ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর ২০২১, ৫ কার্তিক ১৪২৮

দামের খেলায় এলপিজি

প্রকাশনার সময়: ১১ অক্টোবর ২০২১, ০৪:৫২
ফাইল ছবি

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম নিয়ে ক্রেতাদের ভোগান্তির শেষ নেই। সময় ব্যবধানে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দাম। ধীরে ধীরে মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে এলপিজি। গত দুই মাসেই এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম বাড়িয়েছে দুইবার। এমনিতেও সারাদেশেই বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য এক থেকে দেড়শ’ টাকা বেশিতে কিনতে হচ্ছে। বাজারে নেই কারো কোনো নজরদারি। এরপরও বিইআরসির বারে বারে দাম বাড়ানো নিয়ে গ্রাহকের ভোগান্তি চরমে।

এদিকে আবারো দাম বাড়ানো হয়েছে এলপিজির। গতকাল রোববার বেসরকারি খাতে ১২ কেজির এলপিজির সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ বিইআরসি। ২২৬ টাকা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল থেকেই ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার পেতে খরচ হবে ১ হাজার ২৫৯ টাকা, যা আগে ছিল ১ হাজার ৩৩ টাকা। অন্যদিকে, গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে লিটারপ্রতি ৫৮ টাকা ৬৮ পয়সা, যা আগে ছিল ৫০ টাকা ৫৬ পয়সা। তবে উৎপাদন পর্যায়ে ব্যয় পরিবর্তন না হওয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির এলপিজি আগের দামেই থাকছে। সরকারি সাড়ে ১২ কেজি এলপিজি বিক্রি হবে ৫৯১ টাকায়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বেসরকারি খাতে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ছিল ৮৪২ টাকা। যা ৮ মাসে দাম বেড়েছে ৪১৭ টাকা।

গতকাল এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। গত ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো এলপিজির দাম নির্ধারণের পর থেকে প্রতি মাসেই তা সমন্বয় করা হচ্ছে।

এর আগে, বেসরকারি খাতে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজি মূসকসহ ৯৯৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৩ টাকা করা হয়। ১ আগস্ট আগের চেয়ে বাড়ানো হয় এলপিজির দাম। নতুন দাম ঘোষণা করে সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিল বলেন, বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম অনেক বেড়ে গেছে। সেটিকে ধরেই দেশে যথাযথভাবে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। অপারেটররা নিশ্চয়ই এটি কার্যকর করবেন।

অপরদিকে বিইআরসির সদস্য মকবুল ই ইলাহি বলেন, এক কেজি এলপিজির ব্যবহার মানে হলো ১৮ কেজি গাছ বাঁচানো। তাই এর ব্যবহার বাড়ানো দরকার। কম দামে এলপিজি আমদানি করতে হবে। প্রতিবেশী দেশ অনেক কম দামে এলপিজি আমদানি করছে। বাড়তি দামে না কেনার বিষয়ে ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসির সদস্য মোহম্মদ আবু ফারুক, মোহাম্মদ বজলুর রহমান, মো. কামরুজ্জামান প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন কমিশনের সচিব রুবিনা ফেরদৌসী।

গত বছরের ডিসেম্বরে বিইআরসিতে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করে এলপিজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। তাদের প্রস্তাব মূল্যায়ন করে বিইআরসি গঠিত কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। এরপর চলতি বছরের গত ১৪ জানুয়ারি এলপিজির দাম নির্ধারণ নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি। এরপর ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে নতুন করে ফের গত মাসে গণশুনানি করে কমিশন।

জানা যায়, এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করেছে বিইআরসি।

গত ৩১ আগস্ট ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১০৩৩ টাকা এবং সাড়ে ১২ কেজির দাম ১০৭৬ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। কিন্তু ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে খুচরা বিক্রেতারাই কিনছেন কমিশনের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে ১২০-১৪০ টাকা বেশি দিয়ে। যার কারণে গ্রাহককে প্রতি সিলিন্ডারে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ২৭০ টাকা পর্যন্ত। রাজধানীর একজন এলপিজি ব্যবসায়ী জানান, তিনি প্রতি সিলিন্ডার এলপিজি কোম্পানি ভেদে ১২৫০ থেকে ১৩০০ টাকায় বিক্রি করছেন।

বিইআরসির দেয়া দাম থেকে কেন ২৭০ টাকা বেশি নিচ্ছে জানতে চাইলে ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিইআরসি গ্রাহকের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ঠিক করেছে ১০৩৩ টাকা। আর আমি ডিলারদের কাছ থেকে পাইকারি কিনছি ১১৮০ টাকায়। বিইআরসি গ্রাহকের জন্য যে দাম ঠিক করে দিল, আমিই কিনছি তারচেয়ে ১৪৭ টাকা বেশি দিয়ে। এরপর দোকান ভাড়া, পরিবহন, কর্মচারীর বেতন ও মুনাফা রয়েছে। সিলিন্ডার প্রতি লাভ করছি ৭০ টাকা। এ হিসাবে খুচরা বিক্রেতাদের লাভ হচ্ছে মাত্র ৬ শতাংশ।

ওই ব্যবসায়ী আরো বলেন, ‘কোম্পানিগুলো দাম না কমালে আমাদের ওপর চাপ দিয়ে লাভ নেই।’ গত ৩১ আগস্ট সৌদি এরামকো প্রোপ্রেন ৬৬০ এবং বিউটেন ৬৫৫ মার্কিন ডলার হিসাব করে কমিশন এলপিজির দর নির্ধারণ করে। এতে এলপিজির গড় দাম পড়ে ৬৫৬ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলার। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে প্রোপেন বিউটেনকে ৩৫:৬৫ অনুপাতে মিশ্রিত করে এলপিজি তৈরি করা হয়। এর মধ্যে বিইআরসি গতকাল ফের এলপিজির দাম নির্ধারণ করেছে। যদিও গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত যতবারই সরকারিভাবে দাম ঘোষণা হয়েছে তার একটিও মানেননি ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে কমিশনের এক সদস্য বলেন, এখন গ্রাহকদের এই বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তারা অন্তত বলে আসুক কমিশনের দামের চেয়ে বেশি দাম নিচ্ছেন কেন। এতে কাজ হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন্তত প্রতিবাদটুকু হোক।’ প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকের। রিয়াজুল ইসলাম নামের এক গ্রাহক বলেন, প্রতিবাদ করে কোনো লাভ হয়নি।

বাড়তি দামেই কিনতে হয়েছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে গ্যাস পাচ্ছিলাম না বলে তিনি জানান। বিভাগীয় শহরগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামে এ মাসে পেট্রোম্যাক্স কোম্পানির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়, বসুন্ধরার সিলিন্ডার ১২৫০ টাকা, এনার্জিপ্যাকের ১২০০ টাকা, বেক্সিমকোর ১২৫০ এবং টোটাল গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৩০০ টাকায়।

বরিশালের বাংলা বাজার, নতুন বাজার, সাগরদী, চৌমাথা ও বড় বাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন মুদি দোকানে ১২ কেজির এলপিজি গ্যাসের দাম- বসুন্ধরার ১২০০ টাকা, ক্লিনহিট ১১৭০ টাকা, টোটাল গ্যাস ১২২০ টাকা, যমুনা ১২০০ টাকা এবং ফ্রেশের সিলিন্ডার ১১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে খুলনা এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতির তোবারক হোসেন তপু জানান, খুলনার খুচরা ব্যবসায়ীরা ১২২০ টাকা থেকে ১২৫০ টাকায় সব ধরনের গ্যাসের ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। তারা পাইকারি কিনছেন ১১৫০ থেকে ১১৮৬ টাকায়। সরকারি গ্যাস খুলনায় ঠিকমতো না আসায় বেসরকারি গ্যাসের দাম বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন