ঢাকা, শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

এখনই নিন হজের প্রস্তুতি

প্রকাশনার সময়: ১৩ মে ২০২২, ১১:৩০

করোনা মহামারির কারণে বিদেশি হজযাত্রীদের জন্য দীর্ঘ দুই বছর হজ পালন স্থগিত ছিল। এবার দুয়ার খুলেছে। হজে যেতে পারবেন ১০ লাখ বিদেশি মুসল্লি। সেই হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ৫৭ হাজার ৫৮৫ জন হজে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে বয়স হতে হবে ৬৫ বছরের কম। থাকতে হবে সৌদি সরকার নির্ধারিত টিকার যে কোনো দুই ডোজের সনদ। সুতরাং যারা হজে যেতে চান, তাদের এখন থেকেই নিতে হবে প্রস্তুতি।

মানসিক প্রস্তুতি

১. আপনি যদি হজে যাওয়ার সংকল্প করেন, তাহলে প্রথমে আপনার নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন। কেননা নিয়তের ওপরই আমল নির্ভরশীল। হাদিসে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই নিয়তের ওপর আমল নির্ভরশীল।’ (বুখারি : ১)

২. ছোট শিরক বুকে ধারণ করে হজ করলে হজ কবুল হবে না কথাটি ভালোভাবে স্মরণ রাখুন। তাই অহংকার থেকে মুক্ত থাকুন ও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন। তিনি যেন অহংকারমুক্ত হজ পালনের তাওফিক দান করেন। রাসুল (সা.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! এমন হজের তাওফিক দাও যা হবে রিয়া ও সুনাম কুড়ানোর মানসিকতা থেকে মুক্ত।’ (ইবনে মাজাহ: ৮৯০)

গুনাহ থেকে তওবা করুন

যেদিন থেকে হজ পালনের নিয়ত করেছেন সেদিন থেকেই মনে করবেন যে আপনার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ইতোপূর্বে যদি আপনি আল্লাহর হক নষ্ট করে থাকেন, সালাত, সিয়াম, জাকাত আদায় ইত্যাদির কোনোটিতে অবজ্ঞা-অনীহা-অমনোযোগ দেখিয়ে থাকেন তাহলে ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। সকল জানা-অজানা পাপ থেকে মুক্তি কামনা করে আল্লাহর দরবারে আহাজারি করুন। কাঁদুন। মুক্তিকামনা করুন হূদয় উজাড় করে, আল্লাহর সীমাহীন রহমত ও ক্ষমাশীল হওয়ার কথা খেয়াল রেখে। এখন আল্লাহর অধিকারের আওতাভুক্ত প্রতিটি বিষয়ই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে আদায় করুন। বিগত পাপ-অন্যায়ের জন্য তওবা করুন।

অন্যের হকের ব্যাপারে সচেতন হন

অপরাধ যদি বান্দার হক সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে তওবার পূর্বে তা মীমাংসা করে নিতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিয়ে হোক বা ক্ষমা চেয়ে হোক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সমবোঝতায় আসার পর তওবা করতে হবে। এর অন্যথা হলে তওবার দ্বারা কোনো ফল পাওয়া যাবে না।

মনে রাখবেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সঙ্গে সুরাহা না করলে কেয়ামতের দিন আপনার সমস্ত নেক আমল তার আমল-নামায় লিখে দেয়া হবে। নেক আমলের অনুপস্থিতিতে ওই ব্যক্তির পাপের বোঝা আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে। তাই এবিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। হজ করলেও হক্কুল ইবাদ ক্ষমা হয় না, যতক্ষণ না ক্ষতিপূরণ দিয়ে অথবা ক্ষমা চেয়ে ওই ব্যক্তিকে রাজি-খুশি করা হবে। কাউকে আর কোনো দিন অবৈধভাবে কষ্ট দেবেন না, কারো অর্থ-কড়ি বে-হালালভাবে কখনো খাবেন না এই প্রতিজ্ঞা করুন। মানুষের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিন।

হজ পালনাবস্থায় ঝগড়া-বিবাদ, বাকবিতণ্ডা নিষেধ। তাই পূর্ব থেকেই আপনার মধ্যে যাতে সহিষ্ণু মেজাজ গড়ে উঠে সে ব্যাপারে মানসিকভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।

হজের স্থানগুলো সম্পর্কে ধারণা নিন

হজর সফরের কষ্ট বর্তমান যুগের তুলনায় অতীতে হাজার গুণ বেশি ছিল, এ কথা ঠিক। তবে বর্তমানে কষ্ট একেবারেই হয় না তা নয়। কষ্ট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে যদি আপনি নিজে আগে থেকেই সতর্ক ও সজাগ থাকেন। ইন্টারনেট সহজলভ্যতার যুগে আছি আমরা। চাইলেই গুগল ও ইউটিউব থেকে দেখে ও পড়ে আমরা সব জায়গা সম্পর্কে ধারণা নিতে পারি। হজের সফরে তো বরং বর্ণনাতীত কষ্ট সহ্য করতে হয় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে। যেমন— আরাফা থেকে মুজদালিফায় আসবেন, বাস আসছে যাচ্ছে কিন্তু ভিড়ের কারণে উঠতে পারছেন না কোনোটাতেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে বাসে ওঠার সুযোগ পেলেন কিন্তু থাকতে হলো দাঁড়িয়ে, পথে সম্মুখীন হলেন অসম্ভব ভিড়ের। প্রচণ্ড গরম কিন্তু এসি নেই— এরকম হতে পারে। তাই পূর্ব থেকে প্রস্তুত থাকুন।

আল্লাহর জিকির

সুরা বাকারার ২০৩ আয়াতে হজে জিকিরের বিষয়ে উল্লেখ হয়েছে। হজের তাওয়াফ-সাঈ-কঙ্কর মারার বিধান আল্লাহর জিকিরের উদ্দেশে রাখা হয়েছে বলে হাদিসে এসেছে, সে হিসেবে হজের পুরো সময়টা যেন আল্লাহর জিকির ও আল্লাহর স্মরণে কাটে, সে জন্য শুরু থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে ও চর্চা অনুশীলন করতে হবে। ঘর-সংসার, স্ত্রী-সন্তান, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে দেখা যায় অনেককে। তাই এ বিষয়ে আগে থেকেই মনোযোগী হন ও আল্লাহর জিকিরে অভ্যস্ত হন।

সুন্নতের অনুসরণ

যে কোনো ইবাদত পালনের সময়, রাসুল (সা.)-এর পথ-পদ্ধতি অনুসরণ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা নবীজির আদর্শ বাদ দিয়ে নিজের অথবা অন্য কোনো ব্যক্তির বুদ্ধি-ধারণা অনুযায়ী খেয়াল-খুশি মতো ইবাদত করলে তা কবুল হবে না। তাই রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী প্রতিটি কর্ম যাতে সম্পাদন করতে পারেন, প্রশংসা ও প্রার্থনা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করতে পারেন সে জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকুন।

হজের তালবিয়া

হজের মূল স্ল্লোগান হলো তালবিয়া। তালবিয়া মুখস্থ করে নিন। এর মূল বক্তব্যই হলো আল্লাহ এক, আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্ব পরিচালনায় তিনি কাউকে অংশীদার হিসেবে নেননি। বা অংশীদার হওয়ার কারো কোনো যোগ্যতাও নেই। তাই প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। তিনিই একমাত্র ইবাদত পাওয়ার উপযোগী। সে হিসেবে হজ পালনকালে যেন কোনো শিরকের ছোঁয়া আপনার মন-মস্তিস্কে, চিন্তা-চেতনায় না লাগে সে ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। কেননা শিরক, ব্যক্তির ঈমান-ইসলামকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়।

দৃষ্টি সংযত রাখুন

হজে নানারকম মানুষ সমগ্র পৃথিবী থেকে এসে একত্রিত হয়। পুরুষের পাশে নারীদের সমাগম ঘটে সমানভাবে। অনেক নারী উন্মুক্ত চেহারায় চলাচল করেন, সালাত আদায় করতে আসেন। এদের অনেকেরই রয়েছে নজরকাড়া রূপ-লাবণ্য। এ ক্ষেত্রে আপনার দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পূর্ব থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায় সওয়াবে পরিবর্তে গুনাহ করে হজ থেকে ফিরে আসবেন।

স্বামী-স্ত্রীর জন্য করণীয়

স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে হজ করতে গেলে হজের দিনগুলোতে স্বামী-স্ত্রী সুলভ মেলা-মেশা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে হয়। তাই এ বিষয়ে উভয়ে খুব কঠিন সিদ্ধান্ত নিন এবং মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। অন্যথায় গোটা হজই নষ্ট হয়ে যাবে এ কথা মনে রাখবেন।

আর্থিক প্রস্তুতি

অবৈধ পন্থায় উপার্জিত অর্থে হজ করতে গেলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না। এ ধরনের ব্যক্তি ‘লাব্বাইক’ বললে আল্লাহ তার লাব্বাইক প্রত্যাখান করেন। তিনি বলেন, ‘তোমার কোনো লাব্বাইক নেই, তোমার জন্য সৌভাগ্যর বার্তাও নেই। তোমার পাথেয় হারাম, তোমার অর্থ-কড়ি হারাম, তোমার হজ গায়ের-মাবরুর, অগ্রহণযোগ্য।’ সে হিসেবে হজের প্রাথমিক প্রস্তুতিই হবে হালাল রুজি-রোজগারের মাধ্যমে নিজের ও পরিজনের প্রয়োজন মেটানো ও সম্পূর্ণ হালাল রিজিক-সম্পদ থেকে পাইপাই করে একত্রিত করা। যদি হালাল রিজিক উপার্জন করে হজে যাওয়ার মতো পয়সা জোগাড় করতে না পারেন, তবে আপনার ওপর হজ ফরজ হবে না।

হজে আপনাকে যেতেই হবে, কথা এ রকম নয়; বরং ঘর-সংসারের জরুরি প্রয়োজন মিটিয়ে হজে যাওয়ার খরচ হাতে আসলে তবেই কেবল হজ ফরজ হয়। তাই কখনো হারাম পয়সায় হজ করার পরিকল্পনা করবেন না। যদি এমন হয় যে আপনার সমগ্র সম্পদই হারাম, তাহলে আপনি তাওবা করুন। হারাম পথ বর্জন করে হালাল পথে সম্পদ উপার্জন শুরু করুন। আর কোনো দিন হারাম পথে যাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করুন। এক পর্যায়ে যখন প্রয়োজনীয় হালাল পয়সা জোগাড় হবে কেবল তখনই হজ করার নিয়ত করুন।

ঋণ থাকলে হজ করার পূর্বেই তা পরিশোধ করে দিন। তবে আপনি যদি বড় ব্যবসায়ী হন, ঋণ করা যার নিত্যদিনের অভ্যাস বা প্রয়োজন, তাহলে আপনার গোটা ঋণের ব্যাপারে একটা আলাদা অসিয়তনামা তৈরি করুন। আপনার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার যারা হবেন তাদের এ বিষয়ে দায়িত্ব অর্পণ করে যান।

নয়া শতাব্দী/এস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ