ঢাকা, শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

পরকীয়া সন্দেহে অভিনেত্রী শিমু খুন

প্রকাশনার সময়: ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ০৯:৫৮

পরকীয়া সন্দেহে খুন করা হয় চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমুকে। খুনের ঘটনায় গ্রেফতার শিমুর স্বামী শাখাওয়াত আলীম নোবেল ও তার বাল্যবন্ধু এস এম ওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত তদারক সূত্রে জানা গেছে।

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে পারিবারিক কলহের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে একাধিক সূত্রমতে, ১৮ বছরের সংসারে একাধিক পরকীয়ায় বিরক্ত হয়ে নোবেল হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে দাবি করেছেন।

গ্রেফতার দুইজনকে গতকাল আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত তাদের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

জানা গেছে, বহুল আলোচিত চিত্রনায়িকা রাইমা ইসলাম শিমুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লাশটি একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরা হয়। সেই বস্তা লুকিয়ে রাখা হয় খাটের নিচে। প্রায় ১৬ ঘণ্টা শিমুর লাশ বস্তার ভেতরে খাটের নিচে ছিল। এরপর গভীর রাতে লাশটি একটি পাজেরো গাড়িতে করে কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ব্রিজের কাছে আলিয়াপুর এলাকার রাস্তার পাশের একটি ঝোপের ভেতর ফেলে দেয়া হয়। এ ঘটনায় জব্দ হয়েছে লাশ গুমের কাজে ব্যবহৃত গাড়িটিও। ঢাকা রেঞ্জের একজন অতিরিক্ত ডিআইজি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একাধিক পরকীয়ায় বিরক্ত ছিল নোবেল। এ কারণে শিমুকে খুন করেছে বলে দাবি করছেন। তার দাবিগুলোও খতিয়ে দেখা হবে। নোবেল মাঝে মধ্যেই নেশা করত। ঘটনার আগে দুইদিন ধরে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়। এক পর্যায়ে গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করেন।

ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনার সময় ঘুমিয়ে ছিলেন শিমু। তবে ওই সময় তার সন্তানরা কোথায় অবস্থান করছিল সে বিষয়ে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। রিমান্ডে আনার পর এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ১৭ জানুয়ারি সকাল দশটার দিকে ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থানাধীন হজরতপুর ব্রিজের কাছে আলিয়াপুর এলাকার রাস্তার পাশের একটি ঝোপের ভেতর থেকে চিত্রনায়িকা শিমুর (৪১) লাশ বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হয়।

ঘটনাস্থলে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত পাওয়া যায়। সেই আলামতের সূত্রধরেই লাশ উদ্ধারের পর চিত্রনায়িকার মৃত্যুর নেপথ্য কারণ জানতে গোয়েন্দা তৎপরতা ও তদন্ত শুরু করা হয়। তদন্তের এক পর্যায়ে চিত্রনায়িকা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, তারই ধারাবাহিকতায় ঢাকা জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ ও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযানে নামেন। গত ১৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে পুলিশ চিত্রনায়িকা শিমুর স্বামীর রাজধানীর কলাবাগান থানাধীন গ্রিন রোডের ৩৪ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালায়। অভিযানে বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডের আরো আলামত পাওয়া যায়।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যতই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হোক না কেন, খুনি বা খুনিরা কোনো না কোনো চিহ্ন রেখে যায়। যে রশি দিয়ে বস্তা সেলাই করা হয়েছে, তার অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়েছে নোবেলের গাড়ি থেকে এবং ধারণা করা হচ্ছে আলামত নষ্ট করতে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে গাড়িটি ধুয়েমুছে ফেলা হয়। মূলত এই সূত্র ধরেই চিত্রনায়িকা শিমু হত্যাকাণ্ডে তার স্বামী ও স্বামীর এক বাল্যবন্ধু জড়িত বলে তথ্য মেলে।

অভিযানে শিমু বাসা থেকেই তার স্বামী খন্দকার শাখাওয়াত আলীম নোবেলকে (৪৮) আটক করা হয়। পরে পাশের একটি বাড়ি থেকে নোবেলের বাল্যবন্ধু এস এম ওয়াই আব্দুল্লাহ ফরহাদকে (৪৭) আটক করা হয়। এরপর রাতেই তাদের কেরানীগঞ্জ থানা হেফাজতে নেয়া হয়।

জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে চিত্রনায়িকা শিমু হত্যাকাণ্ডে আটক হওয়া দুইজন তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা জানায়। মূলত পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ছিল শিমুর।

দাম্পত্য কলহের জেরে গত ১৬ জানুয়ারি সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে শিমুকে হত্যা করে তার স্বামী নোবেল। পরে লাশটি ওইদিনই মধ্যরাতে একটি গাড়িতে করে নিয়ে সেখানে ফেলে রেখে আসে। লাশ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা খুনিদের শনাক্ত করে তাদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। এমনকি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রহস্যও উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরো কেউ জড়িত আছে কিনা, সে বিষয়ে গভীর তদন্ত চলছে।

চাঞ্চল্যকর শিমু হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান পরিচালনকারী পুলিশ দলের প্রধান ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাবুদ্দিন কবির বলেন, চিত্রনায়িকা শিমু ও তার স্বামী রাজধানীর কলাবাগান থানাধীন গ্রিন রোডের ৩৪ নম্বর বাড়িতে থাকতেন।

ওই বাড়িটি নোবেলদের নিজস্ব। ছয়তলা বাড়িটি তারা একটি ডেভেলপার কোম্পানি দিয়ে তৈরি করিয়েছেন। তারা ভাগ হিসেবে একাধিক ফ্ল্যাট পেয়েছেন। এই দম্পতি তিন তলার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের দাম্পত্য জীবনে কলহ চলছিল।

এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গত ১৬ জানুয়ারি সকাল থেকেই তাদের কলহ শুরু হয়। কলহ চরম আকার ধারণ করলে এক পর্যায়ে নোবেল তার স্ত্রী চিত্রনায়িকা শিমুকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। তখন সকাল আনুমানিক ৭টা কি ৮টা বাজে। হত্যার পর লাশ ঘরেই লুকিয়ে রাখে। এরপর লাশ গুম করে ফেলার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনামতে ফরহাদ আর নোবেল গত ১৬ জানুয়ারি রাতে এসইউভি সিরিজের একটি পাজেরো গাড়ি নিয়ে আসে। বস্তায় ভরে রাখা লাশটি সেই গাড়িতে তোলে। গভীর রাতে লাশটি কেরানীগঞ্জের ওই জায়গায় ফেলে দেয়। আটক দুইজন হত্যার দায় ও লাশ গুমে সহযোগিতা করার কথা স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় আরো কেউ জড়িত আছে কিনা, তা জানার জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হলে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বিচারক।

ময়নাতদন্ত শেষে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ জানান, শিমুকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। শিমুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে লাশ টুকরা করা হয়নি।

নিহত শিমুর বোন ফাতেমা নিশু বলেন, আমরা দুই ভাই দুই বোন। সবার বড় ভাই হারুন অর রশীদ। দ্বিতীয় ভাই শহিদুল ইসলাম খোকন। তৃতীয় ছিল শিমু। আমি সবার ছোট। আমাদের বাবা নূরুল ইসলাম। মা রাশিদা বেগম। পৈতৃক বাড়ি বরগুনা জেলার আমতলী থানাধীন হলুদিয়া গ্রামে। তবে আমরা সবাই ঢাকায় থাকি।

তিনি বলেন, শিমুর বিয়ে হয়েছে তা প্রায় ১৮ বছর হবে। তাদের সংসারে রিট (১৬) নামে এক মেয়ে আছে। আর রাইয়ান (৭) নামে এক ছেলে আছে। তাদের সংসারে দাম্পত্য কলহ থাকার তেমন কোনো কথা আমার জানা নেই। দাম্পত্য জীবনে কোনো মানুষেরই শতভাগ সুখী হওয়ার রেকর্ড খুবই কম। তবে তারা দাম্পত্য জীবনে অসুখী ছিলেন বলে আমার জানা নেই।

তিনি বলেন, গত ১৫ জানুয়ারি রাতে আমার সঙ্গে শিমুর কথা হয়। পরদিন সকালে মেসেঞ্জারে ফোন দেই। ফোন বাজলেও কেউ তা ধরেনি। ভাবলাম ব্যস্ত হয়তো। তাই ফোন ধরেনি। এরপর ওইদিনই সকালে রিটকে ফোন দেই। বলি, তোমার আম্মু ফোন ধরছে না কেন? রিট বলে, আম্মু বাইরে গেছে। এরপর সারাদিন ব্যস্ততার কারণে আর ফোন দেয়া হয়নি। রাতে দুলাভাইকে ফোন দেই। তিনি জানান, শিমু বাইরে আছে।

পরদিন অর্থাৎ ১৬ জানুয়ারি সকাল সাড়ে দশটার দিকে শিমুর ফোন বন্ধ পাই। এরপর একটানা চেষ্টা করেও তাকে পাইনি। পরে শিমুর পরিচিতদের কাছ থেকে শিমুর খবর জানতে চাই। তারা শিমুকে পাচ্ছে না বলে জানায়। পরদিন তো সব শেষ! শিমুর লাশ পাওয়া যায়, বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন তিনি।

দায়িত্বশীল এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিমুকে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে নোবেল। এরপর সেই বস্তা খাটের নিচে রেখে দেয়। প্রায় ষোলো ঘণ্টা সেই লাশের বস্তা ছিল খাটের নিচে। অনেক প্রতিবেশী শিমুর খোঁজ-খবর নিতে এলে সে বাড়ির বাইরে বলে জানায় নোবেল। শিমুর কাছে আসা ফোনগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি নোবেল রিসিভ করে। কোনো সময় বলে ব্যস্ত আছে। আবার অনেক সময় ফোন ধরেনি।

এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে শিমুর ফোনের রিং টোন অফ করে দেন। যাতে কেউ সন্দেহ করতে না পারে। সন্ধ্যার দিকে নোবেল তার বাল্যবন্ধু ফরহাদকে জরুরি আলাপের কথা বলে তাকে দ্রুত তার বাসায় আসতে বলে। ফরহাদ বাসায় গেলে তার পুরো বিষয়টি খুলে বলে। এরপর ওই পাজেরো গাড়িটিতে করে শিমুর লাশ রাতের আঁধারে সেখানে নিয়ে ফেলে দেয়। এ ঘটনায় শিমুর বড় ভাই হারুন অর রশীদ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শিমুর ছোট বোন নিশু বলেন, লাশ কবে নাগাদ দাফন করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি পরে জানানো হবে বলে তিনি জানান।

রমনা জোনের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান জানান, ১৬ তারিখ রাতে শিমুর স্বামী স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় একটি জিডি করেন কলাবাগান থানায়। ওই জিডির তদন্তের এক পর্যায়ে তার লাশ উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। এখন পুরো ঘটনাই পরিষ্কার। ফলে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশই মামলার তদন্ত কাজ করবে।

জানা গেছে, পূর্ণিমা, শাবনূর, মৌসুমীর মতো জনপ্রিয় নায়িকা না হলেও তাদের সহশিল্পী হিসেবে প্রায়ই দেখা মিলেছিল শিমুর। সিনেমায় তার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘বর্তমান’ সিনেমার মাধ্যমে। এই সিনেমার মাধ্যমেই রুপালি পর্দায় অভিষেক হয় শিমুর। এরপর একে একে অভিনয় করেছেন ৫০টির বেশি সিনেমায়। শুধু রুপালি পর্দায় নয়; ছোট পর্দায়ও পদাচরণা ছিল শিমুর। বহু নাটকে দেখা গেছে তাকে। চিত্রনায়ক রিয়াজ, অমিত হাসান, বাপ্পারাজ, জাহিদ হাসান, মোশারফ করিম ও শাকিব খানের বিপরীতে স্ক্রিন শেয়ার করেন এ নায়িকা।

বাংলাদেশের অনেক গুণী পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন শিমু। সে তালিকায় আছেন মরহুম চাষী নজরুল ইসলাম, পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, এ জে রানা, শরিফুদ্দিন খান দীপু, এনায়েত করিম ও শবনম পারভীন। তিনি সর্বশেষ ২০০৪ সালে ‘জামাই শ্বশুর’ ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর তাকে আর চলচ্চিত্রে দেখা না গেলেও টিভি নাটকে নিয়মিত অভিনয় করতে দেখা যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। শিমু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি থেকে বাদ পড়া ১৮৪ জন সদস্যের একজন।

আসন্ন নির্বাচনে ১৮৪ জনের সঙ্গে তার সদস্য পদ স্থগিত করা হয়। স্থগিত হওয়া অন্য সদস্যদের সঙ্গে তিনি বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সরব ছিলেন। একটি বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ও একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বিপণন বিভাগে কাজ করার পাশাপাশি একটি প্রোডাকশন হাউজ চালাতেন এই অভিনেত্রী। স্বামী নোবেল ও দুই সন্তান নিয়ে শিমু রাজধানীর গ্রিনরোড এলাকার বাসায় থাকতেন।

নয়া শতাব্দী/এম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ