ঢাকা | বুধবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
দুশ্চিন্তায় লক্ষাধিক শিশুর অভিভাবক

ভর্তিতে ‘বয়স’ জটিলতা

প্রকাশনার সময়: ১৩ নভেম্বর ২০২১, ০৬:৩৮
সংগৃহীত ছবি

করোনাভাইরাসের কারণে প্রায় ১৮ মাস বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর ফলে লাখ লাখ অভিভাবক গত বছর তাদের সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাননি। আগামী জানুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে নতুন শিক্ষাবর্ষ। নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তিতে ‘বয়স’ জটিলতায় পড়েছে লাখো শিশু। করোনার সময় যেসব শিশু স্কুলে ভর্তি হয়নি, তাদের মধ্যে যাদের বয়স সাড়ে তিন বা চার বছরের বেশি হয়ে গেছে তাদের ভর্তি নিয়েই তৈরি হচ্ছে ঘোর শঙ্কা। এমতাবস্থায় লক্ষাধিক শিশু ভর্তি জটিলতায় পড়লেও সরকারের শিক্ষা বিভাগের কোনো ভাবান্তরই নেই। বয়স চার বছর পার হয়ে গেছে- এমন সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বেশির ভাগ অভিভাবক। ভুক্তভোগী একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন এমন তথ্য।

এদিকে, করোনার সময়ে স্কুল বন্ধ থাকলেও শিশু শ্রেণিতে ভর্তি নিয়েছেন_এমন যুক্তি দেখিয়েছেন একাধিক স্কুলের শিক্ষক-কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, স্কুল বন্ধ থাকলেও তারা বাসায় মাসিক ও ত্রিবার্ষিক পরীক্ষা নিয়েছেন। অ্যাসাইমেন্টও জমা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়াও করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকলেও আমরা অনলাইনে ভর্তি নিয়েছি। ক্লাসও নিয়েছি। ফলে এখানে কিছুই করার নেই।

ভুক্তভোগী অভিভাবকরা বলছেন, ২০১০ সালের শিক্ষানীতি অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের বয়স ৬ এর বেশি হতে হবে। কোনো অভিভাবক যদি ৭ বছর বয়সে তার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করান সেক্ষেত্রেও কোনো বাধা নেই। তাহলে শুধু প্রাক-প্রাথমিকে স্কুলগুলোতে এভাবে সর্বনিম্ন বয়স বেঁধে দেয়ার কোনো আইনি ভিত্তি আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা। কেজি স্কুলের শিক্ষা বিষয়ে সরকারি সুস্পষ্ট নীতিমালা করার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবকরা। একই সঙ্গে করোনা বিবেচনায় এসব ছোট বাচ্চাদের ভর্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

করোনার ছুটি শেষে স্কুলে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে উদ্ভূত জটিলতার কথা জানালেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক আলমগীর মুহম্মদ মনসুরুল আলম বলেন, ‘সরি, কিন্ডারগার্ডেন আমাদের আওতাভুক্ত না। এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। প্রাথমিকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।’

জানা গেছে, নামিদামি স্কুলগুলোর বেশির ভাগই স্কুলে ভর্তির সর্বোচ্চ বয়স সাড়ে তিন থেকে চার বছর নির্ধারণ করে দিয়েছে। তেমনি রাজধানীর মালিব্যাগে ঢাকা ক্যাডেট স্কুলে একটি শিশুর জন্য ভর্তির ফরম তুলতে গেলে প্রথমে ফরম দিতেই চায়নি। তারা প্লে গ্রুপে সর্বোচ্চ সাড়ে চার বছর বয়সি শিশুকে ভর্তি করবে বলে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। যে শিশু ভর্তি হবে, তার জন্ম হতে হবে ২০১৭ সালের ২০ জুনের আগে। ৩১ ডিসেম্বর হিসাব করে স্কুল থেকে বলা হয় বয়স ১১ দিন বেশি হয়, ফরম দেয়া যাবে না। পরে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নানাভাবে যোগাযোগ করে ফরম আনেন তার অভিভাবক। কুড়িলে আরেক স্কুল নেভি অ্যাংকর স্কুল ও কলেজে একই শিশুর জন্য ফরম তুলতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তারাও সাড়ে তিন থেকে চার বছরের শিশুকে প্লে গ্রুপে ভর্তি নেবে, তবে ওই শিশুটির বয়স সাড়ে চার। যিনি ফরম দেন তিনি বলেন, এক দুই মাস বেশি হলেও দেয়া যেত। তবে ছয় মাস বেশি বয়স শিক্ষকরা মানবেন না।

স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে বয়স জটিলতায় পড়েছেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা জান্নাত আক্তার। তার ছেলে আরিয়ান হোসেনের বয়স এখন ৬ বছর। করোনায় যখন স্কুল বন্ধ হয়ে যায়, তখন ছিল সোয়া চার বছর। গত বছরের জুনে ভর্তি করার পরিকল্পনা ছিল। স্কুল বন্ধ থাকায় তার ছেলেকে আর ভর্তি করেননি জান্নাত। এখন বিভিন্ন স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। স্কুল থেকে বলা হচ্ছে, বাচ্চার বয়স বেশি হয়ে গেছে।

জান্নাত আক্তার বলেন, কয়েকটি স্কুল থেকে বলল, বাংলা মাধ্যমের লোয়ার শিশু শ্রেণিতে ভর্তি বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে চার থেকে সাড়ে চার বছর, আর আপার শিশু শ্রেণিতে সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ বছর এবং ইংরেজি মাধ্যমে প্লে শ্রেণিতে তিন থেকে সাড়ে তিন বছর, নার্সারিতে চার থেকে সাড়ে চার বছর। মূলত এতে পড়েছি সমস্যায়।

তিনি আরো বলেন, আমার ইচ্ছা ছেলেকে আগামী শিক্ষাবর্ষে আপার শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করার। তবে বয়স বেড়ে যাওয়ায় ওকে আপার শিশু শ্রেণিতে কোথায় ভর্তি করব তা এখনো বুঝতে পারছি না।

একই সমস্যায় পড়েছেন মগবাজারের বাসিন্দা আরশাদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আমার মেয়ে আনিশা চৌধুরীর বয়স এখন সাড়ে ৫ বছর। বাসার পাশে দুইটি স্কুলে ভর্তির খোঁজ নিয়ে জানলাম, প্লে গ্রুপে আনিশাকে ভর্তি করা সম্ভব না। কারণ ওর বয়স বেশি হয়ে গেছে। জানতে চাইলে ইস্পাহানি বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাদেকা বেগম বলেন, ভর্তিতে বয়স নির্ধারণের বিষয়টি নির্ধারণ করে সরকার। যেমন গত বছর সরকার প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে ৬ বছর প্লাস নির্ধারণ করেছিল। আমরা সে মোতাবেক ভর্তি করেছি। আর প্রাক-প্রাথমিকে সরকার থেকে কোনো নির্দেশনা না থাকায় আমাদের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী, বয়স নির্ধারণ করে ভর্তি করা হয়েছে।

একই বিষয়ে ইস্কাটন গার্ডেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র চৌধুরী বলেন, গত বছর প্রথম শ্রেণিতে সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী, বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রাক-প্রাথমিকে আমরা আমাদের মতো করে বয়স নির্ধারণ করেছি।

বয়স জটিলতা কাটাতে সব শ্রেণিতে বয়স নির্ধারণের পক্ষে বেশিরভাগ অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। এ বিষয়ে প্রভাতী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাহিদা চৌধুরী বলেন, সরকারের শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রাক-প্রাথমিকে বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। এতে প্রাক-প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তিতে নানা জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। আমি মনে করি, প্রথম শ্রেণির মতো প্রাক-প্রাথমিকেও বয়স নির্ধারণ করে দেয়া উচিত।

কিন্ডারগার্টেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন তথ্য বলছে, সারাদেশে ৬০ হাজারের বেশি স্কুল আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী ছিলেন ১২ লাখ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০ লাখ। আর সারাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা পৌনে তিন কোটির কিছু বেশি। এদের মধ্যে সরকারি স্কুলে পড়ে দুই কোটির কাছাকাছি। এদের সিংহভাগই মফস্বল ও গ্রাম এলাকার। আর বড় শহরের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই এখন কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। আর এরাই এখন বয়স জটিলতায় স্কুলে ভর্তি হওয়ার সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে।

প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি বয়স জটিলতার বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুল ভর্তি নীতিমালা-২০২১ কমিটির সদস্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (বিদ্যালয়) বেলাল হোসাইন বলেন, গত বছর আমরা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তিতে ৬ বছর প্লাস বয়স নির্ধারণ করেছিলাম। সরকারি এবং বেসরকারি (এমপিওভুক্ত) বিদ্যালয়গুলো আমাদের নির্ধারিত বয়স ধরেই ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করেছিল। তবে প্রাক-প্রাথমিকে কোনো বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। বিদ্যালয়গুলো নিজেদের মতো করে প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তি করেছিল।

করোনার কারণে যাদের বয়স বেড়ে গেছে সেসব শিক্ষার্থীর ভর্তির কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাক-প্রাথমিকের বিষয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। তবে প্রথম শ্রেণির জন্য ভর্তিতে ৬ বছর প্লাস উল্লেখ করেছিলাম যেন কারো বয়স ৬ বছরের বেশি হলেও আবেদন করতে পারে। তাই করোনার কারণে যেসব শিক্ষার্থীর এক বছর হারিয়ে গেল, তাদের প্রাক-প্রাথমিকে ভর্তিতে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বয়স পুনর্নির্ধারণ করার জন্য স্কুলগুলোকে পরামর্শ দেন তিনি।

জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, করোনার কারণে পুরো পৃথিবীই বিপর্যস্ত। সুতরাং, বিশেষ এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন শিক্ষাবর্ষে স্কুলগুলোর বয়স ছাড় দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে। কেননা বিশেষ এ পরিস্থিতির ভুক্তভোগী কেন হবে শিশুরা?

তিনি আরো বলেন, প্রাক-প্রাথমিকের জন্য সরকারের অবশ্যই একটি নীতিমালা থাকা উচিত। নীতিমালা না থাকার কারণেই বিভিন্ন স্কুল নিজেদের মতো করে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে, এটাও প্রত্যাশিত নয়।

প্রসঙ্গত, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর ২০২০ সালের ১৭ মার্চ সারা দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এর প্রায় দেড় বছর পর গত ১২ সেপ্টেম্বও স্কুল-কলেজে ক্লাস শুরু হয়। তবে প্রতিদিন সব শ্রেণিতে ক্লাস হচ্ছে না। শুধু চলতি বছরের ও আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ক্লাস নেয়া হচ্ছে। আর তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে সপ্তাহে দুই দিন এবং অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এক দিন ক্লাসে নেয়া হচ্ছে। এই সময়ে স্কুলে কোনো পরীক্ষা নেয়া হয়নি। ক্লাস চলেছে অনলাইনে। এমনকি প্লে ও কেজি শ্রেণিতেও ক্লাস নেয়া হয়েছে অনলাইনে।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন