ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

বিষণ্ণ ভাবনা

ফারহানা নীলা
প্রকাশনার সময়: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:০৫

গরমে দরদরিয়ে ঘামছে নিনিতা। পহেলা বৈশাখের দিনটা তবুও সারাদিন টইটই করে ঘুরে বেড়ায় বন্ধুদের সঙ্গে। সকালে রমনা, মঙ্গল শোভা যাত্রা তারপর মেলায়। সাদা শাড়ি লাল পাড়, কপালে বিশাল লাল টিপ, খোঁপায় বেলি ফুলের মালা নিজেকে নিজেরই অপ্সরীর মতো মনে হয়।

নিনিতা গড়পড়তা চেহারার একজন। একটু সাজেই তাকে ভীষণ সুন্দর দেখায়। কিছু কিছু চেহারা থাকে- ধবধবে ফর্সা নয়। কিন্তু কাটা কাটা সুন্দর। গায়ের রং শ্যামলা হলে চেহারার কাটা কাটা ভাবটা বেশি হয়। স্মিতা পাতিলের কথা মনে হলো নিনিতার। আহা কী সুন্দর! কত অল্প বয়সে চলে গেলেন তিনি।

আচ্ছা স্মিতা পাতিলের কথা মনে কেন পড়ল এই সময়ে? নিনিতা খোঁপা থেকে বেলি ফুলের মালা খুলে এবার হাতে জড়াতে জড়াতে মেলার মাঠের কোনায় চলে এসেছে।

নাগরদোলা ঘুরছে। সবার হাসির আওয়াজ শোনা যায়।

ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বিকেলে মেলায় যেত নিনিতা। হালখাতার মিষ্টি খেয়ে বাবার হাত ধরে নিনিতা হাঁটে।

তখন পহেলা বৈশাখে ঝড় হওয়া একটা অবধারিত ঘটনা ছিল।

আকাশ মুখ ভার করে থেকে কিছু সময় পরেই ঝরে পড়ত বৃষ্টিতে।

নাগরদোলা ঘুরছে। পাশে বাবা দাঁড়িয়ে আছে। নিনিতার মনে হতো এখনই বুঝি সে আকাশ ছুঁয়ে দেবে! মুখ ভার আকাশটা এখনই বোধ হয় হেসে উঠবে কলকলিয়ে। এত অল্প সময় ঘুরত নাগরদোলাটা তারপরই নেমে যাবার তাড়া। মন ভরত না নিনিতার।

কদমা, নকুলদানা আরো কত কী কিনে বাসায় ফিরত নিনিতা। একবার বাবা একটা মাটির ঘোড়া কিনে দিল। বাসায় আসতে না আসতেই হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেল ঘোড়াটা। নিনিতা খুব কেঁদেছিল।

কেউ একজন পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইছে। ভিক্ষা করা মানে নিজেকে অপারগ মেনে নেয়া। শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যারা ভিক্ষা করে তাদের ভিক্ষা দিতে ইচ্ছে করে না। ভিক্ষা করা তখন তাদের রোগে পরিণত হয়। কাজ করার কোনো আগ্রহ বা স্পৃহা থাকে না। চেয়ে চিন্তে দিন কাটানোতে লজ্জাও পায় না।

কিন্তু এই মানুষটার দিকে তাকিয়ে নিনিতার এসব কথা মনে পড়ে না। বৃদ্ধ মানুষ, হাতে লাঠি-লুঙ্গি, জামাটা ছেঁড়া। নিনিতা ব্যাগ থেকে টাকা বের করে।

‘আপনি লুঙ্গি আর জামা কিনবেন’

‘পেটে ক্ষুধা মা! কাপড়ে ক্ষুধা মানে না’

নিনিতা উল্টো দিকে হাঁটছে। বন্ধুরা কে কোথায় যে গেল?

লুঙ্গি পরা একমাত্র বাবাকেই মানাত। বাবা সবসময়ই চেক লুঙ্গি পরত। নিনিতার কাছে লুঙ্গি পোশাকটা একদম ভালো লাগে না। যদিও ষোলোআনা বাঙালিপনা এই পোশাকে। তবুও

কেমন জানি অশ্লীল আর অসভ্য একটা পোশাক মনে হয়।

নিনিতা জানে এই বিষয়ে কথা বললেই মতবিরোধ হবে সবার সঙ্গে।

একবার এক বন্ধুকে এটা নিয়ে কথা বলে বিপদে পড়েছিল নিনিতা।

‘কেন? লুঙ্গির ওপর তোমার এত রাগ কেন? কী সুন্দর, আরামদায়ক পোশাক! আলো বাতাস খেলে যায়’ বন্ধুর কথা শুনে নিনিতা সেদিন আর কোনো কথা না বলে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

নিনিতাদের বাসায় তখন আরজিনা নামে ছোট একটা মেয়ে থাকে। মায়ের সঙ্গে টুকটাক কাজ করে। মা তাকে নিয়ম করে লেখাপড়া শেখায়।

আরজিনা আর নিনিতা বিকেল হলেই হাঁড়ি-পাতিল খেলে, পুতুল খেলে।

নিনিতা স্কুলে যায়। আরজিনা বাসায় থাকে। মা কয়েকবার স্কুলে পাঠাতে চেয়েছে। কিন্তু আরজিনার বাবা-মা চায় না।

‘গরিবের মেয়ে স্কুলে পইড়ে বদের দুনা হবি না কি? তার থেন আরবি পড়লি কামে দিবিনি। বিয়ে দেওয়া লাগবি না! সুরা না শিখলি কোনে বিয়ে দেবোনে?’

মা বোঝাতে চায়। শিক্ষার বিষয় জরুরি। তারা বোঝে না। সেই সময়ে নিয়ম হলো স্কুলে একজন অশিক্ষিত কাউকে শিক্ষিত করতে হবে। এটাও স্কুলের একটা পাঠ।

নিনিতার মা আরজিনাকে শ্লেট-পেন্সিলে লেখা শেখায়। আরজিনা নিজের নাম লিখতে শেখে।

এসব জেনে ওর বাবা-মা চলে আসে। মেয়েকে নিয়ে যাবে।

বাবা আরজিনার দায়িত্ব নিয়ে ওদের বুঝিয়ে বলে।

সপ্তাহান্তে নিনিতারা সবাই দাদার বাড়ি যায়। শহর থেকে মাইল দেড়েক দূরেই দাদার বাড়ি। ওখানে গেলে নিনিতা আরজিনা প্রজাপতির মতো ওড়ে। একবার গাঙের কূলে, একবার ছাদে, একবার টমেটো ক্ষেতে- সারাক্ষণ অস্থির।

নিনিতার তো বাসায় আসতেই মন চায় না। দাদার বাড়ি মানেই আনন্দ। বাবা সবার সঙ্গে কথা বলে। এদিকে-ওদিকে যায়।

দাদি, চাচিদের সঙ্গে মা গল্প করে।

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামে। লেবু গাছের কাছে মুরগির খোপে ফিরে আসে মুরগিগুলো। কবুতরগুলো জাম্বুরা গাছের পাশে ঘরে ঢোকে। দিনটা তলিয়ে যায় আঁধারে।

ভাড়া করা রিকশাটা বাড়ির সামনে অপেক্ষায়।

নিনিতাদের বাসায় মাঝে মধ্যে বাবার অফিসের পিওন কাজে আসে। কাজ হলে চলে যায়।

সেবার কোরবানি ঈদ। মাংস নিয়ে ভীষণ ব্যস্ততা। বাবার পিওনটা কাজ করছে। ঈদে বাবার এত যে আগ্রহ! গরু কেনা থেকে শুরু করে মাংস বিলানো পর্যন্ত বাবার ঈদ।

তারপর বাবা অন্য কাজে ব্যস্ত। আর মায়ের কাজ শুরু হয় রান্নাঘরে।

আরজিনা সব পরিষ্কার করছে। বাবার পিওনটা মাংসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

‘কী রে আরজিনা! তুই তো দেহি ডাঙ্গর হয়ে গেলি।’ পিওনটা হাসে।

‘বড় তো হওয়াই লাগপি! ছোট থাকপ না কি?’ আরজিনার উত্তরে একটু এগিয়ে আসে লোকটা।

সারা শরীরে ভুস ভুস মাংসের গন্ধ।

‘দেহি তো ক্যম্বা বড় হলু? আয় মাইপে দেহি’

‘সইরে খাড়ান! ঝাড়–র বাড়ি লাগপিনি কোইল’

‘কোনে ঝাড়–? কয়খান শলা?’

লোকটা আরজিনাকে কোলে নিতে যায়। লুঙ্গির গিঁট শক্ত করে বাঁধে। হুট করে কারেন্ট চলে গেল। মফস্বল শহরে এই এক তামাশা। ঈদের দিনও শান্তি নাই।

‘ছাড়েন আমাক। হেরিকেন ধরাই’

আরজিনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরো গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায়। তার চারপাশে লুঙ্গির আড়াল। দুই পায়ের ফাঁকে আটকে আছে আরজিনা।

‘আরজিনা! আরজিনা! হারিকেনটা ধরা তো মা’ মায়ের গলার আওয়াজে লুঙ্গির ঘের থেকে ছাড়া পেয়ে নিনিতার কাছে দৌড়ে আসে আরজিনা। ভীষণ কাঁপছে আর কাঁদছে আরজিনা।

নিনিতা কিছু বুঝে পায় না।

পিওনটা মাংস না নিয়েই চলে গেছে শুনে বাবা ভীষণ অবাক।

‘মাংসটা আগে দাওনি কেন? গরিব মানুষ! কত আশা করে সারাদিন খাটাখাটুনি করল’

মায়ের একটা অদ্ভুত বিষয় নিনিতা খেয়াল করেছে। এসব সময় মা কোনো উত্তর করে না।

নিনিতা আরজিনাকে জড়িয়ে ধরে নানান প্রশ্ন করছে। আরজিনা কিছুই বলে না। একাধারে কেঁদেই চলে। কারেন্ট এলো।

আরজিনার শরীরে লুঙ্গির একটা ছেঁড়া অংশ দেখতে পায় নিনিতা। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টার সময় হয়তো ছিঁড়ে গেছে লুঙ্গিটা!

বড় হতে হতে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে নিনিতা। তখন ভেবেছিল অন্ধকারে ভয় পেয়েছে আরজিনা। এখন চিন্তা করলেই শিউরে ওঠে নিনিতা! অতটুকু মেয়ের কষ্ট নাড়া দেয় বারবার। আরজিনার বিয়ে হয়ে গেছে কত আগেই। চার বাচ্চার মা আরজিনা।

সেদিনের ঘটনাটা হয়তো ওর তেমন করে মনে নেই। কিন্তু নিনিতা? সব শোনার পর নিনিতা আজও লুঙ্গি পোশাকটাকে মানতে পারে না। মনে হয় লুঙ্গিতে অশ্লীলতা ঢুকে থাকে। আলো বাতাসের সঙ্গে অশ্লীলতাও আসে যায় লুঙ্গির আড়ালে।

নিনিতার পড়া শেষ হয়নি এখনো। হোস্টেলে থাকে। তুমুল আড্ডাবাজ মেয়ে নিনিতা। বন্ধু মানে বন্ধু ছেলে-মেয়ে বিভাজন করলে বন্ধুত্বের ভাটা পড়ে।

বন্ধু শব্দটা ব্যাপক কোনো গ-ির মধ্যে বেঁধে দিলে নষ্ট হয় এই সম্পর্ক।

বন্ধুকে বন্ধু রাখতেও জানতে হয়, শিখতে হয়। নিনিতার কাছে বন্ধু মানেই বিশ্বাস, আস্থা আর নির্ভরতা।

যারা বন্ধুতায় প্রেম টেনে আনে তারা না হয় বন্ধু, না হয় প্রেমিক!

নাহ্ আজ আরজিনা পেয়েছে নিনিতাকে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে কেমন আছে আরজিনা?

মানসিক ক্ষত আর ক্ষতি নিয়ে ওরা কী ভাবে? সংসার কি সেই সময় দেয় ওদের? আরজিনা তো গ্রামের আর সব মেয়েদের মতো নয়। আরজিনা পড়তে পারে, লিখতে পারে বোধের বুননে গাঁথতে পারে সময়।

নিনিতা ফিরতি পথে বাসের টিকিট কাটে। কাল বাড়ি যাবে। খুব মন টানছে। বাবা-মা তো টানছেই, আরো টানছে আরজিনা। আরজিনার শ্বশুরবাড়ি গ্রামে। কখনো যাওয়া হয়নি। নিনিতা আরজিনার সংসার দেখতে যাবে।

এটাও সত্য ওখানে সবাই লুঙ্গি পরা মানুষ। গ্রামের মানুষ তো মালকোঁচা মেরে কাজ করে।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন