ঢাকা, শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

স্টোলেন জেনারেশন বর্ণবাদের শিকার

প্রকাশনার সময়: ০৯ মে ২০২২, ১৪:২১

পৃথিবীর অনেকের কাছেই স্বপ্নের দেশ অস্ট্রেলিয়া। তাংসমানিয়ান সাগরের তীরবর্তী এ দেশটিতে বিশ্বের বহু দেশ থেকেই শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান। কারণ, অস্ট্রেলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমাগতভাবে বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ভালো করছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যদি বিবেচনা করা হয়, তাহলে অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত দেশগুলোর একটি। দেশটিতে প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটকের আগমন ঘটে।

খেলাধুলাতেও আছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। গ্রীষ্মে দেশটিতে এত গরম অনুভূত হয় যে, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। চারপাশে সমুদ্র থাকায় দেশটিতে এত বেশি সমুদ্রসৈকত রয়েছে যে, প্রতিদিন একটি করে সমুদ্রসৈকত ভ্রমণ করলেও কয়েক বছর লেগে যাবে! বর্তমানে সবদিক থেকে এগিয়ে যাওয়া একটি উন্নত দেশ অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু আজকের অস্ট্রেলিয়ার চরম উৎকর্ষতা দিয়ে যদি দেশটির অতীত বিবেচনা করা হয়, তাহলে মস্ত বড় ভুল হবে। গত শতাব্দীর একটা বড় সময়জুড়ে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রদেশের প্রশাসকরা এমন বর্ণবাদী আইন প্রণয়ন করেছিলেন যে, সেগুলো সম্পর্কে জানলে চোখ কপালে উঠে যায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন বর্ণবাদী নীতি গ্রহণ করার পরও তৎকালীন অস্ট্রেলিয়াকে ‘সভ্য’ বলা যাবে কিনা, এটি বড় প্রশ্ন হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া আয়তনের দিক থেকে বেশ বড়। সাধারণত, বিশাল আয়তনের দেশগুলোতে শহর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে অসংখ্য আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বসবাস করে থাকে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও লোকাচার থাকে। আমরা শহরাঞ্চলে গতানুগতিক অবকাঠামোগ ও জীবনমানের উন্নয়ন দেখে থাকি। তবে আদিবাসী অঞ্চলগুলোতে এসব দেখা যায় না। শহরের অধিবাসীরা পুরো জীবন পার করে দেয় এই ‘উন্নয়ন’ এর জন্য, কীভাবে জীবনকে আরেকটু উন্নত করা যায়। এই চিন্তা সারাদিন তাদের মাথায় ঘুরপাক খায়। উল্টোদিকে, আদিবাসী ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সহজ-সরল মানুষ বছরের পর বছর ধরে একইভাবে জীবনযাপন করার পরও তাদের কোনো অভিযোগ নেই। তাদের যা আছে তাতেই তারা খুশি থাকে।

অস্ট্রেলিয়া যেহেতু আয়তনে অনেক বড়, তাই সেখানেও অসংখ্য আদিবাসী বসবাস করত, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পদ্ধতিতে জীবনযাপন করত। শহুরে নীতিনির্ধারকদের চোখে তাদের এই ‘অনুন্নত’ জীবন আর আর সহ্য হচ্ছিল না। তাই তারা এমন এক নীতি প্রণয়ন করে, যে নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসীদের সন্তানদের অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা, আদিবাসীদের বিলুপ্তের পথে নিয়ে যাওয়া।

অস্ট্রেলিয়ানসটুগেধার.ওআরজি এর তথ্য মতে, ১৯১০ থেকে ১৯৭০ সালের মাঝে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের জন্য এক অদ্ভুত আইনের প্রচলন করে দেশটির তৎকালীন সরকার, যার আওতায় আদিবাসীদের বাচ্চা হওয়ার পরপরই পরিবারের থেকে জোরপূর্বক কিংবা লুকিয়ে সরিয়ে ফেলা হতো এবং পাঠিয়ে দেয়া হতো কোনো ‘সাদা’ পরিবার, আশ্রম কিংবা এনজিওতে। এই আইনের আওতায় যে শিশুরা তাদের পরিবার থেকে আলাদা হয়ে পড়ে, তাদের পরবর্তী সময়ে নাম দেয়া হয় ‘স্টোলেন জেনারেশন’।

অস্ট্রেলিয়া বর্তমানে সুপরিচিত তার বিভিন্ন জাত, বর্ণ, সংস্কৃতির মানুষের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে। এমন একটি দেশেও রয়েছে বর্ণবাদের এক অন্ধকার অধ্যায়। উনিশ শতকে শুধু স্বতন্ত্র ‘সাদা’ অস্ট্রেলিয়ান সংস্কৃতি সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশটি কাজ করছিল। ইউরোপ থেকে আসা সাদাদের বংশধররা অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের হেয় করত; কারণ তাদের গায়ের রং কালো। তাদের সংস্কৃতি, শিক্ষা-দীক্ষা সবকিছু সাদাদের চেয়ে ভিন্ন। জোরপূর্বক সাদারা আদিবাসী মেয়েদের ধর্ষণ কিংবা মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করত। সাদা আর আদিবাসীর মিলিত সন্তানদের ডাকা হতো ‘হাফ কাস্ট’। পরে সরকার আদিবাসী এসব সন্তানকে সাদাদের অধিভুক্ত করার পরিকল্পনা করে একটি ‘অ্যাসিমিলেশন নীতি’ প্রণয়ন করে।

কম হোক বা বেশি, বিশ্বে প্রায় সব দেশেই বর্ণবাদের এমন ছোটখাটো ইতিহাস রয়েছে। তা হবেই না কেন? আজকের এই সময়ে দাঁড়িয়েও যেখানে মানুষজন সাদাকে প্রাধান্য দেয়। সেখানে উনিশ শতক বা তার আগে মানুষের মধ্যে এমন চিন্তাধারার প্রলেপ অবাস্তব কিছু নয়। ‘পলিসি অব অ্যাসিমিলেশন’ শুরু হয় ১৯১০ সালের দিকে এবং সেটি ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আদিবাসী সমাজে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সাংস্কৃতিক জ্ঞান, লোকাচার ইত্যাদি প্রবাহিত হতো। কিন্তু ‘অ্যাসিমিলেশন’ নীতির বাস্তবায়নে জ্ঞানের এই প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। অসংখ্য সংস্কৃতি ও লোকাচার বিলুপ্ত হয়। স্তব্ধ হয়ে সন্তান হারানোর হতাশা কাটাতে মাদকের আশ্রয় নেয় অনেক আদিবাসী।

এভাবে আদিবাসী সমাজে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যায়। ফলে আদিবাসী সমাজে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে; যা দেশটির উন্নয়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, স্টোলেন জেনারেশনের শিকার শিশুদের অনেকেই শারীরিক, মানসিক এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার হতো। এভাবেই আদিবাসী সমাজের বেশ কয়েকটা প্রজন্মের প্রায় সব শিশুকে শহরে ধরে নিয়ে এসে শ্বেতাঙ্গ সমাজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়া হয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ান মানবাধিকার সংস্থার একটি রিপোর্টে তুলে ধরা হয়, ১৯১০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে জন্মানো সব আদিবাসী শিশুর ১০ থেকে ৩৩ শতাংশকে পরিবার থেকে পৃথক করা হয়। এছাড়া ১৯৯৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স একটি সার্ভে ফুটে উঠে, প্রতি ১০ জনে একজন আদিবাসী বংশধর পঁচিশ বছর বা তার বেশি বয়সি ব্যক্তিকে শৈশবে তার পরিবার থেকে আলাদা করা হয়েছিল। এই প্রজন্মের শৈশব আসলেই চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার তৎকালীন সরকার। এরকম এক বর্ণবাদী নীতির প্রতিবাদ করার সামর্থ্যও ছিল না আদিবাসীদের। ২০০৭ সালে যখন কেভিন রুড ক্ষমতায় আসেন, তিনি এই ব্যাপারটি গুরুত্বের সঙ্গে নেন।

নয়া শতাব্দী/এস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ