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ী যদি ক্রেতার যৌক্তিক অপারগতার কারণে ক্রয়-বিক্রয় সাব্যস্ত হয়ে যাওয়ার পরও মানবিক দৃষ্টিতে বিক্রীত পণ্য ফেরত নেয়, তবে সে এর জন্য মহান আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিদান পাবে। কারণ ক্রয়-বিক্রয়ে নম্রতা অবলম্বন করার দ্বারা আল্লাহর রহমত পাওয়া যায়। কেয়ামতের দিন যখন বান্দার আর বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না; বিক্রীত পণ্যটি ফেরত নেয়ার মাধ্যমে বান্দা সেই কঠিন বিপদের দিনে মুক্তি পেতে পারেন। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে দুনিয়াতে কারো বিপদ দূর করবে, আখেরাতে আল্লাহ তার বিপদ দূর করবেন।’ (মুজামে আওসাত: ২/৮৬)

আরেক হাদিসে আছে, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি রহমত বর্ষণ করেন যে নম্রতার সঙ্গে ক্রয়-বিক্রয় করে ও পাওনা ফিরিয়ে দেয়।’ (বুখারি: ২০৭৬)

চলুন, নবী যুগের একটি ঘটনা পড়ে আসি। আবু হুরায়রা (রা.) একবার মদিনায় একটি দোকান খুলে বসলেন। প্রায় তিন মাস ব্যবসা করার পর একদিন দোকান গুটিয়ে চলে যাচ্ছেন। অন্যান্য ব্যবসায়ীরা অবাক হয়ে বললেন, ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ের লস সহ্য করে টিকে রইলেন, এখন মুনাফার মুখ দেখতে শুরু করে ব্যবসা বন্ধ করে দেবেন? এটা কেমন ব্যাপার। তিনি বললেন, তোমাদের কাছে প্রচলিত লাভ-লসের উদ্দেশ্যে আমি দোকান খুলিনি। অপর ব্যবসায়ী বললেন, তাহলে কেন? তিনি বললেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি তার ক্রেতা ভাইয়ের ক্ষতি পূরণের জন্য স্বীয় বিক্রয় রহিত করবে, আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তার ওপর থেকে অপরাধের শাস্তি রহিত করে দেবেন। ব্যবসা ছাড়া বিক্রয় রহিত করার কোনো উপায় ছিল না। এমনকি তিন মাসের মধ্যে কেউ বিক্রয় রহিত করার জন্য আসেনি। আজ সকালে একজন এসেছেন। পণ্য ফেরত রেখেছি। আমার উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেছে, তাই দোকান গুটাচ্ছি।’ এমনই ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন।

প্রশ্ন হতে পারে, এভাবে ফেরত না নেয়ার শর্ত জুড়ে দিয়ে পণ্য বিক্রয় করা কি নাজায়েজ? এমন শর্তে পণ্য বিক্রি করা জায়েজ। ক্রেতা এ শর্ত মেনে নিয়ে পণ্য ক্রয় করলে বিক্রেতা দায়মুক্ত হয়ে যাবেন। এবং ক্রেতাকেও অবশ্য পণ্যটি বুঝে নেয়ার সময় ভালোভাবে যাচাই করে বুঝে নিতে হবে। কারণ পণ্য বুঝে নিয়ে চলে যাওয়ার পর কোনো ত্রুটি প্রকাশ পেলে তিনি বিক্রেতাকে ধরতে পারবেন না এবং বিক্রেতা পণ্য ফেরত বা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেন না।’ (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মদ: ৩৩৭)

একজন মানুষ সাধারণত বিপদে পড়েই পণ্য ফেরত দিতে আসে। এ জন্য আমরা যদি বিক্রীত পণ্য ফেরত নেই, তাহলে হাদিসে ঘোষিত ফজিলতের অংশীদার হতে পারব।

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ