ঢাকা | মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮

নেয়ামত ও সৌন্দর্যের আধার পাহাড়

আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

প্রকাশনার সময়

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫৯

পাহাড়! আল্লাহ প্রদত্ত এক অনন্য নেয়ামত। পাহাড় আমাদের অস্তিত্বের অংশ। পৃথিবীর প্রথম মানব আদম (আ.) বসতি স্থাপন করেছিলেন এই পাহাড়ের মাঝেই। ইতিহাসে সে পাহাড়কে বলা হয় আদম পাহাড়। যেখানে আজও আদম (আ.)-এর পদচিহ্ন স্রষ্টার কুদরত প্রকাশ করে।

পাহাড়ের বুক ভেদ করে উঠে পূর্ণিমার চাঁদ। যার উঠান জুড়ে রাতভর চলে জোসনার খেলা। বাতাসে উড়ে আসে শুভ্র মেঘেরা। ছুঁয়ে যায় আলতো পরশে। বৃক্ষের ডালে ডালে হাজারো পাখির কলতানে মুখরিত যে পাহাড়ের আঙিনা, আবার সে পাহাড়ের আকাশ ছোঁয়া চূড়ায় দুধেল ধোঁয়ায় যেন জগতের সকল রহস্য ঢাকা। পাহাড়ের এই রহস্যময়ী সৌন্দর্য দেখলে মনে হয়, এ যেন রূপকথার স্বপ্নপুরী। তাই বলা যায়, পাহাড় এক রহস্যময়ী সৌন্দর্যের নাম।

পৃথিবীর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে মানুষ। তাই মানুষের কল্যাণেই আল্লাহ তায়ালা পাহাড় সৃষ্টি করেছেন। কেন না মানুষ যে ভূম-লের পৃষ্ঠে বিচরণ করছে তার স্থিতি রক্ষায় পাহাড়ের ভূমিকা অপরিহার্য। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এরশাদ করেন- ‘আর আমি পাহাড়কে পেরেক রূপে সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা নাবা : ৭)

অন্যত্রে এরশাদ করেন-‘আমি পৃথিবীতে এজন্য ভারি বোঝা (পাহাড়) রেখে দিয়েছি, যেন তাদেরকে নিয়ে পৃথিবী ঝুঁকে না পড়ে...।’ (সূরা আম্বিয়া : ৩১) এছাড়াও পাহাড়ের কথা পবিত্র কোরআনে বহুবার এসেছে। পাহাড়ের গুরুত্ব বুঝাতে পবিত্র কোরআনে তুর পাহাড়ের নামে একটি সূরার নামকরণ করা হয়েছে।

সহিহ হাদিসে এসেছে- ‘আল্লাহ জমিনকে সৃষ্টি করলে তা নড়াচড়া শুরু করে, এরপর আল্লাহ তায়ালা পাহাড় সৃষ্টি করলেন। তখন জমিনের স্থিতিশীলতা কায়েম হলো।’ (তিরমিজি : ৩২৯১)। অন্য হাদিসে এসেছে- ‘মহান আল্লাহ শনিবার মাটিকে সৃষ্টি করলেন আর রোববার পাহাড়-পর্বতকে।’ (বোখারি : ৬৯৬৫)

পাহাড়কে বলা হয় অক্সিজেন ফ্যাক্টরি। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলে, লেয়ার ভেদ করে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি পাহাড়ের কারণে সরাসরি পৃথিবীতে আসতে পারে না। তাই পাহাড়ের কল্যাণেই পরিবেশ মারাত্মক দূষণের হাত থেকে রক্ষা পায়। আমাদের এই ভূম-লের তিন ভাগ পানি আর এক ভাগ সমতল ভূমি। পানি আর সমতল ভূমির ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তারা (মানব জাতি) কী পাহাড়ের প্রতি লক্ষ্য করে না, কীভাবে তা স্থাপিত হয়েছে?’ (সূরা গাশিয়াহ : ৮৮)

পাহাড় ও পরিবেশ একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই পাহাড়কে ছাড়া পরিবেশের কথা কল্পনাও করা যায় না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশেও রয়েছে অসংখ্য পাহাড়। উঁচু-নিচু ঢেউতোলা এই সবুজ পাহাড়ের বুক বেয়ে আঁকা-বাঁকা মেঠো পথে চলতে ভাল লাগে না কার? আমাদের আছে চুম্বকচূড়া, হীমাছড়ি, নীলাগীড়িসহ আরো অসংখ্য পাহাড়। এসব পাহাড়ে রয়েছে অদ্ভুত ও বৈচিত্র্যময়ী নাম। নামের সাথে মিশে আছে কোনো না কোনো ইতিহাস।

চিম্বুক চূড়াকে বলে বাংলার দার্জিলিং। এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেই যেন আকাশ ছোঁয়া যায়। পাহাড়ের চারদিকে তাকালে মনে হয় এ যেন এক অন্য পৃথিবী। এ পৃথিবীর সীমানা অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। যতদূর দেখা যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ বর্ণের এই সারি সারি পাহাড়ের হাতছানি মনকে করে মুগ্ধ। যতদূর চোখ যায় মন শুধু তাকিয়েই থাকতে চায়।

পাহাড়ের আরেক সৌন্দর্যের নাম ঝর্ণা। সূর্যের আলো ঝর্ণার গায়ে পড়তেই নানান রঙের রংধনুরা হেসে ওঠে। মেঘমুক্ত দিনে রংধনুর এই খেলা চলে দিনভর। আবার মেঘাচ্ছন্ন পাহাড় দেখতেও কিন্তু অনেক চমৎকার। পাহাড়ের এই রূপসৌন্দর্য প্রকৃতিকে সব সময়ই সুন্দর করে রাখে। বিশ্বজগতের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যে, কী এক রহস্যময়ী সৌন্দর্যে পাহাড়কে সৃষ্টি করেছেন! সুবহানাল্লাহি অবি হামদিহি, সুবহানআল্লাহিল আযিম।

পাহাড় আমাদেরকে শুধুমাত্র প্রকৃতি প্রেমিকই করে না, বরং পাহাড়ের মতো অটল আর দৃঢ়প্রত্যয়ী হওয়ার শপথ করায়। তাছাড়া মানুষের প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ তো থাকছেই। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন- ‘তিনি পৃথিবীর উপরিভাগে অটল পর্বতমালা সৃষ্টি করেছন, আর তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চারদিনের মধ্যে তাতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন..।’ (সূরা হা-মীম সেজদাহ : ১০)

পাহাড় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার মৌলিক সৃষ্টিসমূহের একটি। পাহাড়ের স্বাভাবিকতা বিনষ্ট হলে নষ্ট হবে পরিবেশ। পাহাড় পরিবেশকে রক্ষা করে আর পরিবেশ মানুষকে সুস্থ রাখে। কিন্তু সেই মানুষই যখন পাহাড় কাটায় লিপ্ত হয়। তখন যেন সে নিজেকে গলা টিপে হত্যা করে। পরিবেশবাদীরা বলেন, বিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে একাবিংশ শতাব্দীর এসময় পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী ব্যাপকহারে পাহাড় নিধনের মাত্রা বেড়েছে। বর্তমানে যেন পাহাড় কাটার প্রতিযোগিতা চলছে। এর ফলে সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে আসছে। তাই নতুন নতুন জটিল ও কঠিন রোগ-ব্যাধির সৃষ্টি হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে একশত ঊনসত্তর বার। এর প্রধান কারণ হচ্ছে পাহাড় কাটা। ১৯৯০ সালে ‘ইমারত আইন-১৯৫২’ কে সংশোধন করে পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ করা হলেও প্রশাসনের সামনেই দেদারছে পাহাড় কাটা হচ্ছে। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে থাকছে।

পাঁচ জুনকে আমরা ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে পালন করি ঠিকই, কিন্তু পাহাড় যে পরিবেশের প্রাণ তা বোঝার চেষ্টাও করি না। পরিবেশবাদীরাও সে ক্ষেত্রে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। আমাদের বুঝতে হবে, সমুদ্র ও নদীর মতোই পাহাড়ও কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তাই পবিত্র কোরআনের বাণীকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার্থে পাহাড়কে বাঁচাতে হবে। আসুন! আমরা সকলেই একযোগে পাহাড় রক্ষায় এগিয়ে আসি।

লেখক : ইমাম ও খতিব, কালিকাপুর জামে মসজিদ কসবা, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x