ঢাকা, শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ হয় যেভাবে

প্রকাশনার সময়: ১১ মে ২০২২, ১১:১৫

ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়ার রীতি শত শত বছর ধরে চলে আসছে। নামকরণের প্রাচীন ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৫২৬ সালে ৪ অক্টোবর পুয়ের্তো রিকোয় একটি হারিকেন আঘাত হানে। সে সময়ে গির্জার সন্তদের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। সেইন্ট ফ্রান্সিসে ক্যাথলিকদের ভোজ দিবসের উদযাপনের সময় এই হারিকেন আঘাত হানে বলে ঝড়ের নাম রাখা হয় ‘সান ফ্রান্সিসকো’।

নামকরণ নিয়ে কিছু মজার ঘটনাও আছে। প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ ক্লেমেন্ট লিন্ডলি র্যাগ আনুষ্ঠানিকভাবে ঝড়ের নাম দিয়েছিলেন। ভ্রমণপিপাসু এই আবহাওয়াবিদ ছিলেন রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির সম্মানিত ফেলো। আবহাওয়াবিদ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় ঝড়ের নামকরণ করতে প্রাথমিকভাবে গ্রিক ও রোমান পুরাণের চরিত্রের নাম ব্যবহার করেন।

তিনি অস্ট্রেলিয়ার আবহাওয়া অধিদফতর ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ান সরকার তাকে নিয়োগ দেয়নি। তার হতাশা ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে তিনি দক্ষিণ গোলার্ধের কিছু ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ান রাজনীতিবিদদের নাম দিয়ে দেন। ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কিভাবে অথবা কেনইবা করা হয় তা নিয়ে দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ পড়ুন দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।

হিন্দুস্তান টাইমস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৪০ সালের দিকে ফ্লোরিডার মিয়ামিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর হারিকেন অফিস উত্তর আটলান্টিকের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ক্ষেত্রে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম ব্যবহার করেন। সে সময় নামকরণ প্রক্রিয়া শুধু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য করা হতো।

জনসাধারণের সামনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হতো না। পরে সেসব নামের বদলে নারীর নামে ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ক্যাটরিনা, নার্গিস, স্যান্ডি, রেশমি, রিটা, বিজলি, অগ্নি, নিশা, গিরি, হেলেন, চপলা, অক্ষি, লুবান, তিতলি, নিলুফার- এসব ঘূর্ণিঝড়ের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই! অনেকেই আক্ষেপ করেই বলেন, শুধু মেয়েদের নামেই কেন ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়? এ নিয়ে মজার সব যুক্তিও আছে। আবহাওয়াবিদরা মনে করতেন, মেয়েদের নাম সহজ হয়ে থাকে, যা মনে রাখাও সহজ। তাই হয়তো তাদের নামেই ঝড়ের নামকরণ হতো। বছরের প্রথম যে ঘূর্ণিঝড় হতো, তার নাম দিতেন ‘এ’ দিয়ে।

বছরের দ্বিতীয় ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেওয়া হতো ‘বি’ দিয়ে। এভাবে প্রতি বছর ইংরেজি বর্ণ দিয়ে পর্যায়ক্রমে নাম রাখতেন তারা। অবশেষে দেখা যায়, বিগত সব ঝড়ের নামই মেয়েদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। তখন থেকেই প্রশ্ন উঠতে থাকে, নারীর নামেই কেন ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়? ১৯৫০ সালের দিকে সে রীতিতেও খানিক পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়।

মার্কিন আবহাওয়াবিদ সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন যে, সংক্ষিপ্ত ও সহজ নাম সবার জন্য মনে রাখা সহজ হবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও নামকরণে আরো দুই দশক ধরে নারীদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। ৫০-৬০-এর দশকে নারীদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে ১৯৭৮ সাল থেকে নারীর নামের সঙ্গে পুরুষের নামও রাখার প্রচলন শুরু হয়। পরের বছর মেক্সিকো এবং আটলান্টিক উপসাগরীয় অঞ্চলেও পুরুষদের নাম ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে বার্ষিক ও দ্বিবার্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বিশ্বব্যাপী পাঁচটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় আঞ্চলিক সংস্থা বা প্যানেলের মাধ্যমে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের নামের তালিকা নির্ধারণ করা হয়। বিশ্বজুড়ে ঘূর্ণিঝড় নামকরণে দশটি আলাদা অঞ্চলে বিভক্ত রয়েছে।

সেগুলো হলো- ক্যারিবিয়ান সাগর, মেক্সিকো উপসাগর এবং উত্তর আটলান্টিক। পূর্ব-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর। মধ্য-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর। পশ্চিম-উত্তর প্রশান্ত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চীন। অস্ট্রেলিয়ান ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কেন্দ্রের আওতাভুক্ত। আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্রের আওতাভুক্ত, ওয়েলিংটন। মরেসবি বন্দর ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কেন্দ্রের আওতাভুক্ত, পাপুয়া নিউগিনি। জাকার্তার ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সতর্কতা কেন্দ্রের আওতাভুক্ত। উত্তর ভারত মহাসাগরের আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগর। দক্ষিণ-পশ্চিম ভারত মহাসাগর।

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে পাঁচটি আঞ্চলিক সংস্থা। এর ভেতরে একটি হচ্ছে- বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। জাতিসংঘ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশন। ২০০০ সালে ওমানে এই প্যানেলের ২৭তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়। ফলে প্রথমবারের মতো ২০০৪ সাল থেকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর উপকূলবর্তী দেশগুলোতে ঝড়ের নামকরণের প্রচলন শুরু হয়। সে সময় আটটি দেশ (বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড) মিলে মোট ৬৪টি নাম প্রস্তাব করে। ২০০৪ সালে বাংলাদেশের দেয়া ‘অনিল’ নামে প্রথম ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ হয়েছিল। এই ঘূর্ণিঝড় ভারতে আঘাত হানে। নামকরণ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশে আঘাতহানা প্রথম ঘূর্ণিঝড়টি ছিল ‘সিডর’। সিডর শব্দের অর্থ চোখ। এটি ছিল ওমানের দেওয়া নাম। অবশেষে থাইল্যান্ডের দেওয়া নাম ‘আম্ফান’-এর মধ্য দিয়ে ২০০৪ সালের সেই তালিকার নাম শেষ হয়ে যায়। ফলে প্রয়োজন হয় নতুন কমিটি ও নতুন নামের। ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার অধিবেশনে যুক্ত হয় আরো পাঁচটি দেশ। দেশগুলো হলো ইরান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন। ফলে মোট সদস্য দাঁড়াল ১৩টি। ১৩টি দেশ থেকে ১৬৯টি নতুন নামের তালিকা নিয়ে চূড়ান্ত তালিকা করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। এদিকে এই নামগুলো থেকে নামকরণ করা শেষ হলে বর্তমানে ১৩ দেশ নতুন করে নামের প্রস্তাব করেছে।

ডব্লিউএমও ২০২০ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সম্ভাব্য ১৬৯টি ঘূর্ণিঝড়ের নামের তালিকার অনুমোদন দিয়েছে। এই তালিকা ২২ এপ্রিল ডব্লিউএমও ও বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের আরএসএমসির সদস্য দেশগুলোর কাছে পাঠানো হয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বৈঠকে এক বা একাধিক জ্যেষ্ঠ আবহাওয়া কর্মকর্তা অংশ নিয়ে থাকেন। আগে থেকে তারা আলোচনা করে নেন কী নাম হবে। পরে পর্যায়ক্রমে সেই তালিকা থেকে ঝড়ের নাম বাছাই করা হয়। আগে ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের ঝড়ের নাম হতো সন্তানদের নামে। যেমন- সান্তা আনা, স্যান ফেলিপ (১ম), স্যান ফেলিপ (২য়)। পরে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের ওপর ভিত্তি করে নামকরণ হতো। এরপর দেখা গেল সাধারণ মানুষের কাছে এসব নাম একটু বেশিই জটিল শোনাচ্ছে। ফলে তাত্ত্বিক নামকরণের স্থান থেকে সরে আসে সবাই।

মৌখিক যোগাযোগে সহজ নামকে প্রাধান্য দেয়ার প্রথা শুরু হয়। যেমন- ৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৭২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের ঝড়টি এখন মিয়ানমারের দিকে ধেয়ে আসছে বলার চেয়ে, ঘূর্ণিঝড় ‘হেলেন’ ধেয়ে আসছে বলা অনেক সহজ এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধিতে দ্রুত সহায়ক। ঝড়ের নাম বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষ রাখা হয়, যাতে সেটি ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা সামাজিকভাবে কোনো ধরনের বিতর্ক বা ক্ষোভ তৈরি না করে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ২০১৩ সালে একটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয়া হয়েছিল ‘মহাসেন’। নামটি প্রস্তাব করেছিল শ্রীলঙ্কা। সেখানকার সাবেক একজন রাজার নাম ছিল ‘মহাসেন’, যিনি শ্রীলঙ্কার মানুষের উন্নয়নে অনেক কাজ করেছিলেন। ফলে এ জনমনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এমনকি শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমে সেটিকে নামহীন ঝড় বলে বর্ণনা করা হয়। এই প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, শ্রীলঙ্কার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং পরে রেকর্ডপত্রে ঝড়টির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয় ‘ভিয়ারু’।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, যে মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়, তার অববাহিকায় থাকা দেশগুলো নামকরণ করে। পৃথিবীতে মোট ১১টি সংস্থা ঝড়ের নামকরণ করে থাকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ভারত এখন পর্যন্ত ৮টি ঝড়ের নামকরণ করেছে। এর মধ্যে মাত্র একটি হলো মেয়েদের নাম- বিজলি। অন্যদিকে, পাকিস্তানের ৮টি ঝড়ের নামকরণের মধ্যে ৭টিই মেয়েদের। তিতলি, নার্গিস, লায়লা ইত্যাদি। আর বাংলাদেশে ৭টির মধ্যে ৩টি মেয়েদের- চমলা, হেলেন ও নিশা।

২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের মেট অফিস ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড আবহাওয়া অফিস যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুসরণের সিদ্ধান্ত নেয়। সে বছর থেকেই ‘নেইম আওয়ার স্ট্রম’ ক্যাম্পেইনের প্রচারাভিযান শুরু করে। এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উপকূলীয় মানুষকে ঘূর্ণিঝড় নিয়ে আরো বেশি সচেতন করা।

যুক্তরাজ্যে আবহাওয়া অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মুখপাত্র সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোকে জানিয়েছিলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের নাম বেশ প্রভাব রাখতে সক্ষম। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের নজর কাড়তে বিশেষভাবে সক্ষম। অনেকেই আছেন যাদের কাছে ঘূর্ণিঝড়-সংক্রান্ত খবর পৌঁছানো বেশ কঠিন। কিন্তু এই পদ্ধতি খুবই কাজে দিচ্ছে।’

কয়েক বছর পর ২০১৯ সালে রয়্যাল নেদারল্যান্ডস মেটিওলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (কেএনএমআই) ও এই উদ্যোগে যোগ দেয়। এর মহাপরিচালক জেরার্ড ভ্যান ডার স্টিনহোভেন বলেন, যেহেতু ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না তাই এ ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর সাধারণ নাম অনেক বেশি অর্থবহ।

নয়া শতাব্দী/এস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ