ঢাকা | শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২ আশ্বিন ১৪২৮

আগুন যাকে পোড়াতে পারেনি...

আরাফাত শাহীন

প্রকাশনার সময়

১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:১০

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবদ্দশায় দু’জন ভণ্ড নবীর আর্বিভাব হয়। তাদের একজন হলো আসওয়াদ আনসি- যে আবির্ভূত হয়েছিল ইয়েমেনে এবং রাসুল (সা.) এর সময়েই নিহত হয়। আরেকজন হলো কুখ্যাত মুসাইলামা কাযযাব; যার আবির্ভাব হয়েছিল ইয়ামামায় এবং আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহুর শাসনামলে নিহত হয়।

আসওয়াদ আনসি নানারকম ভেলকিবাজি দেখিয়ে গ্রামের সরলমনা মানুষদের বিভ্রান্ত করে তার দলে ভেড়াতে থাকে। একদিকে সে যেমন ছিল ভীষণ চতুর, অপরদিকে ছিল জুলুমবাজ স্বৈরশাসক। তার অত্যাচারে গোটা ইয়েমেনে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। সে জোর করে মানুষের কাছ থেকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করতো। কেউ যদি তাকে নবী হিসেবে মানতে অস্বীকার করতো, তাহলে তার ওপর নেমে আসতো অত্যাচারের স্টিমরোলার। ফলে মানুষ ভয়ে হলেও তার দাবি মেনে নিতে বাধ্য হতো। তবে এরকম জুলুমবাজির মধ্যেও অনেকেই নিজের ঈমানকে অতি যতনে সুরক্ষিত রাখতে পেরেছিলেন। তারা কিছুতেই আসওয়াদ আনসির পাতা ফাঁদে পা দেননি। আর আল্লাহ তায়ালাও তাদের ওপর রহমতের বারিধারা বর্ষণ করেছেন। তেমনই একজন মহান মানুষ হলেন আবু মুসলিম খাওলানি (রহ.)।

খ.

রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবিত থাকতেই আবু মুসলিম খাওলানি (রহ.) ইসলাম গ্রহণের সুযোগ লাভে ধন্য হয়েছিলেন। তবে নিয়তির লিখনে ছিল না যে তিনি নবীজি (সা.) এর সান্নিধ্য লাভ করবেন। আর এটা এমনই এক মহা সৌভাগ্য যে কেউ কখনো জোর করে তা লাভ করতে পারে না! তবে আল্লাহ তায়ালা তার কপালে এমনই এক সৌভাগ্য লিখে রেখেছিলেন যার কারণে তিনি চিরদিনের জন্য আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছেন।

ভণ্ড আসওয়াদ আনসি যে সময়ে নবুয়্যতের মিথ্যা দাবি করেছিল, তার আগেই ঈমান ও আমলের দিক দিয়ে আবু মুসলিম খাওলানি (রহ.) পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাই আসওয়াদ আনসি অনুভব করলো, যদি খাওলানিকে তার দলে ভেড়ানো যায়, তাহলে তার পথ অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায়।

আসওয়াদ আনসি একদিন আবু মুসলিম খাওলানি (রহ.)-কে তার দরবারে ডেকে পাঠালো। তিনি এসে উপস্থিত হলে আসওয়াদ আনসি তাকে জিগ্যেস করলো, ‘তুমি কি এই সাক্ষ্য দাও যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল?’

তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, ‘হ্যাঁ’।

এরপর আসওয়াদ আনসি জিগ্যেস করলো, ‘তুমি কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আমি আল্লাহর রাসুল?’

তিনি জবাবে বললেন, ‘আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।’

আসওয়াদ আনসি পুনরায় এই প্রশ্ন জিগ্যেস করলো তিনি একই উত্তর দিলেন।

তারপর বিশাল এক অগ্নিকু- তৈরি করা হলো। আসওয়াদ আনসিকে নবী হিসেবে মানতে অস্বীকার করায় আবু মুসলিম খাওলানি রহ.-কে এতে নিক্ষেপ করা হবে। আসওয়াদ আনসি ভেবে দেখলো, এরকম ব্যক্তি জীবিত থাকা তার জন্য ভীষণ ক্ষতিকর।

অনেক অনেক বছর আগে মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.)ও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। তিনি এক আল্লাহর ওপর ঈমান আনার কারণে নমরুদের রোষাণলে পড়েছিলেন। আর আবু মুসলিম খাওলানি (রহ.) মুহাম্মাদ (সা.)কে একমাত্র সত্যনবী হিসেবে মেনে নেয়ার কারণে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন। আল্লাহ তায়ালা তার খলিল ইবরাহিম (আ.)কে জ্বলন্ত অগ্নিকু- থেকে নিরাপদে বের করে এনেছিলেন। আগুন তার জন্য হয়ে গিয়েছিল ফুলের বাগান।

তাহলে এবার কী ঘটতে চলেছে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এক উম্মতের ভাগ্যে? ঈমানের দৃঢ়তা যেমন ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করেছিল, তেমনি আবু মুসলিমের জন্যও অনুরূপ কাজ করলো। আগুন তার কোনো ক্ষতিই করতে পারলো না। ইবরাহিম (আ.)-এর মতো তিনিও পুষ্পের হাসি হাসতে হাসতে আগুনের ভেতর থেকে বের হয়ে এলেন। এমন অভাবনীয় দৃশ্য দেখে ভীষণ ঘাবড়ে গেল আসওয়াদ আনসি। সে এখন কী করবে! এই মানুষটিকে যে হত্যা করার সাধ্য তার নেই; তা সে বেশ ভালোমতোই বুঝতে পেরেছে। লোকজন তাকে পরামর্শ দিয়ে বলল, ‘তাকে আপনি ইয়েমেন থেকে বের করে দিন। তা না হলে সে আপনার বিরুদ্ধে লোকজনকে ক্ষেপিয়ে তুলবে।’

আসওয়াদ আনসি আবু মুসলিমকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তিনি নিজেও অবশ্য এই হতভাগা থেকে দূরে থাকতে চাচ্ছিলেন। তিনি প্রিয় নবীর শহর মদিনার দিকে এগিয়ে চললেন।

গ.

মসজিদে নববীর একটি খুঁটির কাছে দাঁড়িয়ে নিবিষ্টমনে নামাজ আদায় করছেন একজন আগন্তুক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ততদিনে পৃথিবীর সফর শেষ করে মহান রবের সান্নিধ্যে পৌঁছে গিয়েছেন। আবু বকর (রা.) খিলাফতের আসন উজ্জ্বল করেছেন। উমর ফারুক (রা.) তাকে দেখে এগিয়ে এলেন। নামাজ শেষ হলে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কোথা থেকে এসেছেন?’

তিনি বললেন, ‘ইয়েমেন থেকে।’

‘মিথ্যুক আসওয়াদ আনসি আমাদের যে ভাইকে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল, সে লোকটি কে?’

তিনি বললেন, ‘তার নাম আব্দুল্লাহ ইবনু সাওব’ (এটি আবু মুসলিম খাওলানি রহ.-এর প্রকৃত নাম)।

উমর (রা.) বুঝে গেলেন ইনিই সেই ব্যক্তি।

তিনি আল্লাহর কসম দিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনিই কি সেই লোক নন?’

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’।

উমর (রা.) তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। তারপর নিয়ে গেলেন মুসলিম জাহানের খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কাছে। তিনি পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। তারপর ফারুকে আজম (রা.) বললেন, ‘আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া যে, মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে এই উম্মতের এমন এক ব্যক্তির দর্শনের সৌভাগ্য দান করেছেন, যার সঙ্গে তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর অনুরূপ আচরণ করেছেন।’

ঘ.

রাসুলুল্লাহ (সা.) গত হয়েছেন দেড় হাজার বছর হয়ে গেল। তার সাহাবিগণও ফিরে গিয়েছেন আপন গন্তব্যে। প্রথম যুগের মুমিন বান্দাগণের সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্যও আমাদের হয়নি। তবে আল্লাহর কিতাব জীবন্ত অবস্থায় রয়েছে আমাদের কাছে। নবীজি (সা.) এর পুরো জীবনী উপস্থিত রয়েছে আমাদের সামনে। ইসলামের ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়েছে মহান সেসব মানুষের গল্প, যারা নিজেদের আত্মত্যাগের কারণে অমর হয়ে রয়েছেন মানুষের হৃদয়ে।

আবু মুসলিম খাওলানি (রহ.)-কে কি আমরা কখনো ভুলতে পারবো? কখনোই নয়। কারণ, তারা হলেন আমাদের অস্তিত্ব। আমরা যেদিন তাদের ভুলে যাব, সেদিন আমাদের আর পরিচয় বলে কিছুই থাকবে না।

যুগে যুগে যারাই আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিয়েছেন, নবীজি (সা.)কে একমাত্র অনুসরণীয় ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন- তাদের ওপরই নেমে এসেছে অত্যাচারের খড়গ। কখনো তাদের নিক্ষেপ করা হয়েছে অগ্নিকু-ে, কখনো ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে জ্বলন্ত তেলে, কখনো আগুনঝরা রোদে মরুভূমির তপ্ত বালুতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আরো কত রকমের অত্যাচার যে করা হয়েছে সে-সকল সূর্যসন্তানের ওপর!

তবুও ঈমান নামক মহামূল্যবান রত্নকে ছেড়ে দেননি কেউ। তারা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। তবুও শয়তানের সামনে মাথা নত করেননি। আলাহ তায়ালা তাদের জন্য সাহায্য পাঠিয়েছেন। এই আধুনিক যুগে এসেও কোনো মুসলিম ভূখণ্ড যখন শয়তানি শক্তি দ্বারা আগ্রাসনের শিকার হয়েছে, তখনো একদল মানুষ বুক পেতে দিয়েছেন। তবুও নতি স্বীকার করেননি। ফলে আল্লাহ তাদের জন্য রহমত নাজিল করেছেন। কেউ যখন ঈমান নিয়ে বাঁচতে চায়, আল্লাহ তার জন্য তা সহজ করে দেন।

আবু মুসলিম খাওলানি (রহ.) মুসলিম জাতির সামনে এমনই এক দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছেন, যাকে মানুষের মন থেকে কিছুতেই মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

(মাওলানা মুহাম্মাদ ইসমাইল রাইহান; মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বিশ্বকোষ, মাকতাবাতুল আযহার, খ--২, পৃষ্ঠা: ১৮৮-১৮৯; আল্লামা ইবনে কাসির রহ.; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া; ইসলামিক ফাউন্ডেশন, খ--৬,

পৃষ্ঠা: ৩৯৪-৩৯৬)

নয়া শতাব্দী/এসএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x