ঢাকা | শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

নবীজিকে কোলে ধারণকারী উম্মে আইমান (রা.)

উম্মেহানি বিনতে আবদুর রহমান
প্রকাশনার সময়: ১৩ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৪৯

দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বে পূর্ণ মানসিক তৃপ্তি লাভের বাসনা মানে বেখেয়ালে কল্পলোকে উদ্ভ্রন্তের মতো ছুটে চলা। একমাত্র রব্বে কারিম ছাড়া কোনো কিছুকেই সবদিক থেকে ভালোবাসা সম্ভব নয়; দুঃখ-দুর্দশার চড়া গন্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে অবশ্যই জান্নাতি মানুষদের জীবনী জানতে হবে, কেমন ছিলেন তারা? ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় রয়েছে সে বর্ণনা। ইসলামের ইতিহাস; সোনালি দিনের ঘটনাবলিকে সৃজনশীলতার উৎকর্ষে এক অন্যরকম বিশিষ্টতার রূপ দিয়েছে।

রাসুল (সা.)-এর জীবনের একজন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ ছিলেন নাজদিয়া। তার জন্ম সিরিয়া রাজ্যের রামাল্লা শহরে, মতান্তরে ইথিওপিয়ায়। পিতা ফররুখ ইবনে মাসরুখ, মাতা উযরা। ইতিহাসবিদদের মতানুযায়ী দস্যু কর্তৃক আক্রমণের শিকার হয়ে মক্কার দাস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হন তিনি। ঘটনাক্রমে রাসুল (সা.)-এর পিতাগৃহের কাজ-কর্মের জন্য নয় কি দশ বছরের নাজদিয়াকে খরিদ করা হয়েছিল।

রাসুল (সা.)-এর সম্মানিত মা (আমেনা) লক্ষ করেন নাজদিয়া আসার পর গৃহে রহমত-বরকত পূর্বের তুলনায় বেড়ে গেছে, তাই নাজদিয়ার নতুন নাম দেন বারাকাহ। কৃষ্ণ বর্ণের বারাকাহ এভাবেই নবী পরিবারের একজন সদস্য হয়ে ওঠেন। অতঃপর রাসুল (সা.)-এর যখন জন্ম হয় তখন তিনি আমেনার পাশেই ছিলেন, বারাকাহ রাসুল (সা.) কে আমেনার কোলে তুলে দেন আর বলেন, ‘আমি কল্পনা করেছিলাম সে চাঁদের মতো সুন্দর হবে, এখন দেখছি চাঁদের চেয়েও সুন্দর।’ রাসুল (সা.)-এর জন্মের সময় প্রথম রাসুল (সা.)-কে যিনি স্পর্শ করেছিলেন তিনি এই সৌভাগ্যের অধিকারী নারী বারাকাহ। রাসুল (সা.)-এর মায়ের সঙ্গে তিনি রাসুল (সা.) কে গোসল করিয়েছেন, দেখাশোনা করেছেন। নবী (সা.)-এর মায়ের মৃত্যুর পর ছোট্ট বয়সেই রাসুল (সা.) দাস প্রথার বিলুপ্তি চেয়েছেন, রাসুল (সা.) বলেছেন উম্মি (হাবিবে রাসুল উম্মি বলে সম্বোধন করতেন) আপনি মুক্ত, যেখানে খুশি যেতে পারেন। কিন্তু তিনি যেতে চাননি; কারণ মৃত্যুর সময় আমেনাকে কথা দিয়েছিলেন রাসুলের দেখাশোনা করবেন বলে। হাবিবে রাসুল বিয়ের পর স্ত্রী খাদিজা (রা.)-কে বারাকাহ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ইনি আমার মায়ের পর আরেক মা’। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও খাদিজা (রা.) দু’জন মিলে (বারাকাহ) তাকে উবাইদ ইবনে জায়েদের সঙ্গে বিয়ে দেন। এরপর তাদের একটি পুত্র সন্তান হয় নাম আইমান, মক্কার সংস্কৃতি ছিল সন্তানের নামে মায়ের পরিচিতি, সে সূত্রে বারাকাহর নতুন নাম হয় উম্মে আইমান।

উম্মে আইমানের প্রতি রাসুল (সা.)-এর শ্রদ্ধার কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা

উবাইদ ইবনে জায়েদের মৃত্যুর পর রাসুল (সা.) সাহাবিদের বললেন, আমি একজন নারীকে জানি যার কোনো সম্পদ নেই, বয়স্ক এবং সঙ্গে একজন ইয়াতিম সন্তান আছে কিন্তু তিনি জান্নাতি, তোমাদের মধ্যে কেউ কি জান্নাতি নারীকে বিয়ে করতে চাও?

এ বক্তব্যের পর জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.) নবীজীর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অতঃপর উম্মে আইমান (রা.)-এর মত অনুযায়ী বিয়ে হয়। রাসুল (সা.) জায়েদ ইবনে হারিসকে বলেন, জানো তুমি কাকে বিয়ে করেছ? জায়েদ (রা.) বলেন, উম্মে আইমানকে।

রাসুল (সা.) অত্যন্ত খুশির সঙ্গে বললেন, না তুমি বিয়ে করেছ আমার মাকে।

মদিনায় হিজরতের পর দীর্ঘ যাত্রা শেষে যখন উম্মে আইমান ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন তখন হাবিবে রাসুল (সা.) নিজের গায়ের চাদরের এক অংশ ভিজিয়ে উম্মে আইমান (রা.)-এর মুখের ঘাম ও ধুলাবালু মুছে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ‘উম্মি জান্নাতে আপনার এমন কোনো কষ্ট হবে না।’

রাসুল (সা.)কে খাবার নিয়ে জোর করলে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন; উম্মে আইমান একমাত্র নারী যিনি রাসুল (সা.)কে খাবারের কথা বারবার বলতেন।

উম্মে আইমানের আরেক ছেলে উসামা ইবনে যায়িদ, যিনি অনেক যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করেন। ক্রীতদাসী মায়ের সন্তানকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে রাসুল (সা.) কুরাইশদের অহঙ্কারী আভিজাত্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দেন।

মৃত্যুর পূর্বে রাসুল (সা.) সাহাবিদের বলেছিলেন, ‘উম্মে আইমানের যত্ন নেবে, তিনিই একমাত্র নারী যিনি আমাকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দেখেছেন।’

প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওফাতের পর; ইসলামের প্রথম খলিফা আবুবকর সিদ্দিক (রা.) ওমর বিন খাত্তাব (রা.) কে বললেন, ‘চলুন আমরা উম্মে আইমানের সঙ্গে দেখা করতে যাই, যেমন নবীজি (সা.) দেখা করতে যেতেন।’

অতঃপর উভয়েই যখন তার কাছে পৌঁছালেন তখন তিনি (উম্মে আইমান) কেঁদে ফেললেন। তারা তাকে বললেন, ‘আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি কি জানেন না যে আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তা রাসুল (সা.) এর জন্য দুনিয়া থেকে অধিক উত্তম?’

উম্মে আইমান বললেন, আমি এ জন্য কাঁদছি যে আসমান থেকে ওহি আসা বন্ধ হয়ে গেল। উম্মে আইমান তার এই কথার দ্বারা উভয়কেই কাঁদতে বাধ্য করলেন, ফলে তারাও তার সঙ্গে কাঁদতে লাগলেন। (সহিহ মুসলিম : ২৪৫৪; ইবন মাজাহ : ১৬৩৫)

নবীজির প্রতি উদ্বেলিত ভালোবাসা

জান্নাতি নারী হজরত উম্মে আইমান (রা.) মক্কা বিজয়ের সময় বালক পুত্র যায়েদকে নবীজির (সা.) খাদেম হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। একজন এসে বললেন, ‘তোমার ছেলে যদি কাফেরদের হাতে শহীদ হয়?’ উত্তেজিত কণ্ঠে উম্মে আইমান (রা.) বলেছিলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছে হলে শহীদ হবে, আল্লাহ যদি আমাকে একটি সন্তান না দিয়ে এক হাজার সন্তান দিতেন তবে প্রতিটি সন্তানকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে কোরবান করে দিয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতাম।’

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন