ঢাকা | সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮

নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানেও খেলাপি থাবা

আহমেদ ফেরদাউস খান

প্রকাশনার সময়

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৪৪

আপডেট

০৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৫০

খেলাপি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বেকায়দায় ব্যাংকিং খাত। একই সমস্যা এখন নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও। দেশের ১০ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন বড় খেলাপি। এই ১০ প্রতিষ্ঠানেরই খেলাপির পরিমাণ এখন ৫ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। তদারিকতে ঘাটতি এবং বড় অনিয়মের কারণে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপিঋণ বেড়েছে। এতে সংকটের মুখে পড়েছে এ খাত। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা দশটি প্রতিষ্ঠান এককভাবে সেক্টরের মোট ৮১ শতাংশের খেলাপির কারণ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচনায় বেশি এসেছে মাইডাস ফাইন্যান্স। যাদের তিন মাসেই খেলাপি বেড়েছে ২১ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তামানে দেশের ৩৪টি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০ প্রতিষ্ঠানেরই খেলাপিঋণ মোট সেক্টরের ৮১.২৪ শতাংশ। সেই ১০ নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো- বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড-বিআইএফসি, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ফাস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড-আইআইডিএফসি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, মাইডাস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, উত্তরা ফাইন্যান্স এবং ফার্স্ট ফাইন্যান্স।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই ১০ নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫-৬টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা শোচনীয়। তাদের আর্থিক অবস্থার জন্য পুরো খাত এখন সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ফারইস্ট ফইন্যান্সের ৪৭৫.৭১ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ৫০.৫৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের খেলাপিঋণের পরিমাণ ৭৭২.০৩ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ৯৪.৭৮ শতাংশ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩৫৪.৭৩ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ২৪.৪৪ শতাংশ। ফাস ফাইন্যান্সের এক হাজার ৬৯১.৪৬ কোটি টাকা, যা ঋণের ৮৭.৯২ শতাংশ। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের দুই হাজার ৯৯৯.৩১ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ৭৪.৫৬ শতাংশ। এছাড়া প্রিমিয়ার লিজিংয়ের খেলাপিঋণের পরিমাণ ৬৩১.৩৬ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ৪৮.৫৮ শতাংশ। ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ২৭৬.৫১ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ৩১.২৫ শতাংশ।

আর মাইডাস ফাইন্যান্সের খেলাপিঋণের পরিমাণ ৩০২.০৭ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ৩১.২২ শতাংশ। উত্তরা ফাইন্যান্সের ৪১৮.৯১ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ১৫.৩৩ শতাংশ। আভিভা ফাইন্যান্সের ৪৮৯.৮৮ কোটি টাকা, যা তার ঋণের ১৬.১৩ শতাংশ।

এর আগে ২০১৯ সালের জুনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পিপলস লিজিং বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। কারণ এই নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারী অর্থের জমার মেয়াদ পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি আমানতকারীদের অর্থ রক্ষার জন্য সংকটে থাকা পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনার লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন করেছে হাইকোর্ট।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম সারোয়ার ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানের খেলাপিঋণের হার বাড়ছে কারণ আমরা এখনো খেলাপি গ্রাহকদের ঋণ পুনর্তফসিলে ইতিবাচক সাড়া দেইনি। আমরা খেলাপিঋণগুলো উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি বলেও জানান তিনি।

গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে ভালো সাড়া পাচ্ছি। এ বছরের মধ্যে খেলাপিঋণের পরিমাণ কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন গোলাম সারোয়ার ভূঁইয়া। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ব্যাংক আমাদের প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঋণ অধিগ্রহণ করেছে। সেজন্য খেলাপিঋণের হার বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বড় শিল্প মালিকদের পকেট প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং কঠোর তদারকি প্রতিষ্ঠার জন্য এ খাতে আরো কিছু নিয়ম -কানুন চালু করা দরকার। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এ খাতকে আরো কঠোর তদারকির মধ্যে আনতে হবে বলেও জানান সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। সাবেক এ গভর্নর বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কম নজরদারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্তে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করেছে ব্যাংলাদেশ ব্যাংক। তিনি আরো বলেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ছাড়াও খারাপ ঘটনার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে যারা দায়িত্বে ছিলেন, তাদের ভূমিকাও কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। কমিটির তদন্ত এখনো চলছে।

বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানি অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সহ-সভাপতি মো. গোলাম সারোয়ার ভুঁইয়া বলেন, তিন-চারটি নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এ খাত বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এজন্য পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনছে সরকার। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত কিছু নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খারাপ অবস্থার এ খাতে খেলাপিঋণ ৪৭.১৮ শতাংশ বেড়েছে।

এদিকে, বিএলএফসিএর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে কিছু নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এ খাত সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এ খাতের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে চার বা পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ বা সংস্কার করা উচিত বলে জানান আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল। নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ইতিবাচক বলেও জানান তিনি।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x