ঢাকা, শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯, ২৪ জিলকদ ১৪৪৩

সুফল মিলছে না মেগা প্রকল্পের

প্রকাশনার সময়: ২৩ জুন ২০২২, ১০:৩৮ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২২, ১০:৪৫

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা গত বিশ বছরে প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রথম অবস্থায় নগরীর প্রধান এই সমস্যাটা রাস্তায় সীমাবদ্ধ থাকলেও গত দশ বছরে তা এখন ড্রয়িং রুমে গিয়ে পৌঁছেছে। সমস্যা সমাধানে সরকার এ পর্যন্ত দশ হাজার ৮০৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পও হাতে নিলেও রেহাই মেলেনি সমস্যা থেকে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ, নকশার জটিলতা, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতিকে কারণ হিসেবে দায়ী করছেন নরগবীদরা। ফলে জোয়ার আর বর্ষার জলে আড়াল হচ্ছে বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদেরই বছরে ক্ষতি হয় ৫শ’ কোটি টাকা। নগরের খাল-নালা-নর্দমাগুলো দখল হয়ে যাওয়া, ড্রেনেজ-ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ও অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণকে প্রধান কারণ হিসাবে দায়ী করছেন নগরস্থপতিরা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে বেশ কিছু অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। জমে যাওয়া পানি দ্রুত সরে যাওয়ার নালা, খাল বিবেচনায় না আনার কারণে চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক মেয়র মন্জুরুল আলমের সময় থেকেই নালা, খাল সুরক্ষিত রাখার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বর্তমানে সিটি করপোরেশন এসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে। নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে মহেশখাল সংযুক্ত সব এলাকা থেকে দ্রুত বৃষ্টির পানি মহেশখালে নেমে যাওয়ার জন্য নতুন নালা খনন করা হয়েছে।’

স্থানীয় সূত্রমতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের চার মেগা প্রকল্প নগরবাসীর ভোগান্তি দূর করতে পারেনি। এরমধ্যে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। একটি প্রকল্প সিটি করপোরেশন এবং অন্যটির কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সিডিএ’র বড় প্রকল্পটির ৬৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলা হলেও গত চার দিনের বৃষ্টিতে হালিশহর, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, বহদ্দার হাটসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বিভিন্ন স্থান হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো হাঁটুপানিতে ডুবে আছে বাড়াইপাড়া বহদ্দারহাট-বাড়াইপাড়া এলাকা।

জানা গেছে, মেগা প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সালের আগস্টে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরীর ৩৬টি খাল খনন, সংস্কারের কাজ শেষ হয়নি চার বছরেও। প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশার জটিলতা, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে সহসা জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে সহসাই মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই নগরবাসীর। তিন বছর মেয়াদের উচ্চাভিলাষী এই প্রকল্পে ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই, তহবিল বণ্টনে ধীরগতি, দক্ষ জনবলের অভাব, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী, ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে সাড়ে চার বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও জটিলতা কাটেনি।

সূত্রমতে, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় ১৮টি খাল খনন, সংস্কারের কাজ শুরু করাই সম্ভব হয়নি। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার জালে নগরীর মির্জাখাল, ত্রিপুরাখাল, গয়নাছড়া খাল, ডোমখালী খাল, মহেশখাল, চাক্তাইখাল, চাক্তাই ডাইমেনশন খাল, হিজড়া খাল, বদরখাল, নোয়াখাল, শিতলঝর্ণা খাল, চশমাখালসহ ১৮টি খালের খনন, সম্প্রসারণ ও সংস্কারের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য নেয়া এই প্রকল্পগুলো কার্যত কোনো উপকারেই আসছে না। এই ৩ বছর মেয়াদি এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের মেয়াদ দুই ধাপে ৩ বছর মেয়াদ বাড়ানো হলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সৃষ্ট নানা জটিলতার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কোনো লক্ষণই নেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯ জুন থেকে টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন প্রান্তে জমে থাকা পানি সরতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে প্রকল্পের আওতায় চলমান থাকা খালগুলোতে সৃষ্ট বাঁধ। যদিও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পক্ষ থেকে বেশ কয়েক দফায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে খালের ওপর দেয়া বাঁধগুলো অপসারণ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এখনো অনেক বাঁধ রয়ে গেছে। যে কারণে টানা বৃষ্টিতে জমে থাকা নগরীর পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে নগরীর বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, মুরাদপুর, শুলকবহর, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, ডিসি রোড, রাহাত্তারপুল, চন্দনপুরা, বাকলিয়া, মিয়াখাননগর, ষোলশহর, প্রবর্তক মোড়, পাঁচলাইশ, অক্সিজেন মোড়, পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হওয়ায় এই প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। প্রকল্পের কিছু অংশের ব্যয় বাজেটের ৮ থেকে ৩৮ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সময় নিচ্ছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। সিডিএর দেয়া তথ্যমতে, জায়গা-জমি নিয়ে আদালতে বেশকিছু মামলা রয়েছে বিচারাধীন। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ দুটোই বেড়েছে। ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার ব্যয় এখন ১০ হাজার কোটি ছুঁইছুঁই।

সিডিএ কর্মকর্তা বলছেন, এ প্রকল্প গ্রহণকালে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ছিল মৌজা রেটের দেড়গুণ। কিন্তু পরে সরকার সেটি বাড়িয়ে তিনগুণ করেছে। এদিকে, তিন মেগা প্রকল্পের অধীনে নগরীর ৪০টি খালের মুখে রেগুলেটর স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও সম্পন্ন হয়েছে পাঁচটি রেগুলেটর বসানোর কাজ। রেগুলেটরের ভৌত কাজের জন্য এসব খালের মুখে বাঁধ দেয়া হয়েছে। ফলে চলমান বর্ষার প্রবল বৃষ্টি আর জোয়ারের পানি জলজটের ইতিহাস ছাড়িয়েছে পুরো নগরীতে।

খালের পাড়ের মোট ৮৫ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে মাত্র ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাহাড়ি বালু আটকানোর জন্য প্রকল্পের ৪২টি সিলট্র্যাপের মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে ১৫টির। কাজের ধীরগতির কারণে এবারের বর্ষায় অতীতের চেয়ে ভোগান্তি কোনো অংশেই কমেনি বরং বেড়েছে।

জানা গেছে, খালগুলোর মধ্যে ২৩টির পানি প্রবাহ যায় কর্ণফুলী নদীতে ও ৩টির হালদা নদীতে এবং ১৪টি খালের পানি প্রবাহ বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। খালগুলোর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে পৃথক প্রকল্প নেয়া হলেও জমে যাওয়া পানি দ্রুত এসব নদী বা সাগরে সরে যাওয়ার দৃশ্যমান উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি এবারের বর্ষায়ও।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ