ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বন্ধ্যাত্ব কেন হয়, চিকিৎসা কী, কোথায় যাবেন?

প্রকাশনার সময়: ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:২৮ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:৩২

বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। দুই বছর বা এর অধিক সময় কোনো ধরনের জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ছাড়া গর্ভধারণে ব্যর্থ হলে তাকে ডাক্তারি ভাষায় বন্ধ্যাত্ব হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।

ঢাকায় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে এক সন্ধ্যায় গিয়ে দেখা হয় এক মনমরা নারীর সঙ্গে। সেখানে চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে অপেক্ষায় ছিলেন বেশ কয়েকটি দম্পতি। ঢাকা ও দেশের নানা জেলা থেকে এসেছেন তারা। বেশিরভাগের বয়স তিরিশের উপরে বলে মনে হলো।

পটুয়াখালীর বাউফল থেকে এই নারীটি বসেছিলেন একদম পেছনের সারিতে। কথা বলতে চাইলে শুরুতে একটু দ্বিধা বোধ করলেন।

এক পর্যায়ে জানালেন সন্তান জন্ম না দিতে পারলে তার স্বামীকে দ্বিতীয় বিয়ে করানো হবে, শ্বশুরবাড়ি থেকে এমন কথা শোনার পর তিনি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছেন এক আত্মীয়র সাথে।

সন্তানহীনতার জন্য পারিবারিকভাবে তাকে কিসের মুখোমুখি হতে হয় তার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলছেন, "আমার বিয়ে হইছে আট বচ্ছর হয়। আমাকে বলা হয় এত বছর হইলো বিয়া হইছে এখনো বাচ্চা হয় না, সমস্যা কি? আমার স্বামীকে আমি বাচ্চা দিতে পারতেছি না। এত টাকা পয়সা কে খাবে? এইগুলাতো চলতি পথে রোজ শুনতে হয়। শ্বশুরবাড়ি থেকে বলতেছে আমরা আমাদের ছেলেকে আবার বিয়ে করাবো। আমার যে বাচ্চা হয় না সেটা নিয়ে আমার কি কষ্ট হয় না? এখন ঢাকায় আসছি আল্লাহ পাক যদি আমারে একটা সন্তান দেয়।"

এই নারী বলছিলেন বিয়ের দ্বিতীয় বছর থেকেই তাকে চাপ দেয়া শুরু হয়েছে। অবশেষে সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন।

অথচ বন্ধ্যাত্ব নারী ও পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। চিকিৎসকেরা বলছেন, সন্তান ধারণে অক্ষম নারী ও পুরুষের সংখ্যা একই রকম। যদিও পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বাংলাদেশে নারীদেরই এজন্য নিগ্রহের শিকার হতে হয় বেশি।

বন্ধ্যাত্বের এখন নানা চিকিৎসা বাংলাদেশে রয়েছে। তবে তা দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল এবং কষ্টকর।

যেসব কারণে নারীদের বন্ধ্যাত্ব হয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সন্তান ধারণের চেষ্টা করার পর টানা এক বছর সময়কাল যদি কেউ সফল না হন তাহলে তাকে ইনফার্টাইল বা সন্তান ধারণে অক্ষম হিসেবে গণ্য করা হয়।

বাংলাদেশে কত শতাংশ দম্পতি বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

স্ত্রী রোগের পাশাপাশি নারীদের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন ডা. সেলিনা আক্তার। তিনি বলছিলেন, তার কাছে যে দম্পতিরা আসেন তাদের মধ্যে সন্তান ধারণে অক্ষমতায় নারী ও পুরুষের সংখ্যা একই রকম।

দেখা যায় দম্পতিদের মধ্যে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী এবং একই সংখ্যক স্বামীদের শারীরিক সমস্যা থাকে। বাকি ১০ ভাগ ক্ষেত্রে দুজনেরই সমস্যা থাকে। কিন্তু ১০ ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা অজানা থেকে যায়।

নারীরা প্রধানত কি কারণে সন্তান ধারণে অক্ষম হয়ে থাকেন সে সম্পর্কে ধারণা দিলেন ডা. সেলিনা আক্তার:

১. প্রেগন্যান্সির জন্য জরুরি পলিসিস্টিক ওভারি, যার মাধ্যমে একটা করে ওভাম আসার কথা, সেটা আসে না।

২. জরায়ুর কিছু সমস্যা থাকে যা জন্মগত হতে পারে আবার অসুখের কারণে হতে পারে।

৩. জন্মগত সমস্যার কারণে হয়ত ডিম আসছে না, তার টিউব ব্লক, জরায়ু যেটা আছে সেটা বাচ্চাদের মতো।

৪. আরও কিছু অসুখ আছে, যেমন: ওভারিয়ান চকলেট সিস্ট, এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে হতে পারে।

৫. হরমোনের কারণেও হতে পারে। যেমন থাইরয়েডের সমস্যার কারণে হতে পারে। আর যৌনবাহিত রোগের কারণে মেয়েদের প্রজনন অঙ্গগুলোর ক্ষতি করে। সেজন্য বন্ধ্যাত্ব হতে পারে।

পুরুষের যেসব কারণে বন্ধ্যত্ব

জাতীয় কিডনি ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ফজল নাসের বলছেন, তাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে পুরুষরা বন্ধ্যত্বের সমস্যা নিয়ে অনেক দেরিতে চিকিৎসকের কাছে যান।

কেননা সন্তান না হলে শুরুতেই স্ত্রীকে চিকিৎসকের কাছে নেয়া হয়। পুরুষদের বন্ধ্যত্বের মূল কারণগুলো কি জানালেন তিনি:

১. একটা কারণ এজোস্পার্মিয়া, অর্থাৎ বীর্যের মধ্যে শুক্রাণু নেই। তার নালির কোথাও বাধা সৃষ্টি হয়েছে তাই শুক্রাণু মিলতে পারছে না। শুক্রাণু তৈরি হওয়ার যে স্থান অণ্ডকোষ, কোন কারণে সেটি তৈরিই হয়নি।

২. অনেক সময় শুক্রাণু থাকে কিন্তু পরিমাণে কম থাকে।

৩. আবার শুক্রাণুর পরিমান ঠিক আছে কিন্তু মান ঠিক নেই। যার ফলে সে ডিম ফার্টিলাইজ করতে পারে না।

৪. এছাড়া টেস্টোস্টেরন হরমোনও 'সিক্রেশন' হতে হবে।

৫. প্রজনন অঙ্গে কোন ধরনের আঘাত

৬. অস্ত্রোপচারের কারণে সৃষ্ট বাধা

৭. প্রজনন অঙ্গে যক্ষ্মা

৮. ডায়াবেটিস

৯. ছোটবেলায় মাম্পস

১০. এমনকি মাথায় চুল গজানোর ঔষধও পুরুষদের সন্তান ধারণের অক্ষমতার উৎস।

যে ধরনের চিকিৎসা রয়েছে

সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাংলাদেশে এখন বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার নানা ব্যবস্থা রয়েছে।

সে সম্পর্কে ডা. সেলিনা আক্তার বলছিলেন, "যখনই কোন কাপলের এক বছর বাচ্চা হচ্ছে না, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে। বয়স যদি তিরিশের বেশি হয়, সেক্ষেত্রে আমরা এক বছর অপেক্ষা করতে মানা করি। তাদের তার আগেই ডাক্তারের কাছে চলে আসতে হবে। ছয় মাসের মধ্যে যদি না হয়। আর বয়স যদি তিরিশের নিচে হয় তাদের বলি এক বছরের কথা।"

এছাড়া আজকাল অনেকেই পেশাগত কারণে সন্তান ধারণে সময় নেন, সেটি এক এসময় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে এখন বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার নানা ব্যবস্থা রয়েছে।

মানুষের জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন এসেছে সেটি স্বাস্থ্যসম্মত করা পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি:

১. মেয়েদের খাদ্যাভ্যাস ঠিক করতে হবে।

২. ক্যালরি খাওয়া কমাতে হবে।

৩. ঘরে রান্না খাবার খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

৪. ব্যায়াম করতে হবে।

৫. শরীরের স্বাভাবিক ওজন রক্ষা করতে হবে।

৬. জীবনাচারণ পরিবর্তন করতে হবে।

৭. দিনে ঘুমানো, রাতে জেগে থাকার মত অভ্যাস বদলাতে হবে।

৮. বয়স থাকতে বাচ্চা নিতে হবে।

ডা সেলিনা আক্তার বলছেন, নারীদের ডিম্বাণু বৃদ্ধির জন্য ঔষধ, হরমোন ইনজেকশন দেন তারা। ডিম্বাশয়, এর নালী ও জরায়ুর সমস্যা দেখতে ল্যাপারস্কপি রয়েছে। কিছুদিন আগে স্বল্প পরিসরে চালু হয়েছে স্টেম সেল থেরাপি।

সন্তান জন্মদানে অক্ষম দম্পতির দেহ থেকে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সংগ্রহ করে কৃত্রিম পরিবেশে তা নিষিক্ত করে পুনরায় স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপন করা বা টেস্টটিউব বেবির ব্যবস্থা শুরু হয়েছে প্রায় কুড়ি বছর আগে।

তবে বাংলাদেশে সন্তানহীনতার চিকিৎসা যতটুকু রয়েছে তার বেশিরভাগেই নারীদের জন্য এবং তা মূলত বিভাগীয় শহর ভিত্তিক।

দেশের সবগুলো বিভাগীয় শহরে মেডিকেল কলেজগুলোতে এর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

ঢাকায় শুধুমাত্র বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় বেসরকারি ক্লিনিক রয়েছে। বড় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ইনফার্টিলিটি বিভাগ রয়েছে।

পুরুষদের জন্য কিছু চিকিৎসার কথা বলছিলেন চিকিৎসক ফজল নাসের:

১. ঔষধ দিয়ে শুক্রাণু বাড়ানো যেতে পারে।

২. স্বাভাবিক হচ্ছে প্রতি মিলিতে চল্লিশ থেকে ১২০ মিলিয়ন শুক্রাণু থাকার কথা। যদি সংখ্যাটা ১০ মিলিয়নের নিচে নেমে যায়, তাহলে কৃত্রিম গর্ভধারণে যেতে হবে।

৩. যদি পুরোপুরি 'অবস্ট্রাকশন' হয়ে থাকে যে, শুক্রাণু আসছে না, তাহলে দেখতে হবে অণ্ডকোষটা সক্রিয় আছে কিনা।

৪. অণ্ডকোষ সক্রিয় থাকলে সেখান থেকে সুঁই দিয়ে শুক্রাণু নিয়ে এসে টেস্টটিউব পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দেয়া যায়।

"পৃথিবীর ভাল কেন্দ্রগুলোতেও অবস্ট্রাকশনের সার্জারি সফল হওয়ার হার মোটে ২৫ শতাংশ এবং এটি খুবই ব্যয়বহুল", বিবিসিকে বলেন মি. নাসের। বিবিসি বাংলা

নয়া শতাব্দী/এম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়