ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

পৃথিবীর সব পানি বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়লে কী হবে? 

প্রকাশনার সময়: ১৪ জানুয়ারি ২০২২, ২১:৩১

পানি- জীবনের অপর নাম। আমাদের মহাসমুদ্রের বুকেই আদিপ্রাণের সৃষ্টি বলে অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করেন। পৃথিবী ধন্য এই জলরাশির আশীর্বাদে, যা এই গ্রহকে প্রাণবৈচিত্র্যে ভরিয়ে তুলেছে।

বিপুল জলভাগের কারণে পৃথিবীকে 'নীল গ্রহ'ও বলা ভয়। আমাদের সৌরজগত বা তার বহু দূরে অবস্থিত কোনো গ্রহ-উপগ্রহে সন্ধানে মেলেনি তরল পানির এমন বিপুল সমাহার।

মার্কিন সরকারের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের (ইউএসজিএস) তথ্যানুসারে, পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ পানিতে নিমজ্জিত, আর মোট জলরাশির ৯৬.৫ শতাংশই পাওয়া যায় মহাসমুদ্রের বুকে।

পানি শুধু ভূপৃষ্ঠেই নয়, জলচক্রের কারণে বাস্পীভূত হয়ে আমাদের বায়ুমণ্ডলেও উঠে আসে। তাই যেকোনো সময়ে আমাদের বায়ুমণ্ডলে ঠিক কতটুকু পানি সাধারণত থাকে- সে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। তার চেয়েও মজার প্রশ্ন হবে- মেঘরুপে সব বাষ্পীভূত পানি যদি একসঙ্গে বৃষ্টির ধারা হয়ে নামে তারই বা কী পরিণতি হবে?

বিজ্ঞানের সাধারণ জ্ঞান অনুসারে, লক্ষ লক্ষ কোটি লিটার পানি বাষ্প হয়ে আমাদের বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়ায়। এত বিপুল পানি একসাথে বৃষ্টি বা তুষারপাতে ঝড়ে পড়লে তা নিশ্চিতভাবেই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকায় বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করবে।

ইউএসজিএস এর তথ্যমতে, পৃথিবীর সমস্ত পানির পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি কিউবিক কিলোমিটার। ব্যাখ্যা করে বলা যায়, এক কিউবিক মাইল পানি ১ লাখ ১০ হাজার গ্যালনের সমান, যা দিয়ে ১৬ লাখ ৬০ হাজার অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুল ভরানো সম্ভব।

জলচক্রের কারণেই পৃথিবীতে পানি কখনও এক জায়গায় দীর্ঘসময় স্থির থাকে না। বরং তা সুর্যালোকে জলীয়বাষ্প হয়ে মেঘ সৃষ্টি করে। আবার সেই মেঘই মিঠাপানির ধারা হয়ে নামে ভূপৃষ্ঠে। এভাবে এই চক্রটি চলতেই থাকে।

জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলে কমবেশি প্রায় ১০ দিন থাকে বলে জানা যায় তথ্যকোষ-ব্রিটানিকার তথ্যসূত্রে। তার মানে, আমাদের বায়ুমণ্ডলে রয়েছে বাষ্পের প্রাচুর্য।

কানাডার ম্যাগগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও জে স্টুয়ার্ট রেডার অবজারভেটরির পরিচালক ফেড্রেরিক ফ্যাব্রি বলেন, ‘পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বৃষ্টিরূপে ঝড়ে পড়ার জন্য বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ বাষ্পের মজুদ আছে, তা ৩০ মিলিমিটার বা দেড় ইঞ্চি সমান বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারবে।’

আরও ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘গড় হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবর্গ মিটারের ভূপৃষ্ঠের উপরের বায়ুমণ্ডলে ৫৫ কেজি ওজনের পানি বাষ্পাকারে ভেসে বেড়ায়।’

পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের আয়তন ১৯ কোটি ৭০ লাখ বর্গমাইল বা ৫১ কোটি বর্গকিলোমিটার, সে হিসাবে আমাদের মাথার উপর ভেসে বেড়াচ্ছে ৩৭.৫ মিলিয়ন-বিলিয়ন গ্যালন পানি। ফ্যাব্রি জানান, সব মেঘ একসাথে বৃষ্টিধারায় নামলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দেড় ইঞ্চি বেড়ে যাবে।

আশার কথা হলো- সব মেঘ একসাথে বৃষ্টি হয়ে নামার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম, তবে যদি দুর্ভাগ্যক্রমে তেমনটাই হয়- তাহলে সমস্ত মানবজাতিকে ভয়াল পরিণতির শিকার হতে হবে।

ক্লাইমেট চেঞ্জ পোস্ট নামক একটি সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা কেবল ২ ইঞ্চি বাড়লে মুম্বাই, কোচি, আবিদজান ও জাকার্তার মতো নিচু মহানগরীগুলো প্লাবিত হবে। এসব শহরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটির বেশি, যাদের জীবন হবে বিপর্যস্ত।

২০১৭ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২ থেকে ৪ ইঞ্চি বাড়লে, বিশ্বের উপকূলীয় অনেক অঞ্চলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও জলাবদ্ধতার ঘটনা দ্বিগুণ হবে।

তাছাড়া, সব পানি বৃষ্টিধারায় ঝরলেও তা বিশ্বের সব এলাকায় সমানভাবে পড়বে না। ফলে বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চল হবে অন্যদের চেয়ে বেশি আদ্র।

ফ্যাব্রি বলেন, ‘বায়ুমণ্ডলে কী পরিমাণ বাষ্প যোগ হচ্ছে ও কী পরিমাণ প্রতিনিয়ত বৃষ্টিতে ঝরে পড়ছে তার ওপরই এতে থাকা পানির ভারসাম্য নির্ভর করে। যেমন বায়ুমণ্ডলে সরবরাহের যোগান দেয় ভূপৃষ্ঠের পানির বাষ্পীভবন, কিন্তু তা আবার নির্ভর করে কোনো নির্দিষ্ট ভূপৃষ্ঠের এলাকায় কী পরিমাণ পানি রয়েছে এবং সেখানকার তাপমাত্রা। কারণ পানিকে বাষ্পে পরিণত করতে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন, তাই সুর্যালোকের সাথে সাথে ভৌগলিক অবস্থান ভেদে ভূপৃষ্ঠের উত্তাপও প্রয়োজনীয়। উষ্ণ মহাসাগরে সবচেয়ে বেশি বাষ্পীভবন হয়, আর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মতো শীতল এলাকায় তার পরিমাণ সবচেয়ে কম।’

এভাবেই বাষ্পীভবনের পরিমাণ ঋতু ও অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। কিন্তু, ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্র ও আদ্র বনভূমিতে সবচেয়ে বেশি জলীয়বাষ্প কণা তৈরি হয়। আবার উষ্ণ হাওয়াও পানিকে বায়ুমণ্ডলে উঠিয়ে নেওয়ার সব সেরা মাধ্যম।

এছাড়া, ভূপ্রকৃতির গড়ন, উচ্চতা-বিচ্যুতি বা অসমতার কারণেও বায়ুপ্রবাহ কত দ্রুত উপরের বায়ুমণ্ডলের দিকে উঠতে পারে তা নির্ভর করে। অনেক সময় পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে বাষ্পে ভরা বাতাস আগেই ঠাণ্ডা হতে থাকে ও বৃষ্টি হয়ে ঝরে। একারণে পাহাড়ি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বেশি হয়।

আগামী দশকগুলোয় বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে জলবায়ু পরিবর্তন। ফ্যাব্রি বলেন, ‘বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ভূপৃষ্ঠ থেকে বাষ্পীভবনও বাড়বে। সেকারণেই বায়ুমণ্ডলে পানির উপস্থিতিও বাড়তে চলেছে। বাতাসে পানির কণা বেশি হলে, তাপমাত্রাও বেশি শোষিত হবে যা বিশ্বকে চক্রবৃদ্ধি হারে উষ্ণ করতেই থাকবে।’ সূত্র: লাইভ সায়েন্স

নয়া শতাব্দী/এস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়