ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

ডিভোর্সি হলেই কি খারাপ?

ওয়াহিদুল হাদী
প্রকাশনার সময়: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:১১

‘তোমার ডিভোর্স হয়েছে? তাহলে তো তোমার মধ্যে কোনো ঘাপলা আছে।’

ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে ডিভোর্সকে ট্যাবু এবং নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। এর প্রভাব ছেলেদের থেকে বেশি পড়ে মেয়েদের উপরে। ডিভোর্স হয়েছে শুনেই অনেকে নাক-সিটকান। কেউ কেউ তো আগ বাড়িয়ে বলেই ফেলেন ‘চরিত্রে সমস্যা আছে তাই তো স্বামী ছেড়েছে।’ অন্যদিকে বেশিরভাগ সময় ছেলেরা আরাম আয়েশে চলা ফেরা করতে পারে, এতে কোনো বাধা বিপত্তি দেখা দেয় না।

রাসুল (সা.) এর যুগ ছিল শ্রেষ্ঠ যুগ। তার আশেপাশে যারা মুসলিম ছিলেন তারা নিঃসন্দেহে ছিলেন দুনিয়ার বুকে হাঁটা শ্রেষ্ঠ নর-নারী। সেই তাদেরই অনেকের সংসার ভেঙে গিয়েছে যেখানে বর্তমানের মানুষরা তো কিছুই না। আশারায়ে মুবাশশারার একজন সাহাবি নাম জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.)। বিয়ে করেছিলেন আমীরুল মূমিনিন আবু বকরের (রা.) মেয়ে মহীয়সী নারী আসমা বিনতে আবু বকরকে (রা.)। সেই তাদেরই সংসার শেষ দিকে এসে ভেঙে যায়। বর্তমানে কারো ডিভোর্স হলে আপনি দোষ খুঁজেন, হাসেন, ট্রল করেন, তাহলে তাদেরও হওয়ার জন্য করবেন কি? অবশ্যই না।

অন্যদিকে বহুবিবাহ নিয়ে উচ্ছ্বস দেখা দিলেও খুব কমকেই দেখলাম ডিভোর্সি মহিলাকে বিয়ের উৎসাহ দিতে। আমাদের সমাজে ডিভোর্সি মহিলারা যেন অপরাধী। সারাজীবন এই কলঙ্ক নিয়ে যেন তাদের জীবন কাটাতে হবে। রাসুলের (সা.) কিন্তু সেটা হয়নি। উল্টো সাহাবিরা কোনো ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করতে কোনো প্রকার ইতস্তত করতেন না। পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেম মুফতি তারিক মাসুদ আমার প্রিয় একজন বক্তা। তার বিয়ের ব্যাপারে মুখ খুলেছিলেন একবার। তিনি ৪টি বিয়ে করেন। প্রথম বিয়ের পরে তিনি এমন নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন যা বর্তমান সমাজে ৪ বিয়ের ফ্যান্টাসিতে ডুবে থাকা অনেকের মাথায় বাড়ি দেয়ার মতন। পুরুষ তো হবে সে-ই যে দায়িত্ব নিতে জানে।

যুদ্ধ থেকে মুসলিম বাহিনী ফিরে আসছিলেন। একজন সাহাবি একটি ধীরগতি সম্পন্ন উটের সাওয়ার ছিলেন, যার ফলে উটটা দলের পেছনে পড়ে গেল। এমনি অবস্থায় নবী (স.) তার কাছ দিয়ে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কে?’ তখন তিনি বলেন, ‘জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.)।’

তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তার কী হয়েছে, পেছনে কেন? তখন তিনি বলেন যে, ‘তার কাছে এই ধীরগতি সম্পন্ন উটে সাওয়ার হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কারণ তারা বাবা অনেক ঋণের বোঝা তার ওপর রেখে গিয়েছেন।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন তার উটকে বসিয়ে লাঠি দিয়ে প্রহার করলেন, উটটি উঠে দাঁড়িয়ে এত এনার্জেটিক হয়ে গেল যে, উটটি দলের অগ্রভাগে চলে গেল। তারপর সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করে তিনি রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে ফিরে আসেন।

রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে আসার পর তিনি জাবিরকে (রা.) বলেন, তোমার উট আমার কাছে বিক্রি করে দাও। জাবিরের (রা.) এই উট ছাড়া বাহনের আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না তারপরও তিনি বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি আপনাকে উপহার হিসেবে তা দিয়ে দিব। রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, ‘না বরং এটা আমার কাছে বিক্রি করো।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ২,৩,৪ দিরহাম করে তার দাম উকিয়্যাহ পর্যন্ত নিলেন। জাবির (রা.) তখন মদিনা অব্দি চড়ে যাওয়ার অনুমতি চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সেটার সুযোগ দেন। বহর যখন মদিনার নিকটবর্তী চলে আসলো তখন জাবির (রা.) তার বাড়ির দিকে রওয়ানা হওয়ার জন্য একটু ব্যস্ত হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে এত তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে জাবির (রা.) বলেন, ‘আমি নতুন বিয়ে করেছি।’

উত্তর শোনার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কুমারী নাকি বিধবা?’ জাবির (রা.) উত্তর দেন, ‘বিধবা।’

জাবিরের উত্তর শোনার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, ‘তুমি কুমারী মেয়ে বিয়ে করলে না কেন? যার সঙ্গে খেলা-কৌতুক করতে আর সেও তোমার সঙ্গে খেলা-কৌতুক করত?’

জাবির (রা.) বললেন, ‘আমার বাবা মারা গিয়েছেন এবং কয়েকজন কন্যা রেখে গেছেন। আমি চাইলাম এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করতে, যে হবে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, যে আমার বোনদের খেয়াল রাখতে পারবে এবং সেটা একজন বিধবাই হবেন।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, ‘তাহলে ঠিক আছে।’ এভাবেই ইসলামের সোনালি যুগের পুরুষরা দায়িত্ব নিয়েছেন। বিয়ের ক্ষেত্রে তারা শুধু তাকওয়াই দেখতেন। সুন্দর-অসুন্দর, কুমারী-বিধবা কিংবা ধনী-গরিব-এসব হিসেবেই আনতেন না।

নয়া শতাব্দী/এসএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন