ঢাকা, শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ১১ আষাঢ় ১৪২৯, ২৪ জিলকদ ১৪৪৩

দূষণে ভুগছে চামড়াশিল্প

প্রকাশনার সময়: ২৩ জুন ২০২২, ১৫:১৮

সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দূষণের দোষে ভুগছে। দূষণ বন্ধ করতে না পারায় ইউরোপ-আমেরিকার বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাংলাদেশি চামড়া কিনছে না। আর চামড়া খাতের দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সেই আক্ষেপই করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

দফায় দফায় সময় বেঁধে দেওয়ার পরও মালিকরা সিইটিপি প্রস্তুত নয় এমন যুক্তিতে ট্যানারিগুলো সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে নিতে চাইছিলেন না। অবশেষে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল সেবা-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ট্যানারিগুলোকে হাজারীবাগ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সাভারেও ট্যানারিগুলোর বিরুদ্ধে দূষণের অভিযোগ ওঠে। সিইটিপি যে ‘অকার্যকর’, তা ওঠে এসেছে পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শনে। ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একটি চিঠি দেয় পরিবেশ অধিদফতর। এতে বলা হয়, সিইটিপি অকার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নালা দিয়ে ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জানা গেছে, ঢাকার হাজারীবাগে থাকাকালে ট্যানারিগুলো দিনে প্রায় ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় ফেলত। এ ছাড়া চামড়ার উচ্ছিষ্ট বেড়িবাঁধের পাশে, খালে, জলাধারে ও রাস্তার পাশে ফেলা হতো। এই সমস্যার সমাধানে শিল্প মন্ত্রণালয় ২০০৩ সালে চামড়াশিল্প নগর প্রকল্প হাতে নেয়। ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অধীনে সাভারের হেমায়েতপুরে ১৯৯ একর জমি অধিগ্রহণ করে ১৫৪টি ট্যানারিকে প্লট দেওয়া হয়। ৫৪৭ কোটি টাকায় সিইটিপি নির্মাণের জন্য ২০১২ সালে একটি চীনা কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেয় বিসিক। ১৮ মাসে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি ৯ বছরের বেশি সময় নেয়। কিন্তু তারপরও সিইটিপি যথাযথ মান অনুযায়ী হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমরা নিজস্ব কারখানার চামড়া রফতানি করতে পারছি না।’

তিনি বলেন, ‘করোনা ও যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে যাচ্ছে। এ রকম সময়ে চামড়াপণ্যের বাজারে আমাদের হিস্যা বাড়ানোর সুযোগ ছিল। নিজস্ব কাঁচামাল থাকার পরও শুধু উন্নত কর্মপরিবেশের (কমপ্লায়েন্স) অভাবে সে সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।’ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ট্যানারিগুলো আর্থিক সংকটে ভুগছে। সে জন্য দ্রুততম সময়ে হাজারীবাগকে রেড জোনের আওতামুক্ত করা দরকার। সেটি হলে ট্যানারিগুলো সেখানকার সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ এবং ব্যবসায়ে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবে। তিনি আরো বলেন, অভিজ্ঞ একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান চামড়াশিল্প নগরের বর্তমান কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) কার্যকর করার ব্যাপারে কারিগরি সহায়তা দিতে চায়। সে জন্য তাদের চাহিদা অনুযায়ী কিছু সহযোগিতা দিতে হবে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চেয়ে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি বলেন, সিইটিপিতে যে অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে, সেটি জনগণের টাকা। ফলে এটি ফেলে দেওয়া যাবে না। চামড়া খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারের সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

পরিবেশদূষণ নিয়ে বিসিকের কর্মকর্তারা জানান, মালিকরা বর্জ্য নির্গমনের নিয়ম মানেন না। অন্য দিকে ট্যানারি মালিকরা বলেন, সিইটিপি নির্মাণ ও পরিচালনা করছে বিসিক। ফলে দায়ও তাদের।

জানা গেছে, সাভার চামড়াশিল্প নগরে বিসিকের তৈরি সিইটিপির দৈনিক বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। ভরা মৌসুমে সাভার চামড়াশিল্প নগরে দিনে ৩০ থেকে ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য উৎপাদিত হয়।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সিইটিপির সক্ষমতা অনুযায়ী ট্যানারিগুলো থেকে বর্জ্য নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করেও সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। বড় কয়েকটি ট্যানারি স্বতন্ত্র ইটিপি করলে সিইটিপির ওপর চাপ কমবে।

শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘সিইটিপির বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে ভালো। একটি সূচক ছাড়া বাকি সবকটিই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আছে। আমরা শুধু কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যার মধ্যে রয়েছি।’ এ ছাড়া রাজশাহীতে চামড়া খাতের জন্য সিইটিপি প্ল্যান্ট বসানোর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

এ দিকে পরিবেশ দূষণের দায়ে এটি বন্ধ করতে সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। কমিটির সদস্যরা বলেছেন, চামড়াশিল্প নগরী বন্ধ হচ্ছে। এরপর বর্জ্য পরিশোধনের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা নিয়েই শিল্পনগরী চালাতে হবে।

অবশ্য পরিবেশদূষণ হলেও চামড়াশিল্প নগরী বন্ধ করার পথে না হাঁটার ইঙ্গিত দিলেন শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা। তিনি বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে শিল্পনগরী বন্ধ করাটা কোনো সমাধান হবে না। এটি চালু রেখেই কীভাবে পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা যায়, সেটি নিয়ে আমরা কাজ করব। রাতারাতি তো অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। এরই মধ্যে সিইটিপি ৮০ শতাংশ কার্যকর করতে পেরেছি আমরা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এম আবু ইউসুফ বলেন, কমপ্লায়েন্স না হওয়ায় বাংলাদেশ চামড়াপণ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দাম কম পাচ্ছে। তিনি বলেন, চামড়া খাতের সমস্যা আগে থেকে চিহ্নিত। এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উন্মুক্ত জায়গায় ময়লা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ও দক্ষ উদ্যোগ দরকার।

এম আবু ইউসুফ আরো বলেন, চামড়া খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে আট হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ আছে। এই ঋণের বিপরীতে বছরে ৮০০ কোটি টাকা সুদ দিতে হয়। অনেক কারখানাই সময়মতো ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি। তাই এসব কারখানা করোনাকালে প্রণোদনা সুবিধা পায়নি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে এগোলে এ খাতের রফতানি আয় ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০০ কোটি থেকে ১ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। চামড়া খাতের ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে চামড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করেন তিনি।

অ্যাপেক্স ট্যানারির নির্বাহী পরিচালক এম এ মাজেদ বলেন, ‘সাভারের চামড়াশিল্প নগরে যত চামড়া প্রক্রিয়াজাত হয়, তার প্রায় অর্ধেকই করে অ্যাপেক্স, বে ও ঢাকা হাইডস,’ এই তিন ট্যানারি। তারা যদি আলাদা ইটিপি করে, তাহলেই সিইটিপির ওপর চাপ কমে যাবে। সে কারণে আমরা আবেদন করেছিলাম। যথাসময়ে অনুমোদন পেলে দেড় বছরের মধ্যে আমরা ইটিপি করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু নিত্যনতুন শর্ত দিয়ে আমাদের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।’

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ