ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জানুয়ারি ২০২২, ৭ মাঘ ১৪২৮, ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩
এ পি জে আবদুল কালাম

পত্রিকার হকার থেকে রাষ্ট্রপতি

প্রকাশনার সময়: ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১১:২৮ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৩১

রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার আগে তারা ছিলেন অন্য পেশায়। রোজগারও ছিল সামান্য। কেউ ছিলেন বাদাম বিক্রেতা, কেউবা করেছেন পোস্টমাস্টারের কাজ, ছিলেন প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষক ও খেলোয়াড়সহ বিভিন্ন পেশায়। সাধারণ মানুষ থেকে রাষ্ট্রপ্রধানদের প্রতিবেদনের আজ সপ্তম পর্বে পড়ুন পত্রিকা বিক্রেতা থেকে ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি এ. পি. জে. আবদুল কালামের ইতিহাস।

‘মিসাইল ম্যান’খ্যাত আবুল ফকির জয়নুলাবেদীন আবদুল কালাম ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের গ্রামে দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জয়নুল আবেদিন ছিলেন একজন মাঝি এবং মা অশিয়াম্মা ছিলেন গৃহবধূ। রামেশ্বরম ও ধনুস্কোডির মধ্যে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের নৌকায় পারাপার করাতেন তার বাবা। নৌকা চালানোর সামান্য আয় দিয়েই চলত পাঁচ ভাই-বোনসহ পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণ। ছোট বেলা থেকেই পরিবারের ছোট সন্তান আবদুল কালাম পরিবারকে সহযোগিতার জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি কাজও করতেন। আবদুল কালামের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, ১৯৪১ সালে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আবদুল কালাম স্কুলে পড়তেন। প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে অংক করতে যেতেন শিক্ষকের কাছে। সেই শিক্ষক প্রতি বছর মাত্র পাঁচ শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে অংক শেখাতেন। তার মধ্যে তিনিও ছিলেন। অংক করা শেষে ভোর সাড়ে ৫টায় যখন বাসায় ফিরতেন তখন তার বাবা তাকে নামাজ ও কোরআন পড়তে নিয়ে যেতেন। এরপরেই দৌড়ে তিন কিলোমিটার দূরের রামেশ্বরম রেলস্টেশনে যেতেন পত্রিকা আনতে। সে সময় যুদ্ধের কারণে স্টেশনে ট্রেন থামত না, তাই চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলা সেই পত্রিকা তিনি শহরে বিলি করতেন।

তথ্যমতে, স্কুলজীবনে সাধারণ মানের ছাত্র ছিলেন আবদুল কালাম। তবে তিনি বুদ্ধিদীপ্ত ও কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন। তার শিক্ষাগ্রহণের তীব্র বাসনা ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন। রামনাথপুরম স্কোয়ার্টজ ম্যাট্রিকুলেশন স্কুল থেকে শিক্ষা সম্পূর্ণের পর কালাম তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে সেই কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন। স্নাতকের শেষের দিকে পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে চার বছর এ বিষয়ে পড়াশোনা করে সময় নষ্টের জন্য আক্ষেপ করতেন। ১৯৫৫ সালে তিনি মাদ্রাজে (অধুনা চেন্নাই) চলে আসেন। সেখানে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেন।

গ্র্যাজুয়েট শেষের পর তার সামনে দুটি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ আসে। একটি বিমানবাহিনীতে এবং আরেকটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডিরেক্টরেট অব টেকনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্রোডাকশন-ডিটিডি অ্যান্ড পি (এয়ার)। তবে আবদুল কালামের স্বপ্ন ছিল মিলিটারি বেজের একজন ফাইটার পাইলট হওয়ার। তাই তিনি প্রথমে ডিটিডিপির ইন্টারভিউ দিয়ে যান দেরাদুন বিমানবাহিনীর ইন্টারভিউ দিতে। সেখানে গিয়ে দেখলেন ইন্টারভিউতে বিমানবাহিনীতে শিক্ষা এবং দক্ষতার পাশাপাশি শারীরিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেয়। তিনি ছিলেন অনেকটা হ্যাংলা-পাতলা। ফলে ২৫ প্রতিযোগীর মধ্যে তিনি নবম হয়ে বাদ পড়েন। কেননা ওই সময়ে আটজন পাইলটকে নিয়োগ দেয়া হয়। সেখানে নিয়োগ না পেয়ে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে দিল্লি ফিরে এসে আবদুল কালাম ডিটিডিপির ফলাফল জানতে যান। জবাবে হাতে পান অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। বিমানবাহিনীতে প্রবেশ করতে না পারার সমস্ত ক্ষোভ দূর করে তিনি এখানে সিনিয়র সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন।

তার ক্যারিয়ার জীবন শুরু হয় ভারতীয় আর্মির জন্য ছোট একটি হেলিকপ্টার বানানোর মধ্য দিয়ে। ডিটিডিপিতে বছর তিনেক কর্মজীবন শেষে এ.ডি.ই এরোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট ইস্টাবলিশমেন্ট প্রতিষ্ঠিত হলে আবদুল কালামকে সেখানে নিয়ে আসা হয়। এরই মধ্যে পরিকল্পনা নেয়া হয় ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তির সাহায্যে হোভারক্রাফট তৈরির। কিন্তু বাদ সাধে নির্মাণ সামগ্রীর অপ্রতুলতা। হোভারক্রাফট এমন একটি বাহন যা মাটি, পানি এবং বরফের ওপর অনায়াসে চলতে পারে। তখনকার যুগে এশিয়া মহাদেশে এই ধরনের বাহন তৈরির সিদ্ধান্ত পুরোটাই দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তের শামিল। হোভারক্রাফট নির্মাণের নকশা এবং এ বাহন তৈরির পরিকল্পনার নকশা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা দলটির ভার দেয়া হয় আবদুল কালামের ওপর। তবে এখানে এসে অন্যরকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন তিনি। দেখা যায়, হোভারক্রাফট নির্মাণের প্রযুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা আবদুল কালামের দলটির নেই।

হোভারক্রাফট তো পরের কথা বরং একটি অন্য মেশিনকে সম্পূর্ণরূপ কাঠামোতে দাঁড় করানোর পূর্ব অভিজ্ঞতাও কারো নেই। এছাড়া এ বাহন নির্মাণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। তবে দমে যাওয়ার পাত্র নন তিনি বরং যা আছে তা নিয়েই নেমে পড়লেন। শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও আড়াই বছরের মধ্যে ৪০ মিলিমিটারের ৫৫০ কিলোগ্রাম ওজনের ‘নন্দী’ নামে হোভারক্রাফট বানিয়ে ফেলে আবদুল কালামের দল। সামরিক খাতে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হোভারক্রাফটি নির্মাণ করা হয়েছিল তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভি.কে. কৃষ্ণ মেননের নির্দেশে। তবে দুর্ভাগ্যই যে তিনি মন্ত্রিত্ব হারানোর পর প্রকল্পটি সম্ভাব্যতা হারায়। হোভারক্রাফট প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার পরেও আবদুল কালাম নিজেকে এতটা ভেঙে পড়তে দেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন পরিশ্রমের ফল একদিন পাবেন। বেশ কয়েকদিন পর হঠাৎ জানানো হয় আবদুল কালামের ল্যাব পরিদর্শনে আসছেন কোন এক উঁচু পদের ব্যক্তি যার উপস্থিতিতে হোভারক্রাফটের পরীক্ষামূলক চালানোর ব্যবস্থা করা হবে। উঁচু পদের ব্যক্তি পরিদর্শক আসলেন, হোভারক্রাফটে চড়ে বেড়ালেন এবং আবদুল কালামকে নানা প্রশ্ন করলেন। তিনিও সবকিছু খুলে বললেন। পরিদর্শক চলে গেলে তিনি জানতে পারলেন তিনি ছিলেন টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (টিআইএফআর) প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর এম জি কে মেনন। বিস্ময় এখানেই শেষ হয়নি বরং আরো বাড়ে যখন এক সপ্তাহ পরে আবদুল কালামের ডাক পড়ে টিআইএফআরের বিজ্ঞানীদের নিয়ে নির্মিত প্রতিষ্ঠান ‘ইনকোসপার’ থেকে। তাকে ডাকা হয়েছিল রকেট ইঞ্জিনিয়ারিং পদের চাকরির জন্যে ইন্টারভিউ দিতে। ইন্টারভিউ দেয়ার পরের দিনই জানতে পারেন তার চাকরি হয়েছে। তখনকার যুগে এ চাকরি ছিল স্বপ্নের মতো। তিনি এখানে ডক্টর ভিক্রাম সারাভাইয়ের অধীনে কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৬০ সালে তিনি ডিআরডিওতে প্রধান বিজ্ঞানী হিসেবে যোগদান করেন। তবে এ কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। তারপর ১৯৬৯, ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনে (আইএসআরও) স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। তার অধীনে বেশকিছু প্রকল্প সাফল্যের মুখ দেখে। এরইপ্রেক্ষিতে ’৭০-এর দশকে প্রোজেক্ট ডেভিল এবং ভ্যালিয়ান্ট নামে দুটি প্রকল্প হাতে নেন তিনি। ভারত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে নিজেদের সক্ষমতার পরিচয় পায় আবদুল কালামের এ প্রোজেক্টের মাধ্যমে। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি। দুটি প্রোজেক্টের সফল উৎক্ষেপণের পরে এসএলভি প্রকল্পের মাধ্যমেও সফলতা বয়ে আনেন তিনি। এসএলভি রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপিত হয় রোহিনি-১ নামের মিসাইল। এ উৎক্ষেপণ ভারতকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি এনে দেয়।

১৯৯১ সালের ১৫ অক্টোবর ৬০ বছর বয়সে চাকরি থেকে অবসরে যান আবদুল কালাম। এরপর শিক্ষকতা পেশা ও লেখালেখিতে মনোযোগ দেন। সারাজীবনে বিভিন্ন বিষয়ে ৩৪টি বই লিখেছেন। ভারতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং তার প্রতি জনগণের সম্মানকে লক্ষ্য করে ২০০২ সালে তৎকালীন এন.ডি.এ সরকার তাকে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা দেন। ফলস্বরূপ, ওই বছরের ২৫ জুলাই থেকে ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পূর্ণের পর ভারতবর্ষ চষে বেড়িয়েছেন শিশু-কিশোর তরুণ শিক্ষার্থীদের পেছনে, স্বপ্ন দেখিয়েছেন বারে বারে। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন চিরকালীন অনুপ্রেরণার সঙ্গী। এমনকি শিক্ষার আলো চড়াতে চড়াতেই ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এ রাষ্ট্রপতি। সেদিন ভারতের মেঘালয়ের শিলং শহরে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট নামক প্রতিষ্ঠানে বসবাসযোগ্য পৃথিবী বিষয়ে বক্তব্যকালে হূদরোগে আক্রান্ত হন। সেখান থেকে তাকে বেথানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে মারা যান। ১৯৮১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ৪৮টি ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। এমনকি দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে নিজে বিয়ে পর্যন্ত করেননি। তার মতে, বিয়ে করলে তিনি যা করতে পেরেছেন তা সম্ভব হতো না। এ পি জে আবদুল কালাম নিজে যেমন স্বপ্ন দেখেছেন আজীবন, স্বপ্নের পিছু ছুটেছেন ঠিক তেমনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রজন্মকে। বলতেন, ‘স্বপ্ন, স্বপ্ন, স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। স্বপ্ন না দেখলে কাজ করা যায় না। তবে স্বপ্ন সেটা নয়, যেটা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। স্বপ্ন সেটা যেটা তোমায় ঘুমোতে দেয় না।’

নয়া শতাব্দী/এস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়