ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

প্রথম যিনি সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেছিলেন

প্রকাশনার সময়: ১২ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:০৭

ইতিহাসে প্রথম সফলভাবে আকাশে ডানা মেলেছিলেন আব্বাস ইবনে ফিরনাস। তিনি ৯ম শতাব্দীতে উমাইয়া খেলাফতের সময় স্পেনের আন্দালুসিয়ার একজন পলিম্যাথ বা বহুশাস্ত্র বিশারদ ছিলেন। তার উড্ডয়ন প্রচেষ্টা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ফিলিপ কে. হিট্টি তার হিস্ট্রি অব আরব গ্রন্থে বলেন, ‘ইবনে ফিরনাসই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বিজ্ঞানসম্মতভাবে আকাশে ওড়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।’

একজন ইবনে ফিরনাস

আব্বাস ইবনে ফিরনাসের জন্ম ৮১০ সালে। ইন্তেকাল করেছেন ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে। তার আসল নাম আব্বাস আবু আলকাসিম ইবনে ফিরনাস ইবনে ইরদাস আল তাকুরিনি। আন্দালুসের ইযন-রেন্ড ওন্ডায় (বর্তমান স্পেনের রন্ডা) তার জন্মস্থান। বসবাস করতেন কর্ডোভায়। তিনি ছিলেন বার্বার বংশোদ্ভূত আন্দালুসিয় মুসলিম পলিমেথ বা বহুশাস্ত্রবিশারদ। উড্ডয়নের প্রচেষ্টার জন্য তিনি সমধিক পরিচিত।

ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা

বেশ কিছু সূত্রে ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টা বর্ণিত হলেও তার উড্ডয়ন প্রচেষ্টার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক আল মাকারির লেখায়। তবে আল মাকারি ইবনে ফিরনাসের সমসাময়িক ছিলেন না। তিনি ফিরনাসের বিষয়ে লেখেন প্রায় ৭৫০ বছর পর। তবে ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রচেষ্টার সফলতার বিষয়ে প্রায় সব ঐতিহাসিকই একমত। ইবনে ফিরনাসের উড্ডয়ন প্রসঙ্গে মন্তব্য পাওয়া যায় সমসাময়িক কর্ডোবার আমির প্রথম মুহাম্মদের রাজকবি মুমিন ইবনে সাইদের কবিতায়। তিনি লেখেন, ‘শকুনের পালক দ্বারা আবৃত হলে তিনি ফিনিক্সের চেয়েও দ্রুত ওড়েন।’

ইবনে ফিরনাস তার উদ্ভাবিত উড্ডয়ন যন্ত্রে পালক ও সিল্কের ব্যবহার করেছিলেন। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে তিনি স্পেনের কর্ডোবার নিকটবর্তী রুসাফা এলাকার আরুস পর্বত থেকে তার উদ্ভাবিত উড্ডয়নযন্ত্র-সহকারে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

কর্ডোবা থেকে অনেক মানুষ তার আকাশে ওড়া দেখার জন্য ভীড় জমিয়েছিলেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এখান থেকে ওড়ার পর যদি সব ঠিক থাকে তবে আমি এখানেই আবার ফিরে আসব। তার উড্ডয়নযন্ত্র সফলভাবেই কাজ করে এবং প্রায় দশ মিনিট তিনি তার যন্ত্রের সাহায্যে উড়তে সমর্থ হন। কিন্তু সফলভাবে উড়লেও তিনি একটু ভুল করেছিলেন। সে প্রসঙ্গে আল মাকারি উল্লেখ করেন, ‘তিনি তার শরীরকে পালক দ্বারা আবৃত করেন এবং তার শরীরে কয়েকটি পাখা যোগ করেন। তারপর শূন্যে ভেসে পড়েন। যারা তার এই উড্ডয়ন প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের লিখনীতে পাওয়া যায়, তিনি পাখার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দূরত্ব অতিক্রম করেন এবং যেখান থেকে উড্ডয়ন শুরু করেছিলেন আবার সেখানে ফিরে আসেন। কিন্তু সফলভাবে অবতরণ করতে ব্যর্থ হন। এসময় তিনি গুরুতর আহত হন।’

ইবনে ফিরনাস প্রাণে বেঁচে গেলেও পিঠে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। তার বয়স তখন পঁয়ষট্টি বছর। এরপর তিনি তার উড্ডয়নযন্ত্রে ঠিক কী ভুল ছিল তা শনাক্তকরণে মনোনিবেশ করেন। তিনি উপলদ্ধি করেন, পাখি অবতরণের সময় লেজ এবং ডানাগুলোর সমন্বিতভাবে কার্যক্রমের মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু তিনি তার যন্ত্রে গতি কমানোর জন্য সেরকম কোনো লেজ বা বিকল্প পদ্ধতি রাখেননি।

অসুস্থতা নিয়ে তিনি প্রায় ১২ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তার পক্ষে আর আকাশে ওড়া সম্ভব হয়নি। কারণ তিনি আর আগের মতো সুস্থতা লাভ করেননি। ৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে ইবনে ফিরনাস ইন্তেকাল করেন।

ইবনে ফিরনাস মানুষের উড্ডয়নের ইতিহাসে কিংবা আকাশে ওড়ার পেছনে মানুষের যে প্রচেষ্টা তার একজন সফল স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তার প্রচেষ্টাকে বলা যায়, আধুনিক উড়োজাহাজ আবিষ্কারের প্রথম ধাপ। মানুষকে ডানা মেলে ওড়ার স্বপ্নের জনক।

আজও ইবনে ফিরনাস

আকাশে ওড়ার এই স্বপ্নদ্রষ্টাকে স্মরণীয় করে রাখতে চাঁদের একটি জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। ২০১৩ সালে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোলস রয়েস ইবনে ফিরনাসের নামে তাদের একটি গাড়ির সংস্করণ বের করে যার নাম দেয় ‘ইবনে ফিরনাস মোটিফ’। স্পেনের কর্ডোবায় ইবনে ফিরনাস সেতু, বাগদাদে ইবনে ফিরনাসের ভাস্কর্য, দুবাইয়ের ইবনে বতুতা মলে ফিরনাসের রেপ্লিকা ইত্যাদি চোখে পড়ার মতো ব্যাপার। তিনি বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে, তার যুগের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ হিসেবে।

তার আরো কাজ

ইবনে ফিরনাম কবি ছিলেন। কিন্তু প্রথম আকাশে ওড়ার কৃতিত্বে তিনি সমাধিক পরিচিত। পি. কে. হিট্টি তার হিস্ট্রি অব আরব গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আবু আল কাসিম জাহরাবীর পর স্পেনে প্রাচ্য সংগীত জনপ্রিয় করার পেছনে ইবনে ফিরনাসের অনবদ্য ভূমিকা ছিল। তার উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাথর থেকে গ্লাস তৈরি। তিনি একটি সৌরমডেলও তৈরি করেছিলেন, যেখানে নক্ষত্র, মেঘ, এমনকি বজ্রপাতের অবস্থাও দেখানো হয়েছিল।’

তিনি আল মাকাতা নামক জলঘড়ির উদ্ভাবন করেছিলেন। প্ল্যানিস্ফিয়ার নামক যন্ত্র ও পাঠের উপযোগী লেন্সও প্রস্তুত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তার বাসস্থানের একটি কক্ষে তিনি গ্রহ-নক্ষত্রের এমন একটি মডেল তৈরি করেছিলেন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘূর্ণায়মান ছিল।

তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, পাথরের স্ফটিককে কাটার প্রক্রিয়া। স্পেনে এটি তখন সম্ভব হতো না বিধায় স্পেন এ বিষয়ে মিসরের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ইবনে ফিরনাসের এই উদ্ভাবনের ফলে স্পেন এই নির্ভরশীলতা থেকে রেহাই পায়।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়