ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ জিলকদ ১৪৪৩
বাজেট ভাবনা

সবকিছুর দাম কমার প্রত্যাশা শ্রমজীবী-দলিত সমাজের

প্রকাশনার সময়: ২৮ মে ২০২২, ০৯:২৩

আগামী ৯ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। আগামী এক বছরে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয় করবে। এর বেশির ভাগই ব্যয় করা হবে পরিবহন, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে। চরম মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে আসছে এই বাজেট। ফলে এবারের বাজেটে শ্রমজীবী ও সবচেয়ে নিচুতলার মানুষদের সংগঠনগুলো অনেক দাবি-দাওয়ার কথা জানাচ্ছে।

বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এক অংশ ‘দলিত সমাজ’। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার আনুমানিক হিসাবে এরা সংখ্যায় অর্ধকোটির কাছাকাছি। কেবল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে দলিতদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পরিচিতদের ২৭টি কলোনি আছে। এর বাইরে আছে রবিদাস, ঋষিসহ বহু সম্প্রদায়। প্রতিটি জেলায় এ রকম মানুষ আছে। পেশাগত বিবেচনায় এদের অবস্থান তিন ধরনের। বড় এক অংশ পরিচ্ছন্নতাকর্মী। আরেক দল চা-বাগানে কাজ করে। অপর এক গোষ্ঠী বেঁচে থাকার সংগ্রামে গ্রাম-শহর মিলে অপ্রাতিষ্ঠানিক নানান কাজ করে। এই জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এরই মধ্যে সরকারের কিছু উদ্যোগ আছে। এর মধ্যে একটা হলো হরিজন, বেদে ও হিজড়াদের নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তামূলক প্রকল্প। অন্যটা বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে তাদের জন্য বাসগৃহ নির্মাণ কর্মসূচি। ২০১১-১২ সালে বাসগৃহ তৈরি খাতে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে শেষোক্ত কাজ শুরু হয়। পরে এটা আরও সমপ্রসারিত হয়েছে। বরাদ্দও বেড়েছে। তাতে দলিত, অদলিত সব পরিচ্ছন্নতাকর্মী যুক্ত হয়েছে। ২০১২-১৩-তে ৬৬ লাখ টাকার মাধ্যমে সাত জেলায় দলিত, বেদে, হরিজন ও হিজড়াদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু হয়। বর্তমানে সেটা ৬৪ জেলাতেই চলছে। তবে ‘অনগ্রসর’ শিরোনামে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য চলে গেছে সেই বরাদ্দ। সর্বশেষ অর্থবছরে ৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল এ রকম ‘অনগ্রসর’দের জন্য। এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, দলিতদের দাবি-দাওয়ার ফলে যখনই কোনো প্রকল্প আসে, সেটা ধীরে ধীরে ‘অনগ্রসর’ সবার হয়ে যাচ্ছে। তাতে দলিতদের সংকটের সুরাহা আর হয় না। অথচ তাদের জন্য আলাদাভাবে আর্থিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মনোযোগ দরকার। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ‘অনগ্রসর’ শব্দের আড়ালে দলিতরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ফলে তাদের জন্য পৃথক বরাদ্দের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে কম।

কেমন বাজেট দেখতে চানু জানতে চাওয়া হয়েছিল রাজধানীর এক ফেরিওয়ালা শফিকুল ইসলামের কাছে। তিনি বলেন, ‘ফেরি করে পানি বিক্রি করি। আমার কথা হচ্ছে, সরকার যেন সব কিছুর দাম কমায় দেয়। গরিব মানুষ যেন খেয়ে-দেয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকতে পারে। আর এইডাই হলো সরকারের কাছে আমার আবদার। ‘আমাদের দেশে অনেক গরিব মানুষ আছে, যাদের কিছু কিনে খাওয়ার টাকাটাও নাই। সরকার একটু বিবেচনা করলে গরিব মানুষ খেয়ে-পরে দিন কাটাতে পারবে। ‘জিনিসপত্রের দাম কেবল বাড়ছেই। কেন এত দাম বাড়ছে জানি না। জিনিসের দাম নাগালের মধ্যে থাকা উচিত। সরকার এটা নিশ্চিত করতে পারলেই আমি খুশি।

‘সব কিছুর দাম ডাবল ডাবল হয়ে গেছে। তেলের দাম ২০০ টাকার উপরে। চাল ৭০-৭৫ টাকা কেজি। আমাদের মতো গরিব মানুষ খেয়ে না খেয়ে বাঁচতাছি। এই দুঃখ কার কাছে বলব? ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটাই আবদার: খেয়ে-পরে বাঁচার জন্য বাজেটে সব জিনিসের দাম যেন কমাইয়া দেয়। আমি পানি বিক্রি করি। পানের দাম বেড়ে গেলে পাবলিকের সঙ্গে ঝামেলা হবে। পাবলিক বেশি দাম নিয়ে ঝামেলা করবে। এইটা বিক্রি করে আমার পরিবার চালাই। তাই বাজেটে যেন আর দাম না বাড়ে।’

ঢাকার রিকশা চালক শাহিন বলেন, ‘সরকারের কাছে চাওয়া, নতুন বাজেটে জিনিসের দাম যেন না বাড়ে। ভাড়া কম। আমাদের ইনকাম কম। রোদের মধ্যে গাড়ি চালাইতে হয়। এত কষ্ট করে যদি জিনিসপত্র বেশি দামে কিনতে হয়, তাহলে আমরা চলব কীভাবে? ‘সরকারের কাছে আবেদন, নতুন বাজেটে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে নিত্যপণ্যের দাম কম থাকে। ‘চাল, ডাল, তেলের দাম অনেক বেশি। দিন আনি, দিন খাই। দাম বাড়ায় আমাদের অনেক কষ্ট হয়। দাম কম থাকলে আমরা চলতে পারি, খাইতে পারি।’

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশালে দলিতদের একাংশপরিচ্ছন্নতাকর্মীদের থাকার জন্য বেশ বড় এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। কিন্তু এ রকম উদ্যোগ দরকার দলিত-শ্রমজীবী সবার জন্য, সব জেলায়। কারণ, তাদের বড় অংশেরই প্রধান সমস্যা বাসস্থান।

এত দিন মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অস্থায়ী জায়গায় থাকতে বাধ্য করা হয়েছে দলিতদের। ভদ্রলোকদের বসতি থেকে দূরে কোথাও বাগিচায়, কোথাও রেলওয়ে বা সিটি করপোরেশনের জমিতে, সরকারি অফিস-আদালতের লাগোয়া জায়গায়, কোথাও জঙ্গলের একাংশে তারা থাকে। ২০১৪ সালে ২১টি জেলায় এই লেখকের নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৬০ ভাগ দলিতের মত্ততারা যেখানে বাস করে, সে জায়গার মালিক তারা নয়। এর মধ্যে ৫৫ ভাগ জানিয়েছে, তারা সব সময় উচ্ছেদুআতঙ্কে থাকে। যেখানে উচ্ছেদুআতঙ্ক নেই, সেখানেও পুরোনো খুপরির মতো ঘরে থাকতে হচ্ছে একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মকে। এ অবস্থা থেকে বাঁচাতে দলিতদের স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করে সেগুলো স্থায়ীভাবে তাদের নামে বরাদ্দ দেয়ার কর্মসূচি দরকার। বিভিন্ন সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য যেসব ভবন তৈরি করছে, সেখানে আপাতত চাকরি নেই, এমন দলিতদেরও থাকার সুযোগ প্রয়োজন।

দেশের অন্যান্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি দলিত শ্রমজীবীদের বাড়তি কিছু স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়তে হয় প্রতিনিয়ত। কম মজুরি ও মর্যাদাহীন জীবনের কারণে তারা এমন কিছু কাজ করে, যাতে পেশাগত ঝুঁকি বেশি। অনেক সময় মাস্ক, দস্তানা, গামবুট ইত্যাদি ছাড়া খালি হাতে ঝাড়ু দেয়াসহ নানান উপায়ে বর্জ্য পরিষ্কার করতে হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের। এতে তারা চর্মরোগ, শ্বাসনালির সমস্যা, পিঠের সমস্যা ইত্যাদিতে ভোগে। অথচ শ্রমিকদের সুরক্ষাসামগ্রী দেয়ার নীতিমালা আছে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে। চা-শ্রমিকরা অনেকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে কাজ করেন। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা উপকরণ ছাড়া কীটনাশক দিতে হয় অনেককে। এতেও স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েন তাঁরা। অনুসন্ধানকালে দলিতদের ৫৪ শতাংশ বলেছে, তাদের কাছাকাছি এলাকায় কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই। ২১ শতাংশ বলেছে, হাসপাতালে তারা সেবা পেতে গেলে বৈষম্যে পড়ে। এই বৈষম্যের বড় কারণ জাতপাত ও পেশাগত পরিচয়।

দলিতদের পেশাগত নিরাপত্তা বাড়াতে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মাধ্যমে তাদের কাছে পেশাগত সুরক্ষা উপকরণ পৌঁছানো দরকার। দলিতদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বাছাই করা কিছু এলাকায় বিশেষায়িত হাসপাতাল দরকার। দলিত কলোনি, পাড়া বা গ্রামগুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীসহ কমিউনিটি ক্লিনিক দেয়া যায় বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমছে এবং মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে এখন। কিন্তু যে গতিতে মূলধারার সমাজে এটা ঘটছে, সেভাবে ঘটছে না দলিত শ্রমজীবী পরিবারে। জাতীয় উন্নয়ন ধারার এই ভারসাম্যহীনতা কমাতে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দরকার। এ রকম কর্মসূচির কিছু ঐতিহ্য আগে দুুএক বছরের বাজেটে ছিল। সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে সব হতদরিদ্রকে কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।

নয়া শতাব্দী/এমআরএইচ

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ