ঢাকা, সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২১ শাওয়াল ১৪৪৩

মোবাইল ফোন হয়ে উঠছে ব্যাংকের বিকল্প

প্রকাশনার সময়: ১৪ মে ২০২২, ১০:২৫ | আপডেট: ১৪ মে ২০২২, ১০:৩০

দেশের সর্বস্তরের জনগণকে আর্থিক সেবার আওতায় নিয়ে আসাটা মস্তবড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সে চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ। নগদ, বিকাশ, রকেট, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং প্রভৃতির সুবাদে মাইক্রোফাইন্যান্স এখন অনেকটাই সহজ এবং সাফল্যময় হয়ে উঠেছে। দেশের বেশিরভাগ মানুষ ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে থাকায় তাদের পক্ষে আর্থিক লেনদেন বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) তাদের আর্থিক লেনদেনের চমৎকার সুযোগ এনে দিয়েছে। এর সুবাধে শুধুমাত্র টাকা জমা দেয়া কিংবা উত্তোলন অথবা অর্থ স্থানান্তর নয়, বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধ, ভর্তি ফি প্রদান, স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি জমাকরণ প্রভৃতি কাজ ব্যাংকে না গিয়ে ঘরে বসেই সম্পন্ন করতে পারছেন সবাই। এতে ব্যাংকে যাওয়া-আসার সময় বেঁচে যাচ্ছে, ব্যাংকে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের চাপ কমছে।

যাত্রা শুরুর ১০ বছরের মধ্যে সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের বড় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবাদাতা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান বিকাশ। নতুন করে ঋণ ও আমানতের মতো আর্থিক সেবা যুক্ত করে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। ফলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও এখন ঘরে বসেই টাকা লেনদেনের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসিতে আমানত জমা রাখতে ও সিটি ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিতে পারছে। বিকাশের অ্যাপসে সিটি ব্যাংকের ঋণ ও আইডিএলসির আমানত সেবা যুক্ত হওয়ায় অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এ জাতীয় সেবা দেয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। কারণ, আমানত ও ঋণই প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসা। আর সহজেই এ সেবা দেয়া গেলে খরচ কমবে। ফলে অধিকসংখ্যক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দ্রুত এই সেবার আওতায় আসবে।

এদিকে বিকাশসহ নগদ, রকেটের মতো এমএফএস প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরুর পর ব্যাংকে বর্তমানে ছোট অঙ্কের লেনদেন হয় না বললেই চলে। ব্যাংকগুলোও এখন এমএফএস-নির্ভর সেবার বিস্তৃতি ঘটাতে চাইছে। তবে এ প্রবণতাকে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দেশের আর্থিক লেনদেনের বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে হচ্ছে। তাই দ্রুতগতিতে সেবা ছড়িয়ে দিতে বিকাশের উদ্যোগটি ইতিবাচক। ২০১১ সালের ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমএফএস সেবা চালু করে বিকাশ। বর্তমানে বিকাশে ৫ কোটি ৮৫ লাখ নিবন্ধিত গ্রাহক রয়েছেন। তবে সক্রিয় আছেন অর্ধেক। এসব গ্রাহক এজেন্ট থেকে নিজের বিকাশ অ্যাপসে টাকা যুক্ত করতে পারছেন। আবার ২৯টি ব্যাংক এবং সব ব্যাংকের ভিসা ও মাস্টার কার্ড থেকেও টাকা যুক্ত করা যাচ্ছে। এসব টাকা যেকোনো বিকাশ হিসাবে পাঠানো যায়। সেই সঙ্গে আটটি ব্যাংকের হিসাবেও টাকা পাঠানো যাচ্ছে। বিকাশ হিসাবের টাকা এজেন্টের পাশাপাশি এখন ১৩টি ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকেও কম খরচে উত্তোলন করা যায়। বিকাশ দিয়ে যেকোনো মোবাইল অপারেটরে রিচার্জ ও প্যাকেজ কেনা যায়। পাশাপাশি পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করা যায়। গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের ইত্যাদি পরিষেবা বিলের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের বিল, স্কুলের বেতন, সরকারি মাশুলও পরিশোধ করা যায়। বিদেশ থেকে বিকাশ হিসাবে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ও আসে। এ ছাড়া ভ্রমণ টিকিট ক্রয়, বিমার প্রিমিয়ামও পরিশোধ করা যায়। পাশাপাশি বিকাশ অ্যাপসের মাধ্যমে এখন দুর্গত ব্যক্তিদের সহায়তাও করা যায়। ফলে বিকাশে এখন প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার কোটি, আর মাসে ৪৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।

বিকাশকে সব ধরনের আর্থিক সেবার একটি প্ল্যাটফর্ম বানানোর লাখ অনেকটাই পূর্ণ হয়ে গেছে। সামনে আরো অনেক প্রতিষ্ঠান বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হবে। সেবা ও সংযুক্তির পরিধি যত বাড়বে, তত মানুষ সেবায় যুক্ত হবেন। যারা বিকাশে যুক্ত, তারা এসব সেবা থেকে উপকৃত হবেন। সম্প্রতি নতুন করে বিকাশে যুক্ত হয়েছে সিটি ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ। ফলে ৯ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারছেন বিকাশ গ্রাহকরা। এর মাধ্যমে ১৫ হাজার গ্রাহক ইতোমধ্যে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন। তবে সেবাটি এখনো সব বিকাশ গ্রাহক পাচ্ছেন না। তবে সিটি ব্যাংক শিগগির তা সবার জন্য চালু করবে। ঋণের পাশাপাশি সঞ্চয়ী আমানত সেবাও চালু করেছে বিকাশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ সেবা চালু করা হয়েছে। নতুন এ সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই নথিপত্র জমা দেয়ার ঝামেলা ছাড়া মাত্র দুই মিনিটে আইডিএলসিতে বিভিন্ন মেয়াদি ও অঙ্কের সঞ্চয়ী হিসাব খোলা যাচ্ছে। এ সেবায় ইতোমধ্যে ৯০ হাজার গ্রাহক প্রায় ১৪ কোটি টাকা সঞ্চয় করেছেন। এসব গ্রাহকের মধ্যে ৬৪ শতাংশ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে, ২৫ শতাংশ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে, ৬ শতাংশ সঞ্চয় শিক্ষা খরচের চাহিদা মেটাতে এবং বাকি ৫ শতাংশ অন্যান্য উদ্দেশ্যে সঞ্চয় করছেন। ঋণ বিতরণ ও সঞ্চয়ী আমানত সেবা চালুর সুবাদে বিকাশ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

মুঠোফোনে আর্থিক সেবা (এমএফএস) চালুর মাত্র তিন বছরেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং কোটি কোটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে গেছে সরকারি-বেসরকারি খাতের উদ্যোগে চালু হওয়া আরেক এমএফএস সেবা ‘নগদ’। মাত্র কয়েক বছরেই প্রতিষ্ঠানটি এ বাজারে বেশ কিছু ক্ষেত্রে চমক দেখিয়েছে। ঘরে বসেই মুঠোফোনে সহজে হিসাব খোলা, কম খরচে দেশজুড়ে গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন সুবিধা দেয়া ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরব উপস্থিতি— এ তিন কারণেই মূলত অল্প দিনেই নগদ পৌঁছে গেছে কোটি কোটি গ্রাহকের হাতের মুঠোয়। প্রত্যন্ত জনপদ থেকে শুরু করে শহরের গলিপথ— সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে মুঠোফোনে আর্থিক লেনদেনের এ সেবা।

নগদের কার্যক্রম শুরুর তিন বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে সরকারি ডাক বিভাগ এবং বেসরকারি কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলে নগদ নামে নতুন এমএফএস সেবাটি চালু করে। ২০১৯ সালে ‘নগদ’ সার্ভিসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাত্র তিন বছরেই এ সেবার মাধ্যমে দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোটি কোটি গ্রাহক প্রতিদিন গড়ে ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন করছেন। দেশের প্রায় ২৭ হাজার প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম এখন নগদ।

শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার এজেন্ট সরাসরি যুক্ত নগদের সেবা কার্যক্রমে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকের সেবা ব্যবহার করেও নগদ হিসাবে টাকা আনা ও খরচ যাচ্ছে। শুরু থেকেই প্রচলিত আর্থিক সেবার পাশাপাশি গ্রাহকদের ইসলামিক লেনদেন সুবিধা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। মাত্র ৩৬ মাসে নগদ হয়ে উঠেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান।

বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নগদের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগ যুক্ত থাকায় সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও নগদ এখন বড় ভরসার নাম। নগদের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা থেকে শুরু করে সরকারি নানা ধরনের ভাতা পৌঁছে যাচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ঘরে।

মাত্র তিন বছরেই নগদের নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬ কোটির বেশি। অল্প সময়ে বিপুল গ্রাহক শ্রেণি তৈরি হওয়ায় এখন সেবার পরিধি বাড়ানোর নতুন নতুন পরিকল্পনা করছে নগদ কর্তৃপক্ষ। তারই অংশ হিসেবে চলতি বছরের মধ্যে ‘ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ঋণ’ কার্যক্রম শুরু করতে চায় নগদ। নতুন এ সেবা চালু হলে তা নগদের কার্যক্রমে আরো গতি সঞ্চার করবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ঋণসেবা চালু করা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে তারা। নতুন এ সেবা চালু করতে পারলে একদিকে গ্রামের কৃষাণিও যেমন সঞ্চয় করতে পারবেন, তেমনি ছোট দোকানদারেরা ৩৩ শতাংশের চড়া সুদ থেকে মুক্তি পাবেন।

শুরু থেকেই এটি ডিজিটাল কেওয়াইসির (গ্রাহকসম্পর্কিত তথ্য) মাধ্যমে হিসাব খোলার ব্যবস্থা করে। সরকারি ডাক বিভাগের সেবা হওয়ায় শুরু থেকে অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বাড়তি কিছু সুবিধা পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যার সুফল গ্রাহকরাও পেয়েছেন। এ কারণে অল্প সময়ে বিপুল গ্রাহক তৈরি হয় নগদের। এমএফএস প্রতিষ্ঠান হলেও নগদ এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। নগদসহ এমএফএস সেবাকে জনপ্রিয় করতে এরই মধ্যে ‘মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বিধিমালা ২০২২’ জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও এমএফএস সেবার কার্যক্রমের জন্য লাইসেন্স পাবে। নগদকে অনুমোদন দিতে কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। এদিকে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই দেশজুড়ে সেবা ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন ভাতা ও প্রণোদনা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে অনন্য ভূমিকা রাখছে নগদ। তিন বছরের পথচলায় সহজে গ্রাহক হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিকে প্রতিষ্ঠানটির সাফল্যের বড় ভিত্তি বলে মনে করা হচ্ছে।

দেশে মাত্র ৩০ শতাংশ গ্রাহক স্মার্টফোন ব্যবহার করে। তাই সবার ডিজিটাল হিসাব খোলার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় মুঠোফোন অপারেটরদের কাছে জমা দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হিসাব খোলার উদ্যোগ নেয় তারা। এদিকে শুরু থেকেই দেশের অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সেবা মাশুল বা আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে খরচ কম নিচ্ছে নগদ। ফলে নগদের প্রতি গ্রাহকের ঝোঁকও বেড়েছে বহুগুণ। প্রতিযোগিতার বাজারে গ্রাহক ধরতে তারা সেবা মাশুল কমিয়ে দিয়েছে, এক সেবা থেকে মুনাফা না হলেও অন্য সেবা থেকে আয় আছে। এ কারণে লোকসান হচ্ছে না। আবার তারা সেবা মাশুল কমানোর কারণে অন্যরাও কমিয়েছে। যার সুফল পাচ্ছেন এমএফএস গ্রাহকরা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এমএফএস সেবা চালুর অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা এবং এই সেবার খরচ কমানোর দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ প্রদান করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সব ধরনের আর্থিক সেবা বেশ এগিয়েছে। আমাদের দেশে এটি মাত্র শুরু হয়েছে। এসব সেবা চালুর আগে জনগণকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান সেবা দিচ্ছে, তারা কতটা ঝুঁকি বিবেচনা করে সেবাটি চালু করছে, তাও বিবেচনায় নিতে হবে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলামিস্ট

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ