ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

কাবিননামায় যা না লিখলে বর-কনে উভয়ের সমস্যা!

মুফতি মাহবুবুর রহমান
প্রকাশনার সময়: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৪৮

বিবাহের কাবিননামায় ১৮নং একটি কলাম রয়েছে। যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই কলামটি সম্পর্কে অনেকেই জানে না আবার অনেকে জেনেও তেমন গুরুত্ব দেয় না। অথচ কলামটি পূরণ না করলে বরপক্ষ ও কনেপক্ষ উভয়ই, বিশেষ করে বরপক্ষ খুব ঝামেলায় পড়েন।

কলামটি খালি রাখলে যে ঝামেলা হয়; অনেক নারীই যেহেতু কিছুটা রাগী-অভিমানী থাকে, অনেকেই ধৈর্য ও দূরদর্শিতায় কম থাকে, তাই কখনো যদি দু’জনের মাঝে কোনোভাবে হালকা মনোমালিন্য হয়, তখন কনে সোজা চলে যায় কাজী সাহেবের কাছে। বলে; আমার ঝামেলাটা মিটিয়ে দিন। কাজী সাহেব মোটা অংকের টাকা নেয়ার জন্য ১৮নং এই কলামটি সম্পর্কে আগে থেকে কাউকে অবহিত করে না। যখন কনে মোটা অঙ্কের টাকা দেয় তখন কাজী সাহেব লিখে দেয় ‘ফাতেমাকে তালাক দেয়ার অধিকার প্রদান করা হলো’।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল; যেহেতু বর এ কলামটি পূরণ করেনি, কাজী পূরণ করেছে। তাই কাজী সাহেবের পূরণ করার দ্বারা মহিলা তালাকের অধিকার পাবে না। এমতাবস্থায় সে নিজেকে তালাক দিলে ইসলামের দৃষ্টিতে তালাকও পতিত হবে না। ওদিকে সরকারিভাবে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে কারণ সরকার দেখবে না কলামটি কে পূরণ করেছে।

মহিলা এ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে সরকারিভাবে সে তার স্বামী থেকে মুক্ত হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে সে তার ওই স্বামীরই থেকে যাবে, কোথাও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে সেটা ইসলাম যেনা ব্যভিচার হিসেবেই গণ্য করবে। সন্তান হলে অবৈধ সন্তান হিসেবে লালিত-পালিত হবে।

আর যারা পূরণ করেন তারাও যথাযথ শব্দ ব্যবহার করতে না পারায় বিপদমুক্ত হতে পারেন না। আবার অনেকে লিখে দেয় ‘আমি ফাতেমাকে তালাকের অধিকার দিলাম না’। এটা নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে খুব ঝামেলার সৃষ্টি হয়। বর যখন স্বাক্ষর ছাড়া অন্য কিছু লিখে তখন সবাই বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখে। আর তখনই শুরু হয় বাকবিতন্ডা। তাই বিষয়টি সমাধানের জন্য আল-হিলাতুন্নাজেযাহ কিতাবের লেখক যথাযথ শব্দ প্রয়োগে এমনভাবে লিখতে বলেছেন যা উভয় পক্ষের জন্য উপকারী।

১৮ নং কলামে লেখা আছে; স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাকের অধিকার দিবে কিনা? এরপর কিছু জায়গা ফাঁকা রয়েছে। সেখানে কনের নাম উল্লেখ করে যা লিখতে হবে তা নিন্মরূপ : ‘বিবাহের পরে আমি যদি একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে যাই, অতিরিক্ত নির্যাতন করি, বা একেবারেই ভাত-কাপড় না দেই তখন মোসাম্মাৎ ফাতেমা প্রতি-ঘটনার তিন দিনের মধ্যে, তার নির্ভরযোগ্য দু’জন অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষে নিজের ওপর এক তালাকে বায়েন নিতে পারবে।’

যে শর্তগুলো এখানে দেয়া হয়েছে তার কোনো একটি ভঙ্গ হলে কনে নিজের ওপরে তালাক নিতে পারবে। আর অভিজ্ঞতায় দেখা যায় অধিকাংশ মহিলা সাধারণত যখন রাগ হয় তখন পরবর্তীতে কি হবে সেটা না ভেবেই একটা কিছু করে ফেলে। এজন্য শরীয়ত তাদেরকে তালাকের অধিকার দেয়নি। যেমন বাচ্চাদের হাতে কেউ কাচের পাত্র দেয় না। কারণ সে তার গুরুত্ব না বুঝে যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে ফেলতে পারে। তদ্রপ মহিলারাও যখন রাগ হবে তখন সে তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে দ্রুত তালাক দিয়ে দেবে।

সুতরাং অনেকগুলো বিষয় চিন্তা করে উপরোক্ত লেখাটি লেখা হয়েছে। যা গভীরভাবে লক্ষণীয়। লেখার মধ্যে কোনো রকম ব্যতিক্রম হলে ঝামেলা তৈরি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

উক্ত লেখার মধ্যে ‘আমি যদি একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে যাই’ বাক্যে ‘একেবারে’ শব্দটি না থাকলে স্বামী যদি স্ত্রীর অজান্তে একদিন বা দুদিন কোথাও থাকে। তাহলে স্বামী নিরুদ্দেশ হয়েছে অজুহাতে, নিজের ওপর তালাক নিয়ে নিতে পারবে। অথচ এটাকে নিরুদ্দেশ বলা চলে না।

‘যদি অতিরিক্ত নির্যাতন করি’ বাক্যে অতিরিক্ত শব্দটি প্রয়োগ না করা হয় তাহলে কোনোদিন কখনো একটি কটু কথা বা একটি চড়-থাপ্পড় এর ওপর ভিত্তি করে নিজের ওপর তালাক নিয়ে নিতে পারবে।

একেবারেই ভাত-কাপড় না দেই বাক্যে একেবারে শব্দটি ব্যবহার না করা হয় তাহলে কোনোদিন কখনো যদি পছন্দের তালিকায় একটি মাত্র কাপড় না দেয়া হয় বা কোনো কারণে কোনো এক ওয়াক্ত ভাত না খেয়ে থাকতে হয় তাহলে মহিলা নিজের ওপর তালাক নিয়ে নিতে পারবে।

‘প্রতি ঘটনার তিন দিনের মধ্যে কথাটা না লিখলে কোনো একদিনের কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেকোনো সময় তালাক নিয়ে নিতে পারবে। যেমন কেউ তার স্ত্রীকে একটি থাপ্পর দিলো কিন্তু স্ত্রী সেসময় কিছুই করলো না। দু-চার বছর পর যখন এ স্বামীর কাছে থাকতে মন চাচ্ছে না তখন সে ওই থাপ্পরের কথা স্মরণ করে তালাক নিতে পারবে। অথচ তিন দিনের কথা উল্লেখ থাকলে পারবে না।

দু’জন নির্ভরযোগ্য অভিভাবকের অনুমতিক্রমে কথাটি বলা হয়েছে তার কারণ; শুধু মেয়েকে অধিকার দিলে সে রাগের মাথায় কোনো চিন্তা না করে তালাক নিয়ে নিবে। অথচ তার অভিভাবক বিষয়টি ভালো-মন্দ চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিবে।

‘এক তালাক নিতে পারবে’ কথা বলার কারণ হলো; যদি এক না বলে শুধু ‘তালাক’ নিতে পারবে বলে। তাহলে মহিলা তিন তালাক নিতে পারবে। তাই সে তিন তালাক নিয়ে নিলে পরবর্তিতে আর ফিরিয়ে নেয়ার সুযোগ থাকবে না। এমনকি অন্য এক জায়গায় বিবাহ হওয়ার পর সে না ছাড়লে বিবাহ করারও সুযোগ থাকবে না। আর যদি এক তালাক লেখা থাকে, আর মহিলা এক তালাক নিয়ে নেয় তাহলে সে সুযোগ থাকবে।

সুতরাং আমাদের উচিত হবে বিবাহের আগেই বিষয় ভালো করে শিখে কাবিননামার ১৮নং কলাম যথাযথভাবে পূরণ করা। আল্লাহ আসান করেন।

লেখক : শিক্ষক, গওহরডাঙ্গা মাদরাসা, গোপালগঞ্জ

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন