ঢাকা | শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০ আশ্বিন ১৪২৮

মাত্র এক পরিবারের ২৬ সদস্যের একটি দেশ

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক

প্রকাশনার সময়

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৪৯

আয়তন মাত্র ৭৫ বর্গ কিলোমিটার। জনসংখ্যা ২৬ জন। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের মধ্যেই রয়েছে এই দেশ। বিশ্বের সবচেয়ে ছোট ‘দেশ’। নাম ‘প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভার’। এ দেশের নিজস্ব মুদ্রা, নিজস্ব পাসপোর্ট, ভিসাÑ সবই রয়েছে। তবে প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভার নিজেকে দেশ ঘোষণা করলেও অস্ট্রেলিয়ার বাকি দেশগুলো কিন্তু একে দেশ হিসাবে মানতে নারাজ।

৫১ বছর আগে এক বিশেষ কারণে সরকারের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই ওই ভূখ-কে দেশ হিসাবে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন লিওনার্দ ক্যাসলে নামে এক ব্যক্তি। যেখানে তিনি থাকতেন, সেই পুরো ভূখ-ই আসলে লিওনার্দের সম্পত্তি ছিল। চাষের জমি ছিল তার। প্রতি বছর ৪ হাজার হেক্টর জমিতে গম উৎপাদন হতো। কিন্তু প্রশাসন গম কেনাবেচার নতুন নিয়ম চালু করে দেয়। যার ফলে ৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল নয়, মাত্র ৯৯ একর জমিতে যে ফসল ফলত, তা তিনি বিক্রি করতে পারতেন। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত বদলের জন্য অনেক দরবার করেও কোনো লাভ হয়নি। তার পরই তিনি নিজের ভূখ-কে আলাদা দেশ হিসাবে ঘোষণা করে দেন। নাম রাখেন প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভার।

নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন। দেশের জন্য আলাদা মুদ্রা চালু করেন। নাম দেন হাট রিভার ডলার। এক হাট রিভার ডলারের মূল্য এক অস্ট্রেলিয়ান ডলারের সমান রাখেন। দেশের জন্য আলাদা পতাকা তৈরি করেন। সরকারি কাজকর্মের জন্য আলাদা সিলমোহর। এ ছাড়া পাসপোর্ট, ভিসা সবই আলাদা করে ফেলেন।

কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার বাকি দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশও প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভারকে স্বতন্ত্র দেশ মানতে চায় না। স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তাই ১৯৭০ সালের ২১ এপ্রিল দেশটির প্রতিষ্ঠা দিবসে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে আমন্ত্রণ জানান তিনি। কারণ ব্রিটেনের রানি তখন অস্ট্রেলিয়ারও রানি ছিলেন। রানি যাননি কিন্তু তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠিই হাতিয়ার হয়ে যায় লিওনার্দের।

বিষয়টি পড়তে যতটা সহজ, বাস্তব তেমন ছিল না। প্রচুর আইনি জটিলতার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল। এদিকে তার নামে বকেয়া সরকারি করের বোঝাও বাড়ছিল। কারণ প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভারকে আলাদা দেশ হিসাবে কোনো দিনই মানেনি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া। ফলে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত আইন তার ওপর প্রযোজ্য ছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর নাগরিকদের কর দিতে হয় সরকারকে। লিওনার্দের নামেও সেই কর বরাদ্দ করা হতো। ফলে বারবারই বিচার চেয়ে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। তবে হাল ছাড়েননি লিওনার্দ।

২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি নিজে রাজা ছিলেন। তারপর তার ছেলে গ্রেমির মাথায় রাজমুকুট পরিয়ে দেন। ওই বছরই সুপ্রিম কোর্ট তাকে নোটিশ পাঠিয়ে বকেয়া ২৭ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার কর দ্রুত জমা দেয়ার নির্দেশ দেন। যত দিন যাচ্ছিল, আরো আইনি জটিলতায় ফেঁসে যাচ্ছিলেন লিওনার্দ।

২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় তার। কিন্তু এসবের মধ্যে একটাই লাভ হয়েছিল প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভারের। পর্যটকদের ভিড় জমতে শুরু করেছিল স্বঘোষিত বিশ্বের ছোট দেশটি দেখার জন্য। প্রতি বছর এর থেকেই মোটা অর্থ উপার্জন হতে শুরু করে লিওনার্দ এবং তার পরিবারের। এ দেশে ঢুকতে গেলে আলাদা ভিসা নিতে হতো পর্যটকদের।

কিন্তু লিওনার্দের মৃত্যুর পর থেকে দেশের অর্থনীতি ক্রমে ক্ষতির মুখ দেখতে শুরু করে। পর্যটকদের আনাগোনাও কমতে শুরু করেছিল। তার ওপর অতিমারির ধাক্কা দোসরের মতো কাজ করে। ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি লিওনার্দের বংশধরেরা দেশের সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা করেন।

পরিস্থিতি এমনই যে, দীর্ঘ ৫১ বছর ধরে করের যে বোঝা প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভারের ওপর চাপানো হয়েছে, তা পরিশোধ করতে গেলে পুরো দেশটাকেই বেচে দিতে হতে পারে। এই দেশে সেভাবে ঘুরে দেখার কিছু নেই। একটি অফিস, চার-পাঁচটি বাড়ি এবং বিস্তৃত চাষের জমি। তবে দেশটি নিজেই একটি স্বতন্ত্র ইতিহাসের সাক্ষী। সে কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসতেন।

তবে বিশ্বের আর কোনো দেশ একে দেশ হিসাবে মনেই করে না। ২০০৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাউন্সিল হাট রিভারের জনতার পাসপোর্টকে ‘ফ্যান্টাসি পাসপোর্ট’ উল্লেখ করেছিল। অস্ট্রেলিয়ার শহর পার্থের ৫১৭ কিলোমিটার উত্তরে হাট নদীর তীরে অবস্থিত প্রিন্সিপ্যালিটি অব হাট রিভারের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আজও ভরসা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ওই চিঠিটুকুই। সূত্র : আনন্দবাজার।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x