ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
মক্কা শরিফের খুতবা

পরকালে বিশ্বাসেই বিপদে মুক্তি

প্রকাশনার সময়: ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০১

একটি সর্বজন স্বীকৃত বাস্তবতা, প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস এবং ঈমানের অন্যতম স্তম্ভ হলো শেষ দিবস তথা পরকালে বিশ্বাস। তা হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে এবং ওই জগতে আল্লাহ যা প্রস্তুত রেখেছেন আনুগত্যশীলদের পুরস্কার ও অবাধ্যদের তিরস্কার- তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল পূর্ব বা পশ্চিম দিকে প্রত্যাবর্তিত করলেই তাতে পুণ্য নেই, বরং পুণ্য তার যে ব্যক্তি আল্লাহ, আখিরাত, ফেরেশতা, কিতাব ও নবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।’ (সুরা বাকারা: ১৭৭) তিনি আরো বলেন: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ও তাঁর ফেরেশতাদেরকে, তাঁর কিতাবসমূহকে, তাঁর রাসুলগণকে এবং শেষ দিবসকে অস্বীকার করে সে সীমাহীন পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।’ (সুরা নিসা : ১৩৬)

জিবরিল (আ.) নবী (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন ঈমান সম্পর্কে। তখন নবী (সা.) বললেন: ‘ঈমান হলো, আপনি বিশ্বাস স্থাপন করবেন- আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবগুলোর প্রতি, তাঁর রাসুলগণের প্রতি, শেষ দিবসের প্রতি এবং তাকদিরের ভালো-মন্দের প্রতি।’ (বর্ণনায় মুসলিম)

আখিরাতে ঈমানের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় সত্যবাদী ও সত্যায়নকারী মুমিন এবং মিথ্যাবাদী কাফেরের পরিচয়। কারণ এটিই গায়েবের প্রতি ঈমান। এটিই সন্দেহ ও সংশয় ছুড়ে ফেলে দেয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আলিফ লাম মিম। এটা ওই (মহান) কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকিদের জন্য পথনির্দেশ। যারা অদৃশ্য বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি তা থেকে দান করে থাকে।’ (সুরা বাকারা: ১-৩)

যখন মুশরিকরা শেষ দিবসকে অস্বীকার করল এবং এতে সন্দেহ করে বলল: ‘সে কি তোমাদের ওয়াদা দেয় যে, তোমরা যখন মারা যাবে এবং তোমরা মাটি ও হাড়ে পরিণত হয়ে যাবে- তোমাদেরকে অবশ্যই বের করা হবে? অনেক দূর, তোমাদের যে ওয়াদা দেয়া হয়েছে তা অনেক দূর। এ শুধু আমাদের

দুনিয়ার জীবন। আমরা মরি বাঁচি এখানেই। আর আমরা পুনরুত্থিত হবার নই।’ (সুরা মুমিনুন: ৩৫-৩৭)

আল্লাহ তখন তাদের জবাব দিলেন, তাদের ভ্রষ্টতা উন্মোচন করে দিলেন, শেষ দিবস আগমনের প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করলেন এবং তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বললেন: ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না? সুতরাং সত্যিকারের মালিক আল্লাহ মহিমান্বিত, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই; তিনি সম্মানিত আরশের অধিপতি।’ (সুরা মুমিনুন: ১১৫-১১৬)

আরো বললেন: ‘বল, নিশ্চয়ই (উঠানো) হবে, আমার প্রতিপালকের শপথ! তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে, অতঃপর তোমাদেরকে অবশ্য অবশ্যই জানিয়ে দেয়া হবে তোমরা (দুনিয়ায়) কী কাজ করেছ। এ কাজ (করা) আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।’ (সুরা তাগাবুন: ৭) আরো বলেছেন: ‘তারা আল্লাহর নামে শক্ত কসম খেয়ে বলে, ‘যার মৃত্যু ঘটে আল্লাহ তাকে পুনরায় জীবিত করবেন না।’ অবশ্যই করবেন, এটা তো একটা প্রতিশ্রুতি যা পূরণ করা তাঁর দায়িত্ব, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না। তিনি পুনরুত্থিত করবেন, যে বিষয়ে তাদের মতানৈক্য ছিল তা তাদেরকে স্পষ্টভাবে দেখানোর জন্য এবং যাতে কাফেররা জানতে পারে যে, তারাই ছিল মিথ্যাবাদী। আমি কোনো কিছু করার ইচ্ছা করলে সে বিষয়ে আমার কথা শুধু এই যে, আমি বলি, ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়।’ (সুরা নাহল: ৩৮-৪০)

এ দিবসকে ভুলে থাকার জন্য তিনি তাদের ভর্ৎসনা করেছেন, বিনিময়ে তিনিও তাদের ভুলে যাওয়ার কথা বলেছেন আর তাদের জাহান্নামে প্রবেশ এবং সাহায্যকারী হারিয়ে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন: (ওদেরকে বলা হবে,) ‘আজ আমি তোমাদেরকে ভুলে যাব যেমন তোমরা এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিলে। তোমাদের আশ্রয়স্থল হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।’ (সুরা জাসিয়া: ৩৪)

আল্লাহর বান্দারা, শেষ দিবস এমন এক দিন যা বান্দার জন্য হবে ভীতিপ্রদ। এর পদে পদে তাদের জন্য থাকবে বিস্ময়। এটি প্রচণ্ড হাঁকডাকের দিন। এটি পরিতাপের দিন। এটি সমবেত হওয়ার দিন। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘যেদিন মানুষ বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবে।’ (সুরা মুতাফফিফিন: ৬) সেদিন কবরস্থ সব বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে। অন্তরে যা আছে অর্জন করা হবে। যেদিন পৃথিবী তার কম্পনে কম্পিত হবে। যেদিন পৃথিবী তার বোঝা বের করে দেবে।

আল্লাহর বান্দারা, নিজ নিজ জাতির প্রতি নবীদের (আ.) দায়িত্বের একটি ছিল তাদেরকে শেষ দিবসে ঈমানের দাওয়াত দেয়া এবং এর অবস্থা ও ভয়াবহতা তুলে ধরা। কেননা শেষ দিবস স্মরণ করা মঙ্গল ও হেদায়েতের নিদর্শন এবং এ থেকে উদাসীন হওয়া অমঙ্গল ও পথভ্রষ্টতার প্রমাণ। বান্দা আখিরাতের ময়দানে প্রথম কদম রাখে তার মৃত্যু ও কবরস্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে। আর কবরে রয়েছে অগ্নিপরীক্ষা ও কঠিন ফিতনা। সেখানে বান্দাকে সম্মানিত করা হবে কিংবা লাঞ্ছিত। মুমিনকে তাওফিক দেয়া হবে এবং সম্মানিত করা হবে। কাফেরকে অপদস্থ করা হবে এবং শাস্তি প্রদান করা হবে।

আল্লাহর নবী (সা.) বলেন: ‘আমার প্রতি এ মর্মে ওহি প্রেরণ করা হয়েছে যে, ‘দাজ্জালের ন্যায় (কঠিন) পরীক্ষা অথবা তার কাছাকাছি বিপদ দিয়ে তোমাদেরকে কবরে পরীক্ষায় ফেলা হবে। (কবরের মধ্যে) বলা হবে, ‘এ ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কী জান?’ তখন মুমিন ব্যক্তি বা মুকিন (বিশ্বাসী) ব্যক্তি বলবে, ‘তিনি মুহাম্মদ (সা.), তিনি আল্লাহর রাসুল’। আমাদের কাছে তিনি মুজিজা ও হিদায়াত নিয়ে এসেছিলেন। আমরা তা গ্রহণ করেছিলাম, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিলাম এবং তাঁর অনুসরণ করেছিলাম। তখন তাকে বলা হবে, আরামে ঘুমিয়ে থাক, আমরা জানতে পারলাম যে, তুমি (দুনিয়ায়) তাঁর প্রতি বিশ্বাসী ছিলে।’ (বর্ণনায় বুখারি ও মুসলিম)

কবরে হয় শান্তি না হয় শাস্তি। এরপরে পুনরুত্থান এবং কেয়ামত সংঘটন: ‘আর কেয়ামত আসবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং কবরে যারা আছে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের পুনরুত্থিত করবেন।’ (সুরা হজ: ৭)

তারপর পুনরায় দেহে রুহ ফেরত দেয়া হবে। মাটি ফেটে তাদের বের করে দেবেন যেভাবে বের করে দেয় উদ্ভিত: ‘সেদিন তাদের থেকে পৃথিবী বিদীর্ণ হবে এবং লোকেরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকবে। এটি এমন এক সমাবেশ যা আমার পক্ষে অতীব সহজ।’ (সুরা ক্বাফ: ৪৪) আল্লাহ আরো বলেন: ‘তাঁর আরেকটি নিদর্শন হলো এই যে, তুমি পৃথিবীকে দেখতে পাও শুষ্ক-অনুর্বর, অতঃপর যখন আমি এর ওপর পানি বর্ষণ করি তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয়ই যিনি পৃথিবীকে জীবিত করেন তিনি মৃতদেরও জীবিতকারী। নিশ্চয় তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।’ (সুরা ফুসসিলাত: ৩৯)

এসব যখন হবে তখনই সংঘটিত হবে বৃহত্তম কেয়ামত। মানুষ তাদের কবর থেকে বিশ্বপ্রতিপালকের উদ্দেশে বেরিয়ে আসবে নাঙা পায়ে, উদাম শরীরে এবং খতনাবিহীন অবস্থায়। সূর্য তাদের একেবারে কাছে চলে আসবে। নিজেদের ঘামে তারা হাবুডুবু খেতে থাকবে। আমল পরিমাপ করার জন্য পাল্লা স্থাপন করা হবে। আল্লাহ বলেন: ‘যাদের (সৎ কাজের) পাল্লা ভারি হবে তারাই হবে সফলকাম। আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে; তারা জাহান্নামে স্থায়ী হবে।’ (সুরা মুমিনুন: ১০২-১০৩)

আমলনামা প্রকাশ করা হবে। কেউ নিজের আমলনামা ধরবে ডান হাতে, কেউ বাম হাতে, কেউ পেছন থেকে। আল্লাহ সুবহানাহু বলেন: ‘আর আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি এবং কেয়ামতের দিন তার জন্য আমি বের করব একটি কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। (তাকে বলা হবে) ‘পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তোমার হিসাব নেয়ার ব্যাপারে তুমিই যথেষ্ট।’ (সুরা ইসরা : ১৩-১৪)

অতঃপর আল্লাহ তাআলা সমগ্র সৃষ্টির হিসাব গ্রহণ করবেন। মুমিন বান্দাকে নিভৃতে নিয়ে যাবেন। সে নিজের অপরাধ দেখবে এবং স্বীকারও করে নেবে, তথাপি সে আল্লাহর রহমতের আশা করতে থাকবে। পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফিক কিছু স্বীকার করবে আর কিছু নিয়ে তর্ক করবে। তখন আল্লাহ সুবহানাহু তার কান, চোখ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়েই স্বীকার করাবেন সে কী করেছে। আল্লাহ বলেন: ‘আর তারা তাদের চামড়াগুলোকে বলবে, ‘কেন তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে’? তারা বলবে, ‘আল্লাহ আমাদের বাকশক্তি দিয়েছেন, যিনি সবকিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন। তিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁরই প্রতি তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।’

তোমরা কিছুই গোপন করতে না এই বিশ্বাসে যে, তোমাদের কান, চোখসমূহ ও চামড়াসমূহ তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে না, বরং তোমরা মনে করেছিলে যে, তোমরা যা কিছু করতে আল্লাহ তার অনেক কিছুই জানেন না। আর তোমাদের এ ধারণা যা তোমরা তোমাদের রব সম্পর্কে পোষণ করতে, তাই তোমাদের ধ্বংস করেছে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলে। অতঃপর যদি তারা ধৈর্যধারণ করে তবে আগুনই হবে তাদের আবাস এবং যদি তারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চায়, তবুও তারা আল্লাহর সন্তোষপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।’ (সুরা ফুসসিলাত: ২১-২৪)

অতঃপর তাদের সামনে উন্মোচিত করা হবে জাহান্নাম। সেখানে তাদের সমবেত করা হবে এবং তারা তার ভেতর পতিত হতে থাকবে। পক্ষান্তরে মুমিনরা পেছনে থাকবে যেন সম্মানিত হাউজের কাছে উপনীত হতে পারে। আমাদের নবীর (সা.) হাউজ। যার পানি হবে দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি। যা পানের পাত্র হবে আসমানের তারকার মতো অসংখ্য।

৪ জমাদিউল আখিরাহ ১৪৪৩ হিজরি মোতাবেক ৭ জানুয়ারি ২০২২ মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার অনুবাদ আলী হাসান তৈয়ব।

নয়া শতাব্দী/এম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়