ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

সংসার ভাঙা নয়; জোড়া দিন

মঈদুদ্দীন তাওহীদ
প্রকাশনার সময়: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:১৭

বেশ কদিন থেকেই নিউজফিডে একটা নিউজ বারবার ঘুরছে; শ্বশুরের আঘাতে যুবকের মৃত্যু। এ ছাড়াও বাংলাদেশের নিউজপোর্টাল, ইলেট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে প্রতিনিয়তই এমন নানান ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে। সমাজে তালাক তথা বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা হু-হু করে বাড়ছে। তালাকের এ ‘ঊর্ধ্বগতি’ যেন কোনোভাবেই থামছে না। নিউজগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, বিষয়টা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।

পিতা-মাতা, মেয়ে-ছেলে থেকে শুরু করে সমাজের হর্তাকর্তাদেরও বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। এটা অবশ্য ভালো। কোনো একটা সংকটে সবাই চিন্তিত হওয়া প্রশংসার দাবি রাখে। তবে সেই চিন্তা থেকে তথাকথিক সুশীল সমাজ, নারী অধিকার রক্ষাকারী সংগঠন ও সামাজিক সংস্থাগুলো যে প্রতিকার দিচ্ছে, এর কোনোটাই কাজ করছে না; বরং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় চলমান সমস্যা দিনদিন আরো প্রকট হয়ে উঠছে।

ইসলামেই রয়েছে এর সুষ্ঠু সমাধান। যুগযুগ থেকে প্রমাণিত, ইসলামের প্রণীত এই সমাধান দুরারোগ্য ব্যাধি মনে করা এই সমস্যায় কাজ করেছে অব্যর্থভাবে। তিক্ত হলেও সত্য ব্যক্তিজীবনে আমরা ইসলামের এই অনুশাসনকে অবহেলা করছি বলেই এর মাশুল দিচ্ছে আমাদের অধুনা প্রজন্ম।

দাম্পত্য জীবন কী

দাম্পত্যজীবন একজন নারী ও পুরুষকে একীভূত করে। তবে হ্যাঁ, এর অর্থ এ নয়, তাদের ব্যক্তিত্ব, চিন্তা, অভ্যাস, যোগ্যতা ও রুচি সব এক হতে হবে। এটা অস্বাভাবিক। স্বাভাবিক হলো তাদের ভিন্ন-ভিন্ন কর্মপদ্ধতি; আশা-আকাক্সক্ষা, চাহিদা ও আগ্রহের বৈচিত্র্য। দুটি হৃদয় যখন ইসলামের শ্বাশত সৌন্দর্য ও মুগ্ধতায় একটি সুতোয় গেঁথে যায় তখন গড়ে ওঠে এক অন্যরকম ভালোবাসা।

দাম্পত্য জীবন এক উত্তাল সমুদ্রের ন্যায়। যেখানে রয়েছে প্রলয়ংকারী ঢেউ, প্রশান্ততার শান্তি, অশান্ত ঝড়, যেখানে রয়েছে অনাবিল আনন্দ আর যাতনাময় কষ্ট-ক্লেশ, মান-অভিমান, আর আনন্দ উল্লাসের মিশ্র পরিবেশ। আর স্বামী স্ত্রী উভয়েই যেন এই উত্তাল সমুদ্রে জীবনের নাও ভাসিয়ে দেয়। তাই প্রয়োজন, পরস্পর সহায়তা ও নিরাপত্তার যাবতীয় সামগ্রী সংগ্রহ করা। যাতে উভয়ে সহীহ সালামতে এই সাগর পাড়ি দিয়ে নিজেদের শেষ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে।

মনে রাখতে হবে, সময়ের চাকা ঘূর্ণায়মান। তা একরকম থাকে না। জীবন নদীর প্রবাহ এক ধারায় চলে না। জীবনের কোনো কিছুই একরকম থাকে না। এক গতিতে প্রবাহিত হয় না কোনো নদীর জলস্রোতে।

সময়ের গতি-পরিবর্তনে মানুষের সম্পর্ক, তাদের অভ্যাস ও আশা-আকাক্সক্ষার মধ্যেও পরিবর্তন সূচিত হয়। কখনো সেখানে প্রফুল্লতার মৃদু সমীরণ প্রবাহিত হয়। আবার কখনো অশান্তির ঝড়ো হাওয়া, উত্তেজনা, স্থিরতা, কঠোরতা ও নম্ররতার দোলাচলে জীবনচাকাও ঘুরতে থাকে। কখনো দুটি হৃদয়ে বাদানুবাদ হয়, মনোমালিন্যও ঘটে।

তাহলে কী করণীয়?

স্বামী-স্ত্রী উভয়ে বুঝশক্তিসম্পন্ন, সহনশীল ও ধৈর্যশীল হলে অনেক সময় তারা নিজেরাই এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেন। নিজেদের মধ্যেই সব সমাধান করে নিয়ে আবারো পাল তুলতে পারেন জীবনতরীতে। কিন্তু, অনেক দম্পতি বয়সে অপরিপক্ক, দাম্পত্য জীবনের হালচাল সম্পর্কে বেখবর এবং ব্যক্তিগত অবস্থানকে ঠিক রাখতে গিয়ে সেই সংকটকে কাটিয়ে উঠতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হয় পরিবারের কর্তাকে; শ্বশুর-শাশুরিসহ উভয় পক্ষের পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু আফসোস! আজ পরিবারের সদস্যরাই যেন সম্পর্ক ভাঙতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, একটি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে, একটি ঘরকে সুখে রাখার লক্ষ্যে কেউ যেন নমনীয় হতে চায় না এক বিন্দুও।

শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের হতে হবে বিচক্ষণ নমনীয়

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য হলে পরিবারের সদস্যদের কী ভূমিকা রাখতে হবে, কীভাবে নিজের ব্যক্তিত্বের দিকে না তাকিয়ে একটি সম্পর্কে সুখী করে তোলার অনন্য লক্ষ্যে এগুতে হবে, সেই দীক্ষা দিয়েছেন নবীজি (সা.)। আলী (রা.)-এর সাথে ফাতিমার দাম্পত্যজীবনও ছিল এমন বৈচিত্র্যময়। হয়েছিল মনোমালিন্য। কিন্তু নবীজি উভয়ের মধ্যে বনিবনা করে দিয়েছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত তারবিয়াতে।

সাহল ইবনে সাদ বলেন, রাসুল (সা.) একবার ফাতিমার ঘরে এলেন। আলীকে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার চাচার বেটা কোথায়?’ ফাতিমা বললেন, ‘আমার সঙ্গে তার কিছু একটা হওয়ায় রাগ করে বের হয়ে গেছে। বিশ্রামও নেয়নি।’ তখন রাসুল (সা.) একজনকে বললেন, ‘দেখ তো কোথায় গেল সে?’ তিনি দেখে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, তিনি মসজিদে শুয়ে আছেন।’ রাসুল (সা.) মসজিদে গিয়ে দেখেন, আলী মাটিতে শুয়ে আছেন। চাদর একদিকে পড়ে আছে। শরীরে মাটি লেগে আছে। নবীজি (সা.)এর কাছে গিয়ে শরীর থেকে মাটি মুছতে মুছতে বললেন, ‘হে আবু তুরাব (মাটিওয়ালা), ওঠো! আবু তুরাব, ওঠো।’ (বুখারী : ৪৪১; মুসলিম : ২৪০৯)

দেখুন, ফাতিমা ও আলীর মাঝে কিছু একটা নিয়ে বাদানুবাদ হলে আলী (রা.) রাগ করে ঘর ছেড়ে মসজিদে চলে গিয়েছিলেন। রাসুল (সা.) তার ব্যক্তিত্বের দিকে তাকাননি। তিনি তার প্রিয় জামাতার কাছে এসে তাকে কাছে টেনে নিয়েছেন, রসিকতা করেছেন। তার রাগ ভাঙিয়েছেন। আলী যাতে খুশী হন, তাই তার শরীর থেকে মাটি ঝেড়ে দিয়েছেন।

অবশ্যই মেয়ের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল তুলনামূলক বেশি। তাই বলে তিনি মেয়ের সামনে জামাতাকে বিন্দুমাত্র তিরস্কার করেননি। সুতরাং বোঝা যায়, জামাতাদের প্রতি উদারতা ও ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকাও মুস্তাহাব। কেননা, যে হিংসুক, সেই কেবল তিরস্কার করতে পারে। কিন্তু যে সব মিটমাট করতে চায়, তার থেকে কখনো তিরস্কার কাম্য নয়।

আমর ইবনে সায়িদ বলেন, একবার আলী (রা.)-এর সাথে কঠোরতা দেখালে ফাতিমা এই বলে রাসুলের দিকে হাঁটা দিলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি তোমার নামে রাসুলের কাছে নালিশ করবো।’ আলীও তার পিছু-পিছু গেলেন। ফাতিমা গিয়ে রাসুলের কাছে নালিশ করলেন। রাসুল (সা.) মেয়েকে খুশী করার জন্য, তার মন রক্ষার্থে, কোমলভাবে তাকে বুঝিয়ে বললেন, ‘দেখ, স্বামীর প্রতি সদয় হতে হবে। তার আচরণে ধৈর্য ধরতে হবে!’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘মেয়ে আমার, মনোযোগ দিয়ে শোনো! বোঝার চেষ্টা করো! স্বামীর আশানুপাতে কাজ না করলে সে তো আর চুপ থাকবে না!’ এদিকে আলী (রা.) এ কথাগুলো শুনছিলেন।

তিনি যখন দেখলেন, রাসুল তাকেই মূল্যায়ন করছেন, তখন তার রাগ-অভিমান নিমিষেই সব উবে গেল। পুরুষালি ভাব বজায় রেখেই তিনি বললেন, ‘এতক্ষণ যা করছিলাম তা থেকে আমি ক্ষান্ত হলাম। আল্লাহর শপথ! ফাতিমা অপছন্দ করে এমন কোনো আচরণ আমি আর করবো না।’ (ইবনে সাদ : ৮/২৬)

এ ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে উভয়পক্ষের জন্যই শিক্ষার অনন্য উপাদান। এ শিক্ষা শুধু মেয়েপক্ষের লোকজনের জন্য নয়; ছেলেপক্ষের লোকজনের জন্যও। মূলনীতি হলো, মিটমাট করার স্বার্থে ছেলের আত্মীয়রা মেয়ের প্রতি সহমর্মিতার ভাব দেখাবে; মেয়ে পক্ষ ছেলের প্রতি।

নুমান ইবনু বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু বকর (রা.) একবার নবীজির গৃহে এসে শুনতে পান আম্মাজান আয়েশা নবীজির ওপর উঁচু গলায় কথা বলছেন। গৃহে ঢুকেই তিনি আয়েশাকে থাপ্পড় মারতে উদ্যত হন। শক্তকণ্ঠে বলেন, ‘কত বড় স্পর্ধা, নবীজির ওপর উঁচু গলায় কথা বলছে?’ নবীজি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তার হাত ধরে ফেলেন। নবীজির কারণে সায়্যিদুনা আবু বকর মেয়ে আয়েশাকে মারতে না পেরে রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

আবু বকর বেরিয়ে গেলে নবীজি আম্মাজান আয়েশার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘দেখলে তো, কীভাবে তোমাকে তার হাত থেকে বঁাচালাম।’ এরপর অনেক দিন আবু বকর রাগ করে আয়েশার গৃহে যাননি। বেশকিছুদিন পর গিয়ে দেখেন উভয়ের মধ্যে মিটমাট হয়ে গেছে। সায়্যিদুনা আবু বকর এ সময় মেয়ে আর জামাতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তোমাদের মধ্যকার যুদ্ধাবস্থায় যেমন আমি প্রবেশ করেছি, এবার শান্তিবস্থায়-ও আমাকে প্রবেশ করিয়ে নাও!’ নবীজি আনন্দিত হয়ে বললেন, ‘অবশ্যই! অবশ্যই আমরা এমনটি করব।’ (আবু দাউদ : ৪৯৯৯)

জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রা.) বলেন, ‘একদিন আবু বকর এসে দেখেন নবীজির গৃহের সামনে বেশকিছু লোক বসে আছে। কাউকেই প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। আবু বকরও অনুমতি চাইলেন। তাকে অনুমতি দেয়া হলো। এর পরপরই উমর আসেন। অনুমতি চাইলে তাকেও অনুমতি দেয়া হয়। দু’জন ঘরে ঢুকে দেখেন নবীজি বসে আছেন। চারপাশে বসে আছে তার স্ত্রীগণ। সবাই চুপ। গাম্ভীর্যে ঢাকা পুরো ঘর। আবু বকর মনে মনে বললেন, ‘আমি নবীজিকে হাসাবো।’ এ উদ্দেশে তিনি বলে ওঠেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আপনি যদি খারিজার মেয়ের (আবু বকরের বিবি হাবিবা) বিষয়টা একটু দেখতেন। সে আমার কাছে ভরণ-পোষণ চেয়েছিল; কিন্তু আমি উঠে গিয়ে তার ঘাড়ে ঘুষি মেরেছি।’ এ কথা শুনতেই নবীজি হেসে দিলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘এই আমার চারপাশে যাদের দেখছ, তারাও আমার কাছে খরপোশ চাচ্ছে, এখন কি করব বলো!’ নবীজির কথা বলা শেষ হওয়া মাত্রই আবু বকর অগ্রসর হয়ে মেয়ে আয়েশার ঘাড়ে আঘাত করলেন। উমরও অগ্রসর হয়ে হাফসার ঘাড়ে আঘাত করলেন। দু’জনই বলে উঠলেন, ‘কত বড় স্পর্ধা! রাসুলের কাছে নেই, তারপরও তোমরা তার কাছে এমন জিনিস দাবি করছ!’ রাসুলের স্ত্রীগণ সকলেই বলে উঠলেন, ‘আল্লাহর শপথ করে বলছি, রাসুলের কাছে নেই এমন জিনিস আর কোনোদিন আমরা তার কাছে চাইব না!’ (মুসলিম : ১৪৭৮)

দু’জনের মধ্যে মিটমাট করে দেয়াকে নিজের জন্য সৌভাগ্যের কারণ মনে করা প্রয়োজন

আমার মেয়ের জামাতা দোষ করেছে, আমি কেন যাব। আমার পুত্রবধূ দোষ করেছে, আমি কেন নাক গলাব; অনেক ভদ্রলোক এমনটা ভেবে থাকেন। দু’জনের মধ্যে সম্পর্ক পোক্ত করার উদ্দেশে উভয়কে নিয়ে বসা বা সন্তানের শ্বশুরবাড়িতে যেতে লজ্জাবোধ করেন। এগুলো তাদের আত্মসম্মানবোধে আঘাত হানে। অথচ ইসলাম আমাদেরকে এমনটা শেখায় না।

নবীজিকে দেখুন, হাবীব ইবনে আবি সাবিত বলেন, আলী ও ফাতিমার মাঝে একবার মনোমালিন্য হলো, রাসুল (সা.) আসলেন। তার জন্য বিছানা বিছিয়ে দেয়া হলে তিনি তাতে শুয়ে পড়লেন। একটু পরে ফাতিমা এসে তার একপাশে, আর আলী এসে অন্যদিকে শুয়ে পড়লেন। রাসুল (সা.) এবার আলী ও ফাতিমার হাতদুটো টেনে এনে নিজের পেটের ওপর ধরে রাখলেন। অভিমান ঝেড়ে ফেলার আগ পর্যন্ত তিনি হাত আর ছাড়লেন না! ধরেই রইলেন। সব মিটমাট করেই তিনি বের হলেন। কেউ একজন রাসুলকে বলল, ‘আপনি ঢুকলেন এক অবস্থায়, এখন বের হলেন তো আমরা আপনার চেহারায় খুশির উচ্ছ্বাস দেখছি। কারণ কী?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমার দুই প্রিয়স্পদের মাঝে মিটমাট করার পরেও কি আমি খুশী হব না?’ (প্রাগুপ্ত,; ইসাবাহ, ৪/৩৬৮)

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন