ঢাকা | শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

বলিউডে বাংলাদেশি শিল্পীদের গান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশনার সময়: ১৮ নভেম্বর ২০২১, ০৭:০৯

সংগীতের কোনো সীমানা নেই, দেশ নেই। সংগীত সবসময়ই মুক্ত। একে কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দি রাখা যায় না। সংগীতের আছে শুধু সুর। আছে তাল, লয় ও ছন্দ। গানে গানে বলিউড মাতিয়েছেন যেসব বাংলাদেশি শিল্পী তাদের নিয়ে এ আয়োজন লিখেছেন সিহাব হাসান

গীতা দত্ত

কিশোরী বয়সেই মা-বাবার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) চলে যান বাংলাদেশের ফরিদপুরের রাজ পরিবারের মেয়ে গীতা দত্ত। আসল নাম গীতা ঘোষ রায়চৌধুরী। পরে ১৯৫১ সালে তখনকার বলিউড সিনেমার অন্যতম প্রধান নায়ক ও পরিচালক গুরু দত্তের প্রথম সিনেমা ‘বাজি’ সিনেমায় গান গাইতে গিয়ে প্রণয়ে জড়ান গীতা। পরে গুরুকে বিয়ে করে গীতা রায় হয়ে উঠেন গীতা দত্ত। যদিও তাদের দাম্পত্য জীবন তেমন দীর্ঘ হয়নি। যাই হোক, বোম্বে যাওয়ার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় বলিউড সিনেমায় গান গেয়ে জানান দেন নিজেকে। সেখানে মাত্র ১২ বছর বয়সে সুরকার হনুমান প্রসাদ একবার গীতার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে ১৯৪৬ সালে তার ‘ভক্ত প্রহলাদ’ নামের চলচ্চিত্রে প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন। যদিও ওই ছবিতে গীতা কোরাসে মাত্র দুই লাইন গেয়েছিলেন। কিন্তু তার অসাধারণ গায়কীর কারণে পরের বছরে গীতা ‘দো ভাই’ ছবিতে প্লেব্যাক করেন। এই ছবিতে তার গান হিন্দি ছবির জগতে প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হিসেবে তাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

রুনা লায়লা

সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে গুণী শিল্পী রুনা লায়লার হাত ধরে হিন্দি চলচ্চিত্র গানে বাংলাদেশি শিল্পীদের আবারো নতুন যাত্রা শুরু হয়। মূলত ১৯৬৫ সালে উর্দু ছবি ‘জুগনু’তে গান গেয়ে সংগীতের ক্যারিয়ার শুরু করলেও ১৯৭৬ সালে বলিউডপাড়ায় নাম লেখান এই ভার্সেটাইল শিল্পী। শুরুটা হিন্দি গানের বিখ্যাত সংগীত জুটি কল্যাণজি-আনন্দজির সুরে তখনকার আবেদনময়ী নায়িকা হেলেনের লিপে ‘এক সে ব্যারকের এক’ সিনেমার শিরোনামের আইটেম গান গেয়ে আলোড়ন তুলেন রুনা। যদিও তারও আগে ১৯৭৪ সালে ভারতের চলচ্চিত্রপুরি মুম্বাইয়ে একটি লাইভ কনসার্টে মুগ্ধ হয়ে জয়দেব নামের সংগীত পরিচালক তাকে ভারতের রাষ্ট্রীয় টেলিভেশন দূরদর্শনে প্রথম গান করার সুযোগ করে দেন। সে সময় রুনা লায়লার বিভিন্ন হিন্দি-উর্দু গানে মুগ্ধ হয়ে ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক খুশবন্ত সিং একবার এক পত্রিকায় লিখে বসেন, ‘তোমরা আমাদের রুনা লায়লা দাও, আমরা তোমাদের ফারাক্কার পানি দিয়ে দেব।’ ‘ঘরোন্দা’ সিনেমায় ভূপিন্দর সিংয়ের সঙ্গে ‘দো দিওয়ানে শেহের মে’ গানের জন্য রুনা লায়লা ফিল্ম ফেয়ার ম্যাগাজিনের বেস্ট প্লেব্যাক সিঙ্গারের নমিনেশন লাভ করেন। এর পরে তিনি আরো কিছু গানে কণ্ঠ দেন। বিখ্যাত শিল্পী মোহম্মদ রফির সঙ্গে ‘জান-ই-বাহার’ সিনেমার ‘মার গায়ো রে’ ডুয়েট গানটি শ্রোতারা খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করেন। এ ছাড়া উর্দু চলচ্চিত্রে গাওয়া হিট গান ‘ও মেরা বাবু ছেলছাবিলা মে তো নাচুঙ্গি’ গানটি বলিউড সিনেমাতেও ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, রুনা লায়লা একমাত্র বাংলাদেশি শিল্পী যার ভারতে গান গাইবার ওয়ার্ক পারমিট আছে।

এন্ড্রু কিশোর

বাংলাদেশের পুরুষ কণ্ঠশিল্পীদের মধ্যে প্রথম হিন্দি গানে প্লেব্যাক করেন এন্ড্রু কিশোর। তাও আবার কিংবদন্তি সংগীত পরিচালক আরডি বর্মণের সুরে। ১৯৮৬ সালে রাজেশ খান্না ও শাবানা অভিনীত বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার প্রমোদ চক্রবর্তীর পরিচালনায় ‘শত্রু’ সিনেমায়। সুপারহিট গায়ক কিশোর কুমারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গান করে সুনাম কুড়ান এন্ড্রু কিশোর। যার বাংলা নাম ছিল ‘বিরোধ’। এন্ড্রু কিশোর নিয়ে এক মজার গল্প আছে, যখন মা মিনু বাড়ৈয়ের কোল আলোকিত করে তিনি জন্ম নেন তখন মা তার প্রিয় শিল্পী কিশোর কুমারের নামে সন্তানের নাম রাখেন ‘কিশোর’। ধীরে ধীরে সেই শিশুটি বড় হয়ে সংগীতাঙ্গনে পা রাখেন এবং বলিউড সিনেমায় পা রেখে তার বলিষ্ঠ এবং সুমধুর কণ্ঠের জোরে মায়ের প্রিয় শিল্পী কিশোর কুমারের গানে ভাগ বসান। আরডি বর্মণের সুরে মোট তিনটি গান তিনি করেন। তার মধ্যে দুটি হিন্দিতে এবং বাংলা ছবি ‘বিরোধ’-এর জন্য তিনটি বাংলায় গান করেন। বিখ্যাত গীতিকার মাজরু সুলতানপুরির লেখা ‘সুরেজ চান্দা’, ‘মে তেরি বিসমিল হু’ এই হিন্দি গান দুটি গাওয়ার পাশাপাশি বাংলা ‘মুখে বল তুমি হ্যাঁ, ‘এর টুপি ওর মাথায়’ এবং ‘আজো বয়ে চলে পদ্মা মেঘনা’ গানগুলো করেন এন্ড্রু কিশোর।

মিতালী মুখার্জি

ভারতের গজল শিল্পী ভূপিন্দর সিংকে বিয়ে করে দেশটির পুত্রবধূ হয়ে সেখানেই বসবাস করছেন বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী মিতালী মুখার্জি। বাংলাদেশে তিনি মিতালী মুখার্জি নামে পরিচিত হলেও ভারতে মিতালী সিং নামেই পরিচিত। ১৯৮৭ সালে মিতালী প্রথম হিন্দি সিনেমায় নাম লেখান। বাঙালি সংগীত পরিচালক বাপ্পী লাহিড়ীর সুরে রিলিজ পাওয়া রাজএন সিপ্পির পরিচালনায় ‘সত্যমে জয়তে’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করা ‘তু জান সে পেয়ারা হ্যায়’ গানটিই মিতালী মুখার্জির একমাত্র হিন্দি ফিল্মের গান।

জেমস

বলিউডের সিনেমায় বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে সর্বশেষ গেয়েছেন ‘নগর বাউল’খ্যাত রকস্টার জেমস। ২০০৫ সালে বলিউডের জনপ্রিয় সুরকার প্রীতমের সুরে অনুরাগ বসুর পরিচালনায় ‘গ্যাংস্টার’ সিনেমায় প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় বাঙালি সংগীত পরিচালক প্রীতম কলকাতার বিখ্যাত ব্যান্ড ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র ‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে’ গানটির হিন্দি ভার্সন ‘ভিগি ভিগি রাতে’ গানটির জন্য যুৎসই কণ্ঠ খুঁজছিলেন। পরে বাংলাদেশের হার্টথ্রব ব্যান্ড শিল্পী জেমসের গান শুনেই মুগ্ধ হয়ে তাকে গান করার প্রস্তাব দেন প্রীতম। তারপর তো গানটি হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য ইতিহাস। এখনো দেশটির বিভিন্ন রিয়ালিটি শো থেকে শুরু করে বিভিন্ন লাইভ অনুষ্ঠানে এই গান কণ্ঠশিল্পীদের প্রিয় তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। পরে প্রীতম আবার জেমসকে দিয়ে ২০০৬ সালে ‘ও লামহে’ ও ২০০৭ সালে ‘লাইফ ইন অ্যা মেট্রো’ সিনেমায় পরপর তিনটি গান রেকর্ড করান। ‘লাইফ ইন অ্যা মেট্রো’ সিনেমায় ‘আলবিদা’ ও ‘রিশতে’ এবং ‘ওহ লামহে’ সিনেমার ‘চাল চালে আপনে ঘের’ এবং ২০১৩ সালে অঞ্জনের ‘ওয়ার্নিং’ ছবির ‘বেবাসি’ গানটি বলিউডে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় জেমসকে।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন