ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

মসজিদে নারীদের নামাজের স্থান রাখা উচিত

প্রকাশনার সময়: ২৩ মে ২০২২, ০৭:৪৬ | আপডেট: ২৩ মে ২০২২, ০৭:৪৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিএসসি’ বেশ পরিচিত জায়গা। কয়েক দিন আগে পত্রিকা মারফত জানা গেছে, একদল ছাত্রী টিএসসিতে নামাজের জায়গা চান। এই দাবি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন তারা। টিএসসিকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন ছাত্র কল্যাণ সমিতির ইফতার মাহফিল, সিরাত অনুষ্ঠান, সংবর্ধনাসহ নানা প্রোগ্রাম বছরব্যাপী হয়ে থাকে। সালাতের সময় হলে ছাত্ররা মাঠে নামাজ আদায় করতে পারলেও নারীদের জন্য নামাজের ব্যবস্থা নেই। এই সমস্যাটি কেবল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের একই অবস্থা। তারাও নামাজের জন্য জায়গা চান। সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর কলাম থেকে জানা যায়, ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে মহিলাদের জন্য আলাদা মানসম্মত অজু করার ব্যবস্থা ও নামাজের জায়গা নেই।’

এর আগে ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নারীদের নামাজের স্থান প্রতিষ্ঠার জন্য জনস্বার্থে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী রিট আবেদন করেন। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪১ ধারা অনুযায়ী নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারের (ক)-এ বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায় ও উপ-সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের স্থাপন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রহিয়াছে। নারী-পুরুষ সকলের সকল ধর্ম অবলম্বন, পালন ও প্রচারের অধিকার রয়েছে। এক্ষেত্রে মুসলিম নারীরা ধর্ম পালনে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও মসজিদে সালাত আদায়ের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে দূর-দূরান্তের মসজিদগুলোতে নারী পথযাত্রীদের নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা থাকে না। সেজন্য বাংলাদেশের সকল মসজিদে নারীদের জন্য আলাদা নামাজের জায়গা, আলাদা অজু করার জায়গা ও টয়লেটের ব্যবস্থা করতে হবে মর্মে রিটে উল্লেখ করা হয়। সেই আবেদনে আরো বলা হয় ‘বাংলাদেশের অনেক স্থানের পাবলিক প্লেসে নামাজের স্থান সংরক্ষিত নয়, এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।’

সড়ক পথে নারীদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বা কোথাও যাওয়ার সময় সফরে খুব কষ্ট করতে হয়। দীর্ঘ সফরে নারীদের নামাজ আদায়ের জন্য কোনো মসজিদ পাওয়া যায় না। নারীরা যাতে যথাযথভাবে নামাজ আদায় করতে পারেন, সে ব্যবস্থা রাখা জরুরি হয়ে পড়ছে। গত রমজানের ঈদের আগে গণমাধ্যমে দুটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। যার একটিতে দেখা গেছে মসজিদের মূল গেট বন্ধ থাকায় একজন মুসল্লি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে মসজিদে প্রবেশের সিঁড়ির মধ্যে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করেছিল। আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে, কমলাপুর রেলস্টেশনে নারীদের নামাজের জায়গা না থাকায় কাপড় দিয়ে একটি অস্থায়ী নামাজের স্থান বানানো হয়েছিল।

কমলাপুরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে নামাজের জায়গা না থাকায় অসংখ্য নারী-পুরুষ সঠিক সময়ে সালাত আদায় করতে পারেন না। কর্তৃপক্ষের এই অবহেলা মূলত ইসলাম না বোঝা বা না মানার কারণে হয়ে থাকতে পারে।

আমাদের দেশের নারীরা প্রয়োজনের তাগিদে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, শপিংমল, বাজার, রাস্তা-ঘাট, অফিস-আদালত ও কলকারখানা ইত্যাদি স্থানে যান। এমতাবস্থায় সালাতের সময় হলে তারা সালাত আদায় করতে পারেন না। ৯০ ভাগ মুসলিমদের দেশে নারীদের কথা চিন্তা করে পুরুষদের মসজিদের পাশে বা পৃথক নামাজের ব্যবস্থা করা খুবই দরকার। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, কিছু দিন আগে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনায় উদ্বোধন হয়েছে প্রথমবারের মতো নারীদের জন্য নির্মিত ‘ইয়াসমিন কবির মহিলা মসজিদ’। এভাবে প্রতিটি জনবহুল স্থানগুলোতে নারীদের জন্য নামাজের ব্যবস্থা রাখা হলে কতইনা ভালো হতো!

মহানবী (সা.)-এর ইমামতিতে মসজিদে নববীতে একই কক্ষে নারী পুরুষেরা নামাজ আদায় করতেন। পুরুষেরা সামনের কাতারে ও নারীরা পেছনের কাতারে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতেন। এ কথার মানে এই নয় যে বর্তমানেও নারী-পুরুষ একইকক্ষে সালাত আদায় করবে। রাসুল (সা.)-এর যুগে মসজিদের ব্যবস্থাপনা আমাদের মতো এত উন্নত ছিল না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে মসজিদের অবকাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে মসজিদে নববীর মতো আমাদের দেশে গুটি কয়েক মসজিদে নারীদের জন্য পুরুষদের মসজিদের পাশাপাশি পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। নারীরা মসজিদে যেতে পারবেন না, সাধারণভাবে এমনটি কোথাও বলা হয়নি।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামাজ আদায় তাদের জন্য উত্তম। কেননা হাদিসে আসছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মহিলাদের ঘরের অভ্যন্তরে আদায়কৃত নামাজ ঘরের আঙিনায় আদায়কৃত নামাজের তুলনায় উত্তম। ঘরের ভেতরের ছোট কামরায় আদায়কৃত নামাজ ঘরের অভ্যন্তরে আদায়কৃত নামাজ তুলনায় উত্তম।’ (আবু দাউদ: ৫৭০)

পক্ষান্তরে রাসুল (সা.)-এর সময় রাতের আঁধারে মেয়েদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি ছিল। কোনো নারী মসজিদে যেতে চাইলে তাকে বাধা না দিতে স্বামীকে নিষেধ করা হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারো স্ত্রী যদি (জামাতে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে আসতে) অনুমতি চায়, তবে সে যেন তাকে বাঁধা না দেয়।’ (বুখারি: ৮৩১)

জুমার সালাত বা ঈদের সালাতে যাওয়ার জন্য নারীদের উৎসাহিত করা হয়েছে। এমনকি ঈদের সালাতে ঋতুবর্তী নারীদের মসজিদে যেতে বলা হয়েছে। মসজিদে কিংবা ঈদগাহে যাওয়ার তাগিদ না থাকলেও অনুমতি ছিল। নারীরা পুরুষদের মতো বিভিন্ন স্থানে যেতে পারলেও মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক না হয়ে শুধুই নিষেধাজ্ঞা দেয়া বা নিরুৎসাহিতই করা হয়— এটি অনুচিত।

শায়খ বকর আবু জাইদ তার হিরাসাতুল ফাদিলাহ (পৃ-৮৬) গ্রন্থে নারীদের মসজিদে যাওয়ার সকল শর্ত একত্রিত করেছেন। যথা: ১. পরিপূর্ণ পর্দাসহ গোটা শরীর আবৃত অবস্থায় বের হবে। যাতে কোনো প্রকার সৌন্দর্য প্রকাশ না হয়। ২. সেখানে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে শরিয়তকর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো বিষয় সংঘটিত না হওয়া। ৩. হাঁটার সময় শব্দ হয়, এমন অলঙ্কার পরে বের হতে পারবে না। ৪. সাজগোজ ও সুগন্ধিসহ বের হতে পারবে না। ৫. অঙ্গভঙ্গি করে চলতে পারবে না। ৬. মহিলাদের জন্য পৃথক দরজার ব্যবস্থা করা পুরুষদের ভিড় এড়িয়ে রাস্তার একপাশ হয়ে চলবে। ৭. অপ্রয়োজনে পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। ৮. নারীদের কাতার পুরুষদের কাতারের পেছনে হওয়া। ৯. নারীরা পুরুষদের আগে মসজিদ থেকে বের হয়ে বাসায় যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা। (বুখারি: ৮৬৬) ১০. সবচে বড় বিষয় হলো, তাদের এ বের হওয়াটা ফেতনার কারণ হতে পারবে না। (আবু দাউদ: ৫৬৫)

মোটকথা, মসজিদ ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা খুবই জরুরি। তুরস্কে মসজিদের পাশেই খেলার মাঠ, বাজার, পার্ক ইত্যাদি আছে। এটা করা হয়েছে যাতে মানুষ মসজিদমুখী হয়। প্রাথমিকভাবে দেশের সকল মসজিদে নারীদের নামাজের জায়গা না করতে পারলেও অন্ততপক্ষে ব্যস্ততম স্থান, বাজার, পাবলিক স্টেশনের আশেপাশে যে সকল মসজিদগুলোতে

মহিলাদের জন্য ব্যবস্থা রাখা উচিত, যাতে করে গাড়ি বা ট্রেনের জন্য অপেক্ষারতদের নামাজ কাজা না হয়। একইসঙ্গে আমরা এটাও বলব, মসজিদ গমনের ক্ষেত্রে নারীদের তরফ থেকেও পূর্ণ দায়িত্ববোধের প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রতি সৌদি সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার যেসব মডেল মসজিদ নির্মাণ করছেন, সেসব মসজিদে নারীদের জন্য পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক।

কোনোভাবেই যেন পর্দা ও নিরাপত্তা লঙ্ঘিত না হয় সে বিষয়ে যত্নবান হতে হবে। দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা না হলে, বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। যারা নারীদের মসজিদে কিংবা নারীদের জন্য পৃথক নামাজের জায়গাতে যথেষ্ট আপত্তি তোলেন, তারা দলিল হিসেবে ওইসব ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে সামনে পেশ করবেন, যা মোটেই কাম্য নয়। সুতরাং বিষয়টি মাথায় রেখে নারীদের জন্য পৃথক মসজিদ বাংলাদেশের পেক্ষাপটে খুবই জরুরি। ইসলাম ও মুসলিমদের এগিয়ে নেয়ার জন্য উদ্যোগী মানুষের শূন্যতা বেড়েই চলছে। তাই নিজেদেরকে এগিয়ে নেয়ার এখনই সময়। বর্তমান সময়ে প্রতিটি মহল্লার মসজিদ নির্মাণের সময় নারীদের নামাজ আদায়ের কথা মাথায় রেখে সেভাবেই মসজিদ নির্মাণ করা মুসলিম উম্মার একান্ত কর্তব্য।

লেখক: খতিব, অরচিন কেয়ার জামে মসজিদ

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ