ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ইতিহাস মুছে ফেলার খেলা

প্রকাশনার সময়: ২৩ মে ২০২২, ০৮:৪৭

পাঠ্যবই থেকে মোগল ও মুসলিম ইতিহাসকে ‘সাফ’ (মোছা ফেলা) করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার ইতিহাস নিশ্চিহ্ন করণের পদক্ষেপকে ‘পরিষ্কার ও পবিত্রকরণ’ বলে ঢেকুর তুলছেন! মূলত ইতিহাস মোছার এই কাজ ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘গণহত্যা করা’ বলা যেতে পারে। স্পষ্ট কথা, যাদের ইতিহাস নিশ্চিহ্ন করা হয়, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

বিগত সপ্তাহে খবর এসেছে, ‘সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন’ পাঠ্যবই থেকে এশিয়া-আফ্রিকার ইসলামি দেশসমূহের উন্নতি-অগ্রগতি ও অস্তিস্ত সংক্রান্ত অধ্যায় বাদ দিয়েছে। বাদ দিয়েছে ভারতের মোগল শাসনের অধ্যায়ও। বাদ দেয়া অধ্যায়ে যেমন রয়েছে ‘ঠান্ডা যুদ্ধ, শিল্প বিপ্লব, খাদ্য সংরক্ষণ’। তেমনি রয়েছে, ‘কৃষিক্ষেত্রে গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব’ ইত্যাদি। ইতিহাস ও রাজনীতি অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত বিখ্যাত কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের একটি কবিতাও বাদ দেয়া হয়েছে। মুসলিম ইতিহাস বাদ দেয়া হয়েছে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং’ কর্তৃপক্ষের রিপোর্টের ভিত্তিতে। এমন নয়, শুধু ‘সিবিএসআই’-এর পাঠ্যবইতে পরিবর্তন করা হয়েছে; বরং অনেক প্রাদেশিক শিক্ষাবোর্ডও পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। মহারাষ্ট্রের বিজেপি-শিবসেনা সরকারের পূর্বের আমলে সপ্তম-নবম শ্রেণির ইতিহাস বই থেকে মোগল শাসনামলের কথা বাদ দিয়ে মারাঠা ও শিবাজি শাসনের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। মহারাষ্ট্রের ইতিহাস বিষয়ক পাঠ্যবই থেকে বিখ্যাত তাজমহল, কুতুব মিনার ও লালকেল্লা ইত্যাদির কথা গায়েব হয়ে গেছে!

এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য কী? কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপির প্রাদেশিক সরকারের এ যাবতকালের বিভিন্ন পদক্ষেপের ওপর দৃষ্টি রাখলে উক্ত প্রশ্নের উত্তর সহজে বুঝে আসার কথা। উত্তরপ্রদেশে যোগি আদিত্যনাথ ক্ষমতায় আসার পর (এখন যোগির দ্বিতীয় মেয়াদ চলছে) মুসলিম নামের প্রসিদ্ধ শহরগুলোর নাম পরিবর্তন করে ফেলেছে। ফয়জাবাদ জেলাকে ‘অযোধ্যা’, এলাহবাদকে ‘প্রয়াগরাজ’, মোগল স্টেশনকে ‘দীনদয়াল স্টেশন’ নামে পরিবর্তন করা হয়েছে। আলিগড়ের নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘হরিগড়ের’ পথে! আকবর এলাহবাদির নাম যেভাবে ‘আকবর প্রয়াগরাজি’ করে দেয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘হরিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ করে দেয়া হবে! ইতোমধ্যে বিজেপির নেতারা দাবি তুলেছেন, দিল্লির আশপাশের ৪০টি গ্রামের নাম পরিবর্তন করা হোক। এই দাবি তোলার প্রধান অনুঘটক দিল্লি বিজেপির প্রধান আদেশ গুপ্তা।

ইতোমধ্যে দক্ষিণ দিল্লির ‘মুহাম্মদপুর’ গ্রামের নাম পরিবর্তন করে ‘মাধুপরাম’ রাখা হয়েছে। বিজেপি এসব পরিবর্তনকে তাদের বিরাট বিজয় হিসেবে দেখছে। নাম পরিবর্তনের তালিকা তৈরি করে শিগগিরই ‘দিল্লি করপোরেশনের’ মারফতে দিল্লি সরকারের কাছে জমা দেয়া হবে। আদেশ গুপ্তার দাবি, ‘মুসলমানদের এসব নাম গোলামির নিদর্শন! সাধারণ জনগণ নাম পরিবর্তন চায়!’ অথচ দিল্লির মূখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘বিজেপি করপোরেশনের শাসনকালে কেন নাম পরিবর্তন করেনি?’

বিজেপি শাসিত সব রাজ্যে মুসলিম নাম বাদ দেয়ার হিড়িক চলছে। মহারাষ্ট্রে বিজেপি ক্ষমতায় না থাকলেও শিবসেনাসহ অন্যরা ‘আওরঙ্গবাদের’ নাম পরিবর্তন করে ‘শিবাজিনগর’ রাখার দাবি করে আসছে।

মুসলিম নাম বাদ দেয়ার উদ্দেশ্য কী? উত্তর অনেক সহজ। মানুষের মাথা থেকে ইতিহাস ভুলিয়ে দেয়া— এই দেশ মুসলমানরা ৮০০ বছর শাসন করেছেন, মুসলমান শাসকগণ নির্মাণ শিল্পকে শ্রেষ্ঠত্বের স্থানে উপনীত করেছেন, দেশকে তাজমহল ও লালকেল্লার মতো সপ্তাশ্চর্যের ঐতিহ্য উপহার দিয়েছেন, সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে সেরা করেছেন। ভুলিয়ে দেয়া, মুসলমানদের শাসনামলে ধর্মীয় উন্মাদনা ছিল শূন্যের কোটায়, তারা গঙ্গা-যমুনার সংস্কৃতি ধরে রেখেছিলেন।

মোগল ইতিহাস নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্য, জোরপূর্বক একথা প্রতিষ্ঠিত করা, হিন্দুস্তানের উন্নতিতে মুসলমানদের কোনো অবদান নেই! ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে মুসলমান শাসক-নেতাদের কোনো কৃতিত্ব নেই! ভারতের স্বাধীনতা অর্জনে নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম মুজাহিদদের নাম পাঠ্যবই থেকে আগেই বাদ দেয়া হয়েছে।

আজকের মুসলমান প্রজন্মের এই ইতিহাস জানা নেই, এই দেশ স্বাধীন করতে মুসলমানরা কেমন সীমাহীন ত্যাগ ও কোরবানি স্বীকার করেছেন। প্রজন্ম জানে না, মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরকে স্বাধীনতা সংগ্রামের অপরাধে রেঙ্গুনে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তার দুই সন্তানের মাথা গর্দান থেকে ছিন্ন করে তার সামনে উপস্থিত করা হয়েছিল!

বাস্তব কথা হলো, হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা-ইতিহাস মুসলমানদের তাজা রক্তের অক্ষরে লেখা। দিল্লির ‘ইন্ডিয়া গেটে’ ৯৫ হাজার তিনশ জন বীরের নাম খোদাই করা আছে। এর মধ্যে ৬২ হাজার ৯৪৫ জনই মুসলমান! ভারত স্বাধীনতার লড়াই শুরু হয়েছিল ১৭৮০ সালে, টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন। সেই টিপু সুলতানের নাম-অবদান পাঠ্যবই থেকে বাদ দেয়ার দাবি তোলা হচ্ছে! কর্নাটকের বিজেপি সরকার টিপু সুলতানের নাম ইতোমধ্যে বাদ দিয়েছেও! আমাদের বর্তমান প্রজন্ম ইশফাকুল্লাহ শহিদ, আমির হামজা, মাওলানা মাহমুদ হাসান, মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ প্রমুখের নাম তো জানেই না। এমনকি মাওলানা আজাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আলি জাওহার প্রমুখের নামও প্রজন্মকে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে!

বর্তমানে হচ্ছেটা কী? ইতিহাসে যারা স্বর্ণোজ্জ্বল তাদের এখন পাঠ্যবই থেকে বিতাড়ন করা হচ্ছে। অপরদিকে ইতিহাসে যাদের কোনো অবদান নেই, তাদের ‘হিরো’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার নোংরা চেষ্টা চলছে। যেমন সংঘ পরিবার। না তারা স্বাধীনতার আন্দোলনে ছিল, না স্বাধীনতার লড়াইয়ে। না তারা দেশের উন্নতিতে অবদান রেখেছে, না জনগণের অগ্রগতিতে।

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতায় আসার পূর্ব থেকেই আরএসএস-বিজেপির চেষ্টা ছিল, দেশের মুসলমানদের নাম মুছে ফেলা। নিজ সম্প্রদায়ের ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত করা। এটাও মুসলিম ‘প্রজন্ম হত্যার’ একটি প্রকার। বিগত ৯৮ বছর যাবত এই চেষ্টা চলছে। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ আরএসএস প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পূর্ণ হবে। আরএসএস নেতারা ৯৮ বছর যাবত দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সেকুলার নীতি পরিবর্তন করে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ বানানোর পেছনে কঠোর পরিশ্রম করেছে। তাদের আশা, বাকি ২ বছরে দেশ পরিপূর্ণ ‘হিন্দুরাষ্ট্রে’ পরিণত হবে!

২০১৯ সালে ‘দি আরএসএস রোডম্যাপ ফর দি টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ নামে বাজারে সুনিল আম্বেকরের ইংরেজি ভাষার একটি বই এসেছিল। সুনিল বিজেপির ছাত্র সংগঠন ‘আইবিভিপি’-এর অরগানাইজিং সেক্রেটারি। বইয়ের একটি অধ্যায় ‘ভারতের ইতিহাস’। এই অধ্যায়ে জোর দাবি তোলা হয়েছে, ‘পাঠ্য বইতে যেসব ইতিহাস এখন পাঠ করানো হয়, তাতে স্বাধীনতার ও নিজেদের ধর্মের কথাও নেই! ফলে এসব ইতিহাস ভারতবিরোধী ও বাতিলযোগ্য! এসব ইতিহাস সংশোধন জরুরি। সংঘ পরিবার পরিবর্তনের মিশন নিয়েই এগোচ্ছে।’ লেখক আরো লিখেছেন, ‘আমরা ইতিহাস বিষয়ে ‘বিশেষ পরিকল্পনা’ হাতে নিয়েছি। সে পরিকল্পনা হলো, ভারতের পুরাতন ইতিহাসকে সংশোধন করা।’ তার কথা অন্যভাবে বলা যায়, মূলত তাদের পরিকল্পনা ভারতের মুসলিম ইতিহাস-ঐতিহ্য ধূলিসাৎ করে দেয়া। লেখকের আরেকটি দাবি, ‘পাঠ্য-পুস্তককে ভারতীয়করণ করা হবে।’ বাহ্যিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২২-২০২৩ সাল থেকেই সে পরিকল্পনা জোর গতিতে বাস্তবায়ন হতে শুরু করেছে। এখন পাঠ্যবই থেকে মুসলমান, মোগলদের নাম মুছে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা আরো বহুগুণ বৃদ্ধি করে ভয়ংকর খেলা শুরু হচ্ছে। আল্লাহ মালুম, সামনে না জানি কী কী খেলা শুরু হয়!

‘মুম্বাই উর্দু নিউজ’ সম্পাদকের কলাম থেকে অনুবাদ—

আমিরুল ইসলাম লুকমান

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ