ঢাকা | শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

অন্দর সজ্জায় বাহারি আয়না

তনিমা রহমান
প্রকাশনার সময়: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:১৫

নিজের অবয়ব দেখতে আয়নার গুরুত্ব অপরিসীম। আয়না বা আরশি যাই বলুন না কেন, এটা ছাড়া নারী-পুরুষ সবারই সাজ থাকে অপরিপূর্ণ। যারা একটু বেশি সৌন্দর্যসচেতন, তাদের থাকে আয়না বিলাসিতা। পরিপাটি সাজ, কপালে টিপ দেয়া, চোখ-ভ্রু সাজানো, মেকআপ এমন কি পোশাকটি ঠিকঠাক মতো পরতেও প্রয়োজন হয় আয়নার।

নিজের চেহারার গড়ন সম্পর্কে প্রত্যেকেই অবগত হলেও আয়নায় নিজেকে দু’-তিনবার দেখা যেন প্রতিদিনের কাজ। তবে অন্যকে সাজাতে ব্যবহৃত এ আয়নাটি কখনো নিজেই সেজে ওঠে ঘরের কোনো দেয়ালজুড়ে। একটি নান্দনিক আয়না পাল্টে দিতে পারে ঘরের গুমোট পরিবেশ।

রুচিসম্মত শৌখিন আসবাব ঘরে নিয়ে আসে শৈল্পিকতার ছোঁয়া। তাই দৈনন্দিন গৃহসজ্জায় এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবের পাশাপাশি শৌখিন আসবাবের বিষয়টিকেও প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এখন গৃহসজ্জায় আয়নার ব্যবহার অনেক বেশি। ছিমছাম বসার ঘর থেকে ছোট স্নানঘর সব ক্ষেত্রেই অন্দরসজ্জায় করা হচ্ছে আয়নার ব্যবহার। আয়না শুধু সাজপোশাক দেখার জরুরি উপকরণই নয়, অন্দরে আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলতেও ব্যবহার করতে পারেন আয়না।

গৃহসজ্জায় আয়না অতুলনীয়। ঘরের দেয়ালকে সৌন্দর্যে ভরিয়ে তুলতে আয়নার জুড়ি মেলা ভার। তবে ঘরের যেখানে-সেখানে আয়না লাগালে হবে না। আয়না লাগানোর সঠিক স্থান সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। সঠিক জায়গায় সঠিক জিনিসের ব্যবহারেই আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। কোন্ ঘরের কোথায় আয়না রাখলে ভালো লাগবে, তা নিয়েই আজকের আয়োজন

বাড়ির প্রবেশপথে কলিংবেলের পাশে রাখতে পারেন সুন্দর আয়না। বাড়িতে ঢোকার আগেই নিজেকে কেমন দেখাচ্ছে, তা দেখে নেয়ার সুযোগ থাকবে। আয়নাকে কেন্দ্র করে বাড়ির প্রবেশপথে গাছ, শোপিস অথবা মোমবাতি দিয়ে সাজানো যেতে পারে।

শোবার ঘরে আলাদা করে ড্রেসিং টেবিল রাখতে না চাইলে আলমারির পাল্লায় বড় আয়না লাগিয়ে নিন। এছাড়া বড় ফ্রেমে আয়না বাঁধিয়ে বসিয়ে দিন দেয়ালজুড়ে। এ জন্য জানালার বিপরীত দেয়ালটা বেছে নিন। এতে একটা বাড়তি সুবিধা পাবেন। বাইরের আলো আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে ঘরটা বড় দেখাবে। আবার একটা পুরো দেয়াল খালি থাকলে বসার ঘরের মতো করে আয়না আর পারিবারিক ছবিগুচ্ছ করে সাজাতে পারেন। এতে ঘরের সাজে বেশ বৈচিত্র্য আসবে।

বিভিন্নভাবে বসার ঘরে আয়না ব্যবহার করা যায়। একটা দেয়ালে ভিন্ন রং দিয়ে তাতে সুন্দর একটা আয়না লাগান। চাইলে বড় একটা আয়না লাগাতে পারেন। আবার ছোট বা মাঝারি একটি আর কয়েকটি বাঁধানো ছবিগুচ্ছ করে সাজাতে পারেন। বসার ঘরের ফার্নিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়নার ফ্রেম নির্বাচন করুন। দেশীয় সাজের সঙ্গে নকশিকাঁথা ও শীতল পাটি দিয়ে ফ্রেম বানিয়ে নিতে পারেন। আবার চাইলে মাটির টেরাকোটার ফ্রেম করা আয়না ব্যবহার করতে পারেন।

শোয়ার ঘরের দক্ষিণ দিকটি আয়না লাগানোর জন্য বেছে নিতে পারেন। দুপুরের সুখকর আলোর ঝলকানি পেতে জানালার অন্যদিকের দেয়ালটি বেছে নিন। কিন্তু বেডরুম বা অন্য কোথাও সকালের মিষ্টি রোদের সান্নিধ্য পেতে জানালাসংলগ্ন স্থানে আয়না লাগাতে পারেন। আয়নার মধ্যে আলো এসে ঝিলিক ছড়াবে।

ডাইনিং রুমকে আয়না লাগানোর সবচেয়ে ভালো জায়গা বলা হয়। বিশেষত সেখানে যদি প্রতিফলিত করার জন্য একটি ঝাড়বাতি থাকে। ডাইনিং রুমে আয়না লাগালে অ্যান্টিকোয়েড আয়না লাগানো উচিত।

শূন্য দেয়ালও আয়না ঝুলিয়ে রাখার উপযুক্ত স্থান। কারণ আয়না এসব স্থানকে বড় ও উজ্জ্বল দেখাতে সাহায্য করে। তাই হলরুম বা বসার ঘরের খালি দেয়ালে নান্দনিক আয়না ব্যবহার করে তা সৌন্দর্যম-িত করে তুলুন।

আয়না লাগানোর উপযুক্ত স্থান সম্পর্কে তো জানা গেল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আয়না দিয়ে গৃহসজ্জার আরো কিছু কলাকৌশল রয়েছে। কোন্ ডিজাইনের আয়না কীভাবে লাগাবেন, সে বিষয়েও যথেষ্ট ধারণা থাকা দরকার। ঘর যদি আধুনিক, রাস্টিক, কাঠের ফ্রেমের অথবা মেটাল ডিজাইনের হয়, তাহলে ডেকোরেটিং স্টাইলে আয়না লাগান।

গ্রুপ করে দেয়ালে আয়না সাজিয়ে রাখতে পারেন। শুধু খেয়াল রাখুন চিত্রকর্মের মতো সমানভাবে বসানো হয়েছে কিনা। চিত্রকর্মের মূল বিষয়বস্তুর দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। আয়নার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয় এবং প্রতিটি আয়না সমান দূরত্বে বসাতে হবে।

লম্বা ঘর হলে আয়নাগুলো উল্লম্বভাবে সাজালে ভালো লাগবে। তবে আরো সুন্দর করে সাজাতে চাইলে সমান্তরালভাবে সাজাতে পারেন।

আয়না লাগানোর আগে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করে নিন। কারণ বারবার নড়াচড়া করা সমস্যা। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আয়না না লাগানোই ভালো। যেমন- বেডের কাছাকাছি আয়না না রাখাই ভালো।

গৃহের প্রবেশদ্বারে আয়না লাগান। তাহলে সেটা অতিথিদের নজর কাড়তে সক্ষম হবে। মনে হবে আয়নাটি তাদের স্বাগত জানাচ্ছে।

গৃহের দরজায় নান্দনিকতা আনতে সেখানে আয়না ঝুলিয়ে দিন। লম্বা আকৃতির সুন্দর একটি আয়না বাছাই করুন, তারপর সেটা দরজায় লাগিয়ে দিন।

বাথরুমে সাধারণত সব বাড়িতেই আয়না থাকে। তাহলে নতুন করে আর সাজিয়ে কী লাভ? অনেকেরই তাই মনে হতে পারে। কিন্তু না, এখানেও সৃজনশীলতা প্রকাশের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বেসিনের সামনে কোনো রকম একটি আয়না রাখলেই নয়। বাথরুমে নানা শৈলীর আয়না থাকলে নিজেরই ভালো লাগবে। বেসিনের সামনে আয়না সঠিকভাবে বসানো হয়েছে কিনা, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। ধরুন আয়না দিয়ে ঘর সাজিয়ে ফেললেন। এরপরও আরো কিছু কাজ কিন্তু থেকে যায়, তাহলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। আয়না দিয়ে অন্দর সাজালে নিয়মিত সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে। কেননা আয়নায় অল্পতেই দাগ বসে যায়, ধুলাবালু জমে। কাজেই প্রতিদিন একটু পরিষ্কার না করলে দেখতে খারাপ লাগবে। তাই অবশ্যই অন্দরের আয়নাগুলোর প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে।

কোথায় পাবেন :

আড়ং, যাত্রা, চেইন শপ বা বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে পাবেন বিভিন্ন ডিজাইনের দারুণ সব আয়না। বেতের আসবাবের দোকান, ঢাকার গুলশান ডিসিসি মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট, চাঁদনীচক, মৌচাকসহ ছোট-বড় অনেক মার্কেটে মিলবে আয়নার খোঁজ।

আড়ং ও যাত্রায় আছে ছোট-বড় নানা আকৃতির আয়না। মোহাম্মদপুরের আইডিয়া ক্রাফটে বেশ বড় আকারের আয়না পাওয়া যাবে। সেখানে নকশিকাঁথার মাঠ, সূর্য, হাতি, বনজঙ্গল প্রভৃতি অলংকরণে বিশালাকৃতির ফ্রেমের আয়না পাবেন ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। আড়ংয়ে নকশার ওপর নির্ভর করবে আয়নার দাম। সাদামাটা কাঠের ফ্রেমের আয়না ৮০০-৪০০০ টাকা, কাঠের কারুকাজ করা আয়না ১৫০০০-২০০০০, হ্যান্ড পেইন্টিং লুকিং গ্লাস পাওয়া যাবে ৫০০-১২০০ টাকার মধ্যে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের বিষয়ভিত্তিক আয়না তৈরি করতে চাইলে চলে যেতে পারেন পিঁড়ি কথনে। বর্ণমালার আয়না ২০০০-৪০০০ টাকা, সাম্পান ও সাজের আয়না ৩৫০০০-৪০০০০ এবং হাতপাখার আয়না ২০০০ টাকা। এ ছাড়া আজিজ সুপার মার্কেট, যাত্রা ও শিশু একাডেমিতে পাবেন এসব সুদৃশ্য নকশার অলংকরণে আয়না।

*** মডার্ন সাজে ব্যবহার করুন কারুকাজ করা কাঠ, পোরসেলিন, মেটাল বা হ্যান্ডপেইন্টের আয়না। এ ঘরে আয়নায় কাঠের সঙ্গে পিতল বা তামার ব্যবহার হলে বেশি গর্জিয়াস লুক আসে। বসার ঘরটা বড় দেখাতে চাইলে জানালার বিপরীত দিকে আয়না লাগান। এতে আলোর প্রতিফলনে ঘরটা আরো উজ্জ্বল ও বড় মনে হবে। খাবার ঘরে একাধিক আয়নার ব্যবহার না করাই ভালো। বেসিনের আকৃতি অনুযায়ী এর ওপর একটা নকশাদার আয়না বসান। খাবার ঘরটা ছোট হলে খাবার টেবিলের সমান্তরালে বিপরীত দেয়ালে আয়না ব্যবহার করা যেতে পারে। খাবার ঘর থেকে অন্য ঘরে যাওয়ার পথে প্যাসেজ বা একটা দেয়াল থাকলে সেখানেও আয়না ব্যবহার করতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে লক্ষ রাখুন খাবার টেবিল থেকে যেন আয়নাটি দেখা না যায়।

বেড রুম বা ডাইনিং রুমে লাগানো যেতে পারে কারুকার্যময় আয়না। ঘরে এমন আয়না থাকলে ড্রেসিং টেবিলের প্রয়োজন পড়ে না। সাজের সব উপকরণ আয়নার পাশে র‌্যাক বা শোকেস করে রাখতে পারেন। বাচ্চাদের ঘরের দেয়ালে আয়না লাগাতে চাইলে তাদের পছন্দের কার্টুনের ডিজাইনে তৈরি ফ্রেম ব্যবহার করতে পারেন।

বেড রুমটি বড় দেখাতে ব্যবহার করতে পারেন দেয়ালজুড়ে থাকা আয়না। আবার ঘরের পরিবেশটি অন্যরকম দেখাতে দেয়ালে ব্যবহার করতে পারেন নানা আকৃতির আয়না। কাঠ ও বেতের পাশাপাশি এখন নানা উপাদানে তৈরি হচ্ছে আয়নার ফ্রেম। বাজারে পাওয়া আয়নার ফ্রেমগুলোও দেখতে দারুণ বৈচিত্র্যময়।

ত্রিকোণ, চার কোণ, লম্বা, গোল এমন নানা আকৃতির ছোট-বড় বেশ কয়েকটি আয়না দিয়ে সাজাতে পারেন আপনার ঘরের দেয়াল। এসব আয়নার কোনোটিতে হয়তো আপনার চোখ দেখা যাবে, কোনোটিতে হয়তো দেখা যাবে নাক! শিশুরা দারুণ আনন্দ পাবেন এমন দেয়াল দেখে। দেয়ালে প্লাস্টার করে লাগিয়ে নিতে পারেন এসব আয়না। এ ছাড়া আইকা আঠার সাহায্যেও লাগানো যেতে পারে আয়না। ঘরের আবহ সুন্দর দেখাতে আয়নাগুলোর ফাঁকে রং করে সাজিয়ে নিতে পারেন দেয়ালটি। ফলস সিলিং তৈরিতে অনেক সময় কাচ ব্যবহার করা হয়। চাইলে সেখানে আয়নাও ব্যবহার করতে পারেন।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন