ঢাকা | শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

তিন কন্যার সমুদ্র দর্শন

মুহাম্মদ জভেদ হাকিম
প্রকাশনার সময়: ১০ অক্টোবর ২০২১, ০৯:৪৯

১১ অক্টোবর বিশ্ব কন্যা দিবস। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে কোনো দিবসের তেমন আবেদন নেই। প্রতিটা দিনই আমার কাছে উপভোগ্য। কিন্তু যারা যাপিতজীবনের কষাঘাতে পরিবার ছেড়ে দূরে থাকেন, আদরের সন্তানদের তেমন সময় দেয়া হয় না- তাদের জন্য নির্দিষ্ট দিবসগুলো বেশ কাঙ্খিত। মূলত আজকের ভ্রমণ গল্প তাদের জন্য।

উড়োজাহাজে চড়ে ছুটলাম- তিন কন্যা কনিতা, রাবিতা, বাসিতা ও স্ত্রী কুলসুমকে নিয়ে ক্যাপ্টেন কক্স-এর দেশে। ঢাকা এয়ারপোর্ট হতে বেলা ১১টায় উড়োজাহাজ ছাড়ল। কন্যাদের এই প্রথম আকাশপথে ভ্রমণ। বলা যায়, কন্যা দিবসে ওদের জন্য সারপ্রাইজ। স্বাভাবিকভাবেই ওদের ভালোলাগাটাও আজ অন্যরকম। তিনকন্যার উচ্ছ্বাসের রেশ কাটতে না কাটতেই, ঠিক ১২টায় কক্সবাজার বিমানবন্দরে নামিয়ে দিলো। মুহুর্তে রাজার হাল হতে বেরিয়ে ছুটলাম এবার প্রজার বেশে অটোতে চেপে হোয়াইট বিচ হোটেলে। জ্যাম না থাকায় কলাতলী পৌঁছতে সময় লাগল না বেশি। রুমে গিয়ে কন্যাদের যেন তর সইছিল না। কতক্ষণে নামবে সমুদ্রের নোনা জলে। তাই আর দেরী না করে দুপুরের আহার সেরে, নেমে যাই কলাতলী বিচে। সাগরে নীলাভ পানি সব বয়সীদেরই টানে।

বেলা গড়িয়েছে, কথা ছিলো- আজ ভিজবে না তোমরা। কিন্তু সাগরের বিশালতা আর ফেনা তোলা ঢেউ, মানে না বাধা কোনো বারণ। ওরা তিনবোন আগেও এসেছে কয়েকবার। তবুও যেন মনে হয় এবারই সাগর দেখা ওদের প্রথম। সবার ক্ষেত্রেই হয়তো এরকম হয়। তা না হলে বারবার মানুষ সাগরপাড়ে ছুটে যেত না। ইচ্ছেমতো ঢেউয়ের তালে, লম্পঝম্প করে হোটেলে ফিরে খানিকটা সময় জিরিয়ে নেই। তারপর ছুটলাম রেডিয়ান্ট ফিস ওয়ালর্র্ড। শহরের প্রাণকেন্দ্রে এর অবস্থান। টিকেট কেটে ঢুকতেই বাচ্চাদের চোখ-মুখে আনন্দের ঝিলিক। অ্যাকুরিয়াম ভর্তি অচেনা-অজানা নানান পদের মাছ। এ যেন মাছেরই রাজ্য। ভয়ঙ্কর পিরানহা মাছ, মেকং জায়ান্ট ক্যাট ফিস, জেলি ফিস, এঞ্জেল ফিসসহ সামুদ্রিক আরো অনেক মাছই রয়েছে। এর মধ্যে মেকং জায়ান্ট ক্যাট ফিস হল পৃথিবীর মধ্যে, মিঠা পানির সব চাইতে বড় মাছ।

যার ওজন প্রায় ৩০০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। শিশুরা সবচাইতে বেশি মজা পেয়েছে, পানিতে থাকা মাছগুলোকে ফিটারে ভিটামিন খাইয়ে দিতে পেরে। স্বচ্ছ সুদৃশ্য অ্যাকুরিয়ামে থাকা বন্দি, নানান প্রকারের মাছের সঙ্গে পরিচিতি হতে থাকি। দেখতে দেখতে ফিস ওয়ার্লডে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, চলে যাই লাবণী পয়েন্টে।

রাতের সৈকত অন্যরকম ভালোলাগার। সপ্তাহের মাঝামাঝি হওয়ায় পর্যটকেরও ভিড় কম। নিস্তব্ধতায় সাগরের গর্জন অনুভব করে, চাঁদের আলোয় হেঁটে বেড়াই। ইতোমধ্যে কক্সবাজার নিবাসী ভ্রমণ পিপাসু ওয়াহিদ শিবলী ভাই এসে হাজির। তার সঙ্গে সৈকত লাগোয়া মুক্তমঞ্চে আড্ডার ফাঁকে, ভ্রমণ পরিকল্পণা সম্পর্কে আলোচনা করতেই নতুন জায়গার খোঁজ মিলে যায়। চটপটি-ফুসকা খেয়ে সেদিনের মতো সৈকত হতে চলে যাই।

পরদিন সকালে ছুটলাম মেরিন ড্রাইভ পথে। প্রথমেই দরিয়ানগরের ভিশন সি স্পোটর্সে প্যারাসাইলিংএ চড়লাম। জীবনে প্রথম উড়ার অভিজ্ঞতা। উড়ে উড়ে অনেক দূর। সাগরের বিশাল জলরাশির ওপর শূন্যে ভাসা। এক কথায় রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আমি উড়লাম আকাশে আর মেয়েরা বিচ বাইকে চড়ে সৈকতে ঘুরে। এবার চললাম চিরচেনা হিমছড়ি। কনিতার চাই তেঁতুল, রাবিতার শখ ঝর্ণা দেখা আর বাসিতা উঠবে পাহাড়ে। আহারে তিন কন্যা তিনদিকে। আমি তাদের গাইড হিসেবে সারাক্ষণ থাকি পাশে পাশে। তিনজনের ইচ্ছে পূরণ শেষে ছুটি এবার জালিয়াংপাড়ার দিকে। অল্প কিছুদিন হল সেখানে সি পার্ল ওয়াটার পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। টিকেট কেটে ঢুকতেই বাচ্চারা আনন্দে আত্মহারা। মজার মজার সব ওয়াটার রাইড। যতখুশি ততোবার, একই রাইডে বারংবার খেলে বেশ তৃপ্তি পেল তিন কন্যা। শেষ মুহুর্তে গিন্নিও, রেইন ড্যান্সিং রাইডে খেলার লোভ সামলাতে পারে নাই।

নানান পদের রাইডে চরম মাস্তি শেষে, ছুটলাম সামুদ্রিক খাবার খেতে। মেরিন ড্রাইভ লাগোয়া বাঁশছন ঘেরা এক রেস্টুরেন্টে ঢুকি। এ যেন কোন রেস্টুরেন্ট নয়, আস্ত একটি বাংলো। উঠানজুড়ে নানান ফুলের গাছ। রয়েছে ক্যাকটাস। ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা। ওর্ডার করতেই হুকুম তামিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই সার্ভ করল মচমচা ফ্রাই। তবে বরাবরের মতো, অক্টপাসের চাইতে কাঁকড়া খেয়েই বেশি স্বাদ পাই। খেয়ে দেয়ে হীমহীম বাতাসে বাহিরে আর না থেকে হোটেলে ফিরে যাই।

পরদিন মানে কক্সবাজার অবস্থানের তৃতীয় দিন। রাতে ফিরে যাব প্রাণের শহর ঢাকা। তাই সকাল সকাল চলে যাই বিচে। তখন ছিলো জোয়ার। টিউব নিয়ে ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি, ওয়াটার বাইকে (জেট স্কি) দূরে চলে যাওয়া আর ঘোড়ায় সাওয়ারী হয়ে তিন কন্যাসহ আমিও মেতে উঠি আনন্দে। মেয়েদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে মনে ভাবি, যারা বলেন টাকা হাতের ময়লা। টাকাটাই জীবনের সব কিছু না। তারা হয়তো যাপিতজীবন সম্পর্কে কোনো ধারণাই রাখেন না। টাকা ছিলো বলেই, আজ হয়তো কন্যাদের সব ইচ্ছেই পূর্ণ করা সম্ভব হচ্ছে। যাক সেসব কঠিন কথার ভাবনা। তার চাইতে ভালো জলকেলিতে মাতি। প্রায় ঘণ্টা তিনেক পর সাগরের বিশালতার হাতছানি পিছনে ফেলে, চলে যাই ফ্রেস হতে। দুপুরের আহার শেষে ছুটি ডায়বেটিকস পয়েন্টে। অটো হতে নেমে, ধীর পায়ে হেঁটে এগিয়ে যাই। শান্ত নিরিবিলি ঝাউবন ঘেরা সৈকত।

মানুষজন তেমন নেই। পর্যটকরা হয়তো তেমনভাবে চিনে না। কোলাহলহীন অন্যরকম ভালোলাগার মতো এক সৈকত। বিশেষ করে ঝাউগাছ তলার ঝিরঝির বাতাস, আপনাকে দূর অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। হেঁটে, বসে সময় গড়ায়। পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলে। সাগরজলে সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের, নান্দনিক টুপ করা ডুব দেখে ফিরতি পথে এগিয়ে যাই। সুপ্রিয় পাঠক, আপনারাও কন্যা দিবসটাকে স্মরণীয় রাখতে, কন্যাদেরকে নিয়ে ভ্রমণে বের হতে পারেন কাছেপিঠে কিংবা দূরে কোথাও। কন্যাদের সঙ্গে কাটানো সুন্দর সময়গুলো হয়ে থাক অমলিন।

যোগাযোগ : ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত হতে নানান মানভেদে, বিভিন্ন কোম্পানির পরিবহন কক্সবাজার চলাচল করে। এছাড়া সরকারিসহ বেসরকারি বেশ কয়েকটা এয়ারলাইন্সও রয়েছে। বাস ভাড়া ১০০০/= টাকা হতে ২৫০০/= টাকা পর্যন্ত।

থাকা খাওয়া : বর্তমানে সৈকত লাগোয়া নানান মানের প্রচুর হোটেল-মোটেল রয়েছে। এছাড়া কলাতলী সড়কে মাঝারি মানের অনেক অনেক গেস্ট হাউস, স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ও রিসোর্ট মিলবে। রুম ভাড়া ১৫০০/= টাকা হতে ৪৫০০০/= হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া খাবারের হোটেল প্রচুর রয়েছে। পছন্দমতো বেছে নেয়া যাবে।

অন্যান্য তথ্য : রেডিয়ান্ট ফিস ওয়ার্লডে জনপ্রতি প্রবেশ ফি-৩০০টাকা। সি পার্ল ওয়াটার পার্ক জনপ্রতি প্রবেশ ফি ৫৫০/= টাকা। কলাতলী হতে ডায়বেটিকস পয়েন্ট বড় জোর তিন কিলোমিটার। নিরাপত্তাজনিত কারণে, সেখান হতে সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে। সমসাময়িক আরো বেশি তথ্য জানতে, খোঁজ নিন গুগোল সার্চে।

সু-সংবাদ : কক্সবাজার এখন শুধু সাগর জলে ডুবাডুবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমানে পৃথিবীর এই বৃহৎ সাগর সৈকতের লাবণী পয়েন্ট হতে একেবারে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত পাবেন নানান বিনোদন। যা শিশু হতে বৃদ্ধ, সব বয়সীদের জন্যই রয়েছে বিভিন্ন ভ্রমণান্দ মাধ্যম।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন