ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

সরকারি প্রকল্প : নীতিমালা ও বাস্তবায়নে ফারাক

এ কে এম মাহমুদুল হক
প্রকাশনার সময়: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৪৫

টেকসই উন্নয়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন পূরণের সামর্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেই বর্তমানের চাহিদা পূরণ করে। এতে যেমন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ রক্ষা পায়, তেমনি প্রাকৃতিক ও আর্থসামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকে। টেকসই উন্নয়ন পরিবেশের ওপর বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। টেকসই উন্নয়নের

তিনটি মাত্রা রয়েছে : পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক। পরিবেশগত দিক থেকে প্রাকৃতিক সম্পদকে অফুরন্ত উৎস হিসেবে ব্যবহার থেকে রক্ষা এবং এর সুরক্ষা ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করে। সামাজিক দিক থেকে তা মানুষ, সম্প্রদায় এবং সংস্কৃতির উন্নতি সাধন করে, যাতে বিশ্বব্যাপী শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনমানের উন্নতি ঘটে এবং লিঙ্গ সমতার জন্য লড়াই করা যায়। অর্থনৈতিক দিক থেকে তা সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে এবং অর্থনীতি যাতে পরিবেশের ক্ষতি না করে সবার জীবনে প্রাচুর্য নিয়ে আসে তা নিশ্চিত করে। সমন্বিত উন্নয়নের নিমিত্তে যে কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে উপরোক্ত তিনটি মাত্রায় সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হয়।

স্থানীয় সরকার স্তরকে সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বলা হয়। বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান স্থানীয় জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসব উন্নয়নে পরিবেশগত বিষয় বিবেচনা ও একীভূতকরণ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে তা করতে সক্ষম হয় না। ফলে পরিবেশ অবক্ষয়ের পরিসর ও গতি ত্বরান্বিত হচ্ছে। বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই উন্নয়নে পরিবেশগত বিষয়াবলি বিবেচনার জন্য পর্যাপ্ত আইন ও নীতিমালা রয়েছে। তা ছাড়া এসডিজি গাইডলাইনে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে পরিবেশ সংরক্ষণের মানদ- প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উন্নয়ন কার্যাবলির ফলে পরিবেশের ওপর সৃষ্ট বিরূপ প্রভাব নিয়মিত বিশ্লেষণ করতে এবং এরূপ ক্ষতিকর প্রভাব গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে কমিয়ে আনতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

টেকসই উন্নয়নে প্রচলিত নীতিমালা পর্যাপ্ত হলেও বাস্তবে সেগুলো যথাযথভাবে কাজ করে না। নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। এতে উন্নয়ন আমাদের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে টেকসই উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের সময় সরকারের পরিকল্পনা কমিশন প্রণীত উন্নয়ন প্রকল্প প্রোফর্মা (ডিপিপি) বা প্রজেক্ট কনসেপ্ট পেপার (পিসিপি) পূরণ করতে হয়। তাতে প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন-সংক্রান্ত নির্দেশনা রয়েছে। তা ছাড়া ডিপিপি বা পিসিপিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অন্যান্য প্রকল্প বা বিদ্যমান স্থাপনায় অথবা ভূমি, পানি, বায়ু, জীববৈচিত্র্য ইত্যাদির মতো পরিবেশ, নারী-শিশু, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি এবং প্রাতিষ্ঠানিক, উৎপাদনশীলতা ও আঞ্চলিক বৈষম্যের ওপর কতটুকু নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা চিহ্নিতকরণ এবং এর সুনির্দিষ্ট প্রশমন ব্যবস্থা-সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করতে হয়। প্রতিউত্তরে প্রকল্প প্রণেতাদের আত্মপক্ষ সমর্থন বা আত্মবাদী যুক্তি উপস্থাপন করা একটি অতি সাধারণ রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হয়, পরিবেশের ওপর প্রস্তাবিত প্রকল্পের কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না বরং এটি পরিবেশের উন্নতি সাধন করবে। এসব ডিপিপি বা পিসিপির বিবৃতির সঙ্গে পরিবেশগত উন্নয়ন বা টেকসই উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক থাকে না। ডিপিপি বা পিসিপিতে পরিবেশগত মূল্য বা সুবিধা-অসুবিধা চিহ্নিতকরণ অথবা এর পরিমাণ নির্ধারণের কোনো বিধান থাকে না। সাধারণত প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে বেশ গুরুতর এবং সহজেই অনুমানযোগ্য কিছু বিরূপ প্রভাব থাকে, যা পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তবুও প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই প্রশমিতকরণ পরিকল্পনা তো দূরে থাক, বিরূপ প্রভাবগুলো একেবারেই উত্থাপন বা বিবেচনা করা হয় না।

স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব নিরীক্ষণ করার জন্য স্থায়ী কমিটি থাকে। বাস্তবে প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে এসব কমিটির কোনো যোগাযোগ থাকে না। ফলে সাধারণ জনগণেরও প্রকল্পে বিশেষ আগ্রহ থাকে না। সাধারণত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা কমিটির সদস্যদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। বিষয়গত যোগ্যতার চেয়ে স্বজনপ্রীতি বা দলীয় পরিচিতিই এ ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত মূল্যায়নে সাধারণ মানুষের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। প্রকল্প নির্বাচন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করার সময় পরিবেশগত উন্নয়নের পরিবর্তে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ এবং বাহ্যিক ও সামাজিক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে জনগণকে খুশি করার একটা প্রবণতা রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিদ্যমান। এ রীতি অবশ্যই পাল্টাতে হবে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সাধারণত সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকে। অনেক সময় অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করতে হয়। ফলে প্রকল্প প্রণয়নের সময় জনমতের সমন্বয় সাধন করা তাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বাজেট, জনবল এবং সময় বরাদ্দ রাখা উচিত। প্রত্যেকটি প্রকল্পেরই কার্যকর নজরদারি ও বাস্তবায়ন পরবর্তী প্রকল্পের বিরূপ প্রভাব প্রশমন পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনগণের পরামর্শ নেয়া আবশ্যিকভাবে পরিবেশগত ক্ষয়-ক্ষতি মূল্যায়নের একটি সুস্পষ্ট প্রক্রিয়ার অংশ বানানো উচিত। তা এই প্রক্রিয়াকে আরো কার্যকর এবং অর্থবহ করবে। সর্বোপরি, রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের টেকসই উন্নয়ন বিধিমালা প্রয়োগে এবং এ ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতি দূরীকরণে দৃঢ় অঙ্গীকার থাকা উচিত।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন