ঢাকা | বৃহস্পতিবার ৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮, ২৫ জিলহজ ১৪৪২

যেখানে আকাশ ছুঁয়েছে ভূমি

প্রকৃতির নৈসর্গিক অপরূপা শরেপুরের ‘পানিহাটা-তারানি পাহাড়’

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশনার সময়: ০৮ মে ২০২১, ১৫:০৬ | আপডেট : ০৮ মে ২০২১, ১৫:১৯
শেরপুরে প্রকৃতির নৈসর্গিক শোভা মন্ডিত একটি এলাকা

বাংলার ভূ-স্বর্গ, প্রকৃতির অনুসর্গ ও পাহাড়ঘেরা দুর্গ এসব মিলে বাংলাদেশের অন্যতম বৈচিত্রময় একটি সিমান্তবর্তী জেলা শেরপুর। মহান প্রভু নিজ হাতে অঢেল ঐশ্বর্য দিয়ে সাজিয়েছেন এই লীলাভূমি। নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও বিচিত্র জনগোষ্ঠী মিলিয়ে এ যেন অপরূপ এক ভূখণ্ড। স¤প্রীতির এই শেরপুর বর্তমানে দেশী-বিদেশী সকল পর্যটকদের নয়নমণি। শেরপুরের প্রাথমিক ভ্রমণবিলাসের পাহাড়ী ¯’ান মধুটিলা ইকো পার্ক, লাউচাপড়া পাহাড়কিা বিনোদন কেন্দ্র, গজনী অবকাশ, লাল পাহাড়-গারো পাহাড়সহ প্রকৃতির নৈসর্গিক শোভা মন্ডিত পানিহাটা-তারানি পাহাড়।

জীবনের এক ঘেয়ামী আর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মনকে প্রফুল্ল করতে চলে আসতে পারেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের ওই পানিহাটা-তারানি পাহাড়ি এলাকায়। এখানকার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুড়া জেলার সীমান্তঘেঁষা ঘন সবুজ শ্যামল বন, খরস্রোতা পাহাড়ী ভোগাই নদীর পাহাড়ের সাথে মিতালী আর বৃক্ষরাজি দেখে ভ্রমণ পিয়াসীদের মন উদ্বেলিত হয়। তারা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে যান শহরের জীবনের কর্মক্লান্তি। প্রকৃতির নিখুঁত ভালবাসায় হারিয়ে যান তারা স্বপ্নের রাজ্যে। ওই স্থানটি ভারত সীমানাঘেষা হওয়ায় চিরসবুজ বাংলা মায়ের অপরুপ দৃশ্য দেখার পাশাপাশি ভারতের সবুজ বনানী দর্শনার্থীদের অনেক বেশি মনের তৃপ্তি মেটায়। পানিহাটা পাদ্রি মিশনের পশ্চিম পাশে উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে তাকালে চোখে পড়ে নীলাভ-চিরসবুজ ভারতের পাহাড়ী তুড়া জেলাকে। আবছা আবরণের চাঁদরে জড়িয়ে নিয়েছে কুয়াশার মতো মেঘ কখনো বা কুয়াশা নিজেই। এর আড়ালে দূরের টিলাগুলো কেবলই লুকোচুরি খেলে যায়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ছোট ছোট পাহাড় গুলোকে ফাঁকি দিয়ে তুড়ার অববাহিকা থেকে সামনে সোজা এসে পশ্চিমে চলে গেছে পাহাড়ি খরস্রোতা নদী ভোগাই। একপাশে তার কাশবন আর অপরপাশে শত ফুট উঁচু দাঁড়িয়ে থাকা সবুজে জড়ানো পাহাড় ও নদী। নদীর টলটলে স্বচ্ছ পানির নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে নুড়ি পাথরগুলো। সামনের একশ গজ দূরে উত্তরে ভারত অংশে পিঁচঢালা আকাবাঁকা রাস্তা পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাহাড়ের বুকচিরে চলে গেছে। আর মাঝেমধ্যেই হুসহাস করে ছুটে চলছে মালবাহী ট্রাকগুলো। চতূর্দিকে ছোট ছোট অসংখ্য পাহাড়ের সাড়ি সাড়ি পাহাড়।

পূর্ব দিকের কয়েকটি পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভোগাই নদীতে এসে মিশেছে ছোট একটি পাহাড়ি ঝর্ণা। তার পাশেই খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের উপাসনালয় পানিহাটা পাদ্রি মিশন। এখানে আছে ছোট একটি চিকিৎসা কেন্দ্র, বিদ্যালয় আর ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হোস্টেল। সেখানে শিশু-কিশোরদের কোলাহল। এসব মিলে প্রকৃতি প্রেমীদের প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে অপরূপা ‘পানিহাটা-তারানি পাহাড়’। অবশ্য এলাকার জনগণ এই পাহাড়টিকে পানিহাটা নামেই জানেন। কিন্ত এই সৌন্দর্য্যের ভাগটা শুধু পানিহাটাই নিতে পারেনি। এর একটা অংশে ভাগ বসিয়েছে পাশের তারানি গ্রামের পাহাড়ও। তাই দর্শণার্থীদের জন্য পানিহাটা-তারানি দুটো মিলেই গড়ে উঠতে পারে পর্যটন স্পট। সবুজ চাঁদরেঘেরা গারো পাহাড়ে প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে চলে যান প্রকৃতির রাজ্যে। যারা শুনেছেন শেরপুরের বন্য হাতির তাণ্ডব তারা মিশনের পুর্বপাশে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠি জাতি তথা পেকামারি গারো অধিবাসীদের কাছ থেকে শুনতে পারবেন বন্যহাতির ধ্বংসলীলার কথা। মার্তৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধিনে পরিচালিত গারোদের পরিবারের প্রধান নারীরা। তাদের সহজ-সরল জীবন যেন ভ্রমন পিয়াসীদের অবাক করে দেয়। তাদের জীবন সংগ্রাম কাছে থেকে দেখার ও শুনার সুযোগ পাবেন ওই গ্রামে। দারিদ্র আর বন্যহাতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা ওইসব গারো আদিবসীদের অকৃত্রিম আতিথিয়েথা দেখে মুগ্ধ হন ভ্রমণ পিয়াসীরা। বর্তমান কৃত্রিমতার যুগে প্রকৃতির নির্মিত সবুজ বনানী দেখে অনাবিল আনন্দে দিনের আলোতেই ভ্রমন পিয়াসীরা ফিরে যান তাদের নিজ গৃহে।

কিভাবে যাবেন:

শরেপুর জেলা শহর থেে

ক প্রায় ৩০ কি:মি: সোজা উত্তর দিকে নিজস্ব পরিবহন বা সিএসজি যোগে যাত্রা শুরু করে সরাসরি চলে আসুন নাকুগাও স্থলবন্দর এলাকায়। তার পাশেই সদ্য নির্মিত ভোগাই নদীর ব্রীজের উপর দিয়ে পুর্ব দিকে প্রায় ২-৩ কি:মি: যাওয়ার পর ঘন সবুজ পাহাড় মাড়িয়ে উত্তর দিকে পানিহাটা-তাড়ানি পাহাড়ে ঢুকে পড়ুন। বিনা টিকিটে উপভোগ করুন প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্য। যদি নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর থেকে আসতে চান তাহলে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দূরে রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে অবস্থিত ওই স্থানটি। শহরের গড়কান্দা চৌরাস্তা মোড় থেকে সোজা উত্তরে প্রথমে নাকুগাও পরে পূর্ব দিকটায় মোড় নিয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত ভোগাই ব্রিজ পাড়ি দিতে হবে। এরপর সোজা পূর্ব দিকে প্রায় আড়াই থেকে ৩ কিলোমিটার গেলে চায়না মোড়। ওই মোড়ে এসেই আবারও গতিপথ বদলিয়ে যেতে হবে সোজা উত্তরে। উত্তরের ওই রাস্তা ধরে প্রায় ১ কিলোমিটার গেলেই পানিহাটা-তারানির সবুজ শ্যামলীময় পাহাড়। সেখান থেকে ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পাবেন সবুজের সমারোহ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে রিকশা, সিএনজি অটোরিশা বা ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলেও যাওয়া যায় জেলা শহর থেকে ২০০-২৫০ টাকা আর নালিতাবাড়ী শহর থেকে মাত্র ৩৫-৪৫ মিনিটের ব্যবধানে। অসংখ্য নান্দনিক পাহাড়, বিস্তীর্ণ হ্রদ আর দুর্গম পাহাড়ী জনপদের ওই লীলাভূমিতে বন্ধুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে কবি বলেন-

‘এসো বন্ধু দেখে যাও সেই স্বর্গ তুমি, যেখানে পাহাড় ছুঁয়েছে আকাশ এখানে’।

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এই পাতার আরও খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x