ঢাকা | সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮
মক্কার খুতবা

দুনিয়া ও আখিরাতে তাসবিহ পাঠের উপকারিতা

শায়খ ড. মাহের বিন হামাদ মুআইকিলি

প্রকাশনার সময়

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৫০

আপডেট

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৫৩

আল্লাহর চেয়ে মহান কেউ নেই। তাঁর স্মরণ ও জিকিরের চেয়ে মহৎ কিছু হয় না। সবকিছু থেকে বড় আল্লাহর জিকির। যে তার প্রতিপালকের জিকির করে, আর যে জিকির করে না, তাদের উপমা হলো জীবিত ও মৃত ব্যক্তি। জিকিরকারীদের অবস্থা এতই উন্নত যে তাদের রব ফেরেশতাদের সামনে তাদের নিয়ে গর্ব করেন। আল্লাহর জিকির মুমিনের জীবনের ছায়াসঙ্গী। সকালে-বিকেলে, নিদ্রায়-জাগরণে, আবাসে-প্রবাসে ও পানে-আহারে- সর্বাবস্থায় সে জিকির করে। প্রকৃত জাকের তো সেই যে তার রবের আনুগত্যমাফিক কাজ করে। ফলে সে প্রতিক্ষণে ও প্রতিটি অনুষঙ্গে আল্লাহর জিকির করে। সাঈদ বিন জুবাইর (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ আনুগত্যে কর্মসম্পাদনকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই আল্লাহর জিকিরকারী।’ আল্লাহ সত্যই বলেছেন- ‘ যারা আল্লাহকে দন্ডায়মান, উপবিষ্ট এবং শায়িত অবস্থায় স্মরণ করে থাকে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তা করে (ও বলে) : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব অনর্থক সৃষ্টি করনি, তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, সুতরাং আমাদেরকে অগ্নির শাস্তি হতে রক্ষা কর।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৯১)।

তাসবিহ সবচেয়ে বড় জিকির। কুরআনে কারিমে আশির চেয়ে বেশিবার উল্লেখ হয়েছে। আল্লাহ তাঁর কিতাবের সাতটি সুরা শুরু করেছেন তাসবিহ দিয়ে। তিনি নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন সুন্দরতম নামসমূহ ও উচ্চতম গুণাবলি আর সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন তাঁর তাসবিহ। ইরশাদ হয়েছে- ‘তিনিই আল্লাহ যিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, তিনিই বাদশাহ, অতি পবিত্র, পূর্ণ শান্তিময়, নিরাপত্তা দানকারী, প্রতাপশালী, পর্যবেক্ষক, মহাপরাক্রমশালী, অপ্রতিরোধ্য, প্রকৃত গর্বের অধিকারী। তারা যাকে (তাঁর) শরীক করে তাত্থেকে তিনি পবিত্র, মহান।’ (সুরা হাশর : ২৩)।

তাসবিহ বলতে বোঝায় মহান রবের মহত্ব ও বড়ত্বের সঙ্গে সমীচীন নয় এমন সব ত্রুটি থেকে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করা। কেন নয়, মহান আল্লাহ নিজ সত্তায়, নামে ও গুণাবলিতে পূর্ণতায় বিশেষিত। তিনি যাবতীয় ত্রুটি ও খুঁত থেকে মুক্ত। তিনি অতি নিরঞ্জন, অসীম পবিত্র এবং ফেরেশতামন্ডলী ও জিবরীলের প্রভু। তিনি চান বান্দারা তাঁর তাসবিহ জপুক। সেহেতু ফেরেশতারা তাদের দায়িত্বভুক্ত মহৎ ও বৃহৎ সব কাজের পাশাপাশি : ‘দিন-রাত তাঁর তাসবিহ পাঠ করে, তারা শিথিলতা দেখায় না।’ (সুরা আম্বিয়া : ২০)। আর ফেরেশতারা তাঁর তাসবিহ জপে সম্মানিত ও গর্ববোধ করেন। ‘আর আমরা তো সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান। আর আমরা অবশ্যই তাসবিহ পাঠকারী।’ (সুরা সফফাত : ১৬৫-১৬৬)।

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ যখন কিছু ফায়সালা করেন, তখন আরশবাহী ফেরেশতাগণ তাসবিহ পড়েন। অতঃপর তার পরবর্তী নিম্নের আসমানবাসী তাসবিহ পড়েন। পরিশেষে এই দুনিয়ার আসমানে তাসবিহ এসে পৌঁছে।’ ফেরেশতারা এমনটি করেন আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা, তাঁর আদেশের মহিমা তুলে ধরা এবং তাঁর আদেশের প্রতি আনুগত্য, আগ্রহ ও বিনয় প্রকাশার্থে।

আল্লাহর নবী-রাসূলদের কথা বলাইবাহুল্য। তাঁদের জিকিরই ছিল তাসবিহ। বিপদাপদে তাসবিহই ছিল অবলম্বন। যেমন দেখুন- মুসা (আ.) নিজ প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেন যেন তাঁর ভাই হারুনকে তাঁর সহযোগী বানিয়ে দেওয়া হয়। যাতে করে তিনি তাঁকে অধিকতর তাসবিহ পাঠে সহযোগিতা করতে পারেন। ইরশাদ হয়েছে : ‘আর আমার পরিবার থেকে আমার জন্য একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন- আমার ভাই হারূনকে। তার দ্বারা আমার শক্তি সুদৃঢ় করুন। এবং তাকে আমার কাজে শরিক করুন। যাতে আমরা বেশি করে আপনার তাসবিহ পাঠ করতে পারি এবং অধিক পরিমাণে আপনার জিকির করতে পারি।’ (সুরা ত্ব-হা : ২৯-৩৪)।

তেমনি আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এর পুরো জীবন ছিল তাসবিহময়। যখন তিনি কুরআন তেলাওয়াত করতেন আর দয়াময় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা প্রসঙ্গে কোনো আয়াত সামনে আসত, তিনি সুবহানাল্লাহ পড়তেন। রাতের তাহাজ্জুদে রুকু ও সেজদায় দীর্ঘক্ষণ তাসবিহ পড়তেন। বাহনে চড়তে গেলে বলতেন : ‘সুবাহানাল্লাযি সাখখারা লানা হাযা’ (পবিত্র ও মহিমাময় সেই সত্তা যিনি এই বাহনকে আমাদের অনুগত বানিয়ে দিয়েছেন)। কোনো উপত্যকায় অবতরণ করতে গেলেও বলতেন ‘সুবহানাল্লাহ’। কোনো আশ্চর্যজনক বিষয় দেখলেও বলতেন ‘সুবহানাল্লাহ’। রাতে বিছানায় যাবার পর তেত্রিশবার পড়তেন ‘সুবহানাল্লাহ’।

মক্কায় যখন তাঁর ওপর মুশরিকদের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গেল, তাঁকে ঘিরে ধরল দুশ্চিন্তা আর অন্তর হয়ে উঠল সংকুচিত, আল্লাহ তাঁকে বেশি বেশি তাসবিহ পাঠের আদেশ দিলেন। যাতে বুক হালকা হয় এবং দুশ্চিন্তা উবে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আমি জানি, তারা যেসব কথাবার্তা বলে তাতে তোমার মন সংকুচিত হয়। সুতরাং তুমি তোমার রবের প্রশংসায় তাসবিহ পাঠ কর এবং সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।’ (সুরা হিজর : ৯৭-৯৮)

কারণ হে নবী, তাসবিহ পাঠের মাধ্যমে আপনার হৃদয় প্রশান্ত হবে। চক্ষু শীতল হবে। মন প্রফুল্ল হবে। আপনার রব আপনাকে দেবেন সাময়িক ও চিরস্থায়ী পুণ্য, যাতে আপনাকে সন্তুষ্ট হবেন। ‘সুতরাং এরা যা বলে তার ওপর ধৈর্য ধারণ কর এবং তাসবিহ পাঠ কর তোমার রবের প্রশংসা বর্ণনার মাধ্যমে, সূর্যোদয়ের পূর্বে, সূর্যাস্তের পূর্বে এবং তাসবিহ পাঠ কর রাতের কিছু অংশে ও দিনের প্রান্তসমূহে, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হতে পার।’ (সুরা ত্ব-হা : ১৩০)

তাসবিহের প্রভূত মর্যাদার জন্যই নবী (সা.) যখন তাঁর নবুওতি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অভিযান পূর্ণ করেন, আল্লাহ প্রদত্ত রেসালতের আমানত পৌঁছে দেন, যার ফলে লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে শুরু করে- আল্লাহ তখন তাঁকে মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসার সংবাদ জানিয়ে তাসহিবের মাধ্যমে জীবনের সমাপ্তি টানার আদেশ দেন। ইরশাদ করেন- ‘যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও (ইসলামের চূড়ান্ত) বিজয়, আর তুমি লোকদেরকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে দাখিল হতে দেখবে, তখন তুমি তোমার রবের সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ কর এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও নিশ্চয় তিনি তাওবা কবূলকারী।’ (সুরা নাসর : ১-৩)

সিদ্দিক (রা.) এর কন্যা আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন- “‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর আগে বেশি বেশি বলেছেন : ‘সুবহানাকা ওয়া বিহামদিকা, আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক।’” (মুসলিম)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা যাবতীয় সৃষ্টিকে নিয়োজিত করেছেন তাঁর তাসহিব পাঠে। যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর পূর্ণতা ও মহত্তের স্বীকৃতি দেয়, তাঁর রাজত্বের আনুগত্য এবং তাঁর তাওহিদ বা এককত্ব ও মহানত্বের সামনে বশ্যতা স্বীকার করে। ইরশাদ হয়েছে- ‘ তুমি কি দেখ না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা এবং উড্ডীয়মান বিহংগকূল আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে? তারা প্রত্যেকেই জানে তাঁর যোগ্য প্রার্থনা এবং পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পদ্ধতি।’ (সুরা নুর : ৪১)

তাই সপ্ত আকাশ এবং এতে বিদ্যমান সবকিছু- চাঁদ-সূর্য ও গ্রহ-তারা আর ভূমণ্ডল ও এর পাহাড়-সাগর, মরুভূমি-বনবনানী এবং প্রতিটি আর্দ্র-শুকনো ও জীবিত-মৃত এককথায় সমগ্র সৃষ্টিজগত মুখ ও অবস্থার ভাষায় মহান ও সমুচ্চ আল্লাহর তাসবিহ জপছে। ইরশাদ হচ্ছে- ‘সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছু তাঁর তাসবিহ পাঠ করে এবং এমন কিছু নেই যা তাঁর প্রসংশায় তাসবিহ পাঠ করে না; কিন্তু তাদের তাসবিহ তোমরা বুঝ না। নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।’ (সুরা বনি ইসরাঈল : ৪৪)

এমনকি আল্লাহ তাআলা নবীজি (সা.) এর কিছু সাহাবিকে জড়বস্তুর তাসবিহ শুনিয়েছিলেন। যেমন- নবীজির মিম্বরের খেজুর-ডালের কান্না এবং তাঁর হাতে পাথরকণার তাসবিহ পাঠের ঘটনায় দেখা যায়। সুনানে তিরমিজিতে রয়েছে, ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন- ‘আমরা নবী (সা.)-এর সঙ্গে খাবার খেতাম এবং খাদ্যের তাসবিহ পাঠ শুনতে পেতাম।’ অতএব আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করি; তাঁর সৃষ্টির সমান সংখ্যক, তাঁর নিজ মর্জি অনুযায়ী, তাঁর আরশের ওজন বরাবর ও তাঁর বাণীসমূহের সমান সংখ্যক প্রশংসা। যার ভেতর প্রাণ নেই, তা যখন নিজের স্রষ্টার তাসবিহ পাঠ করে তাহলে আল্লাহর প্রাপ্য এই তাসবিহের ব্যাপারে আমাদের কী অবস্থা? ‘ হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবিহ (তথা পবিত্রতা ও মহিমা) ঘোষণা কর।’ (সুরা আহযাব : ৪১-৪২)

সুতরাং তাসবিহ হলো এক মহান ইবাদত। বিরাট পুণ্যময় কাজ। এর মাধ্যমে আল্লাহ কলবকে জীবিত করেন। প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করেন। ভুলগুলো মুছে দেন। গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। এটি আখেরাতের সম্বল। জান্নাতের বৃক্ষ। শ্রেষ্ঠ বাক্য। আল্লাহর প্রিয়তম এবং আমলের পাল্লায় সবচেয়ে ভারি শব্দ। তাসবিহ বান্দার জন্য তার রবের কাছে সুপারিশ করবে। বিপদের সময় বান্দার পাশে দাঁড়াবে। যেমন মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- ‘তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ), তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাহমিদের (আলহামদু লিল্লাহ)-এর মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর যে মহিমা বর্ণনা করো তা মৌমাছির গুঞ্জনের ন্যায় শব্দ করে আরশের চারপাশে ঘুরতে থাকে। সেগুলো নিজ নিজ প্রেরকের কথা উল্লেখ করতে থাকে। তোমাদের কেউ কি এটা পছন্দ করে না যে, আল্লাহর নিকট অনবরত তার উল্লেখকারী কেউ থাকুক?’

আল্লাহর নবী ইউনুস (আ.) তিনটি অন্ধকারের মধ্য থেকে তাসবিহসহ দোয়া করেন, রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার ও মাছের পেটের অন্ধকারে বসে কাতরভাবে বলেন- ‘ আপনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিম।’ (সুরা আম্বিয়া : ৮৭) তখন আল্লাহ তাঁকে উদ্ধার করেন। ইরশাদ হয়েছেÑ ‘আর সে যদি তাসবিহ পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হত তাহলে সে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত তার পেটেই থেকে যেত।’ (সুরা সাফফাত : ১৪৩-১৪৪)

তাসহিবের মধ্যে মনের শান্তি-প্রশান্তি ও তৃপ্তি-আনন্দ আছে বলেই দুনিয়ার জীবন শেষ হলেও তা বন্ধ হবে না। বরং জান্নাতের অধিবাসীর অন্তরে তাসবিহ উদয় হবে। তারা সেখানে কোনো ক্লান্তি ও বিরতি ছাড়া তাসবিহ পড়তে থাকবে। আল্লাহ বলেন- ‘সেখানে তাদের কথা হবে, ‘হে আল্লাহ, তুমি পবিত্র মহান’ এবং তাদের অভিবাদন হবে, ‘সালাম’।’ (সুরা ইউনুস : ১০) সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন- ‘জান্নাতিদের অন্তকরণে তাসবীহ-তাহলীল ইলহাম করা হবে যেমন ইলহাম করা হবে তাদের শ্বাস প্রশ্বাসের বিষয়টি।’

১৯ মুহাররম ১৪৪৩ হিজরি মক্কার মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর- আলী হাসান তৈয়ব

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x