ঢাকা, সোমবার, ৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

চেচুয়া বিলে শাপলার হাসি

প্রকাশনার সময়: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:৩৭

ময়মনসিংহ শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ত্রিশাল উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে বিশাল চেচুয়া বিল যা বর্তমানে শাপলা বিল নামেই পরিচিত। এই বিলে অপরুপ সৌন্দর্যের শোভা ছড়াচ্ছে জাতীয় ফুল ‘শাপলা’। প্রায় ৫০ একরের এই চেচুয়া বিলে শাপলার সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য প্রতিদিন ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। এতে আয়-রোজগার বেড়েছে স্থানীয়দেরও।

ত্রিশালে শাপলা ফুলের রক্তিম আভায় সেজেছে চেচুয়া বিল। তাই এ শাপলা বিলকে ঘিরে দর্শনার্থীদের ঘোরার জন্য স্থানীয়রা ১৩টি নৌকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। আবার বিলের মধ্যে বিশ্রামের জন্য বানিয়েছেন ঘর। ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে নৌকা। তবে কিছুদিন ধরে এ

নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।

অভিযোগ উঠেছে, এই বিলকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছে স্থানীয়রা। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নৌকায় একজনের ২০ মিনিট ঘুরার জন্য গোনতে হচ্ছে ৫০ টাকা। আবার নৌকা এক ঘণ্টার জন্য ৪ জন ভাড়া করলে জোরপূর্বকভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে ৪০০ শত টাকা। এ বিলের মাঝেখানে বিশ্রামের জন্য একটি ঘর বানানো হয়েছে। ঘরের সামনে একটি ব্যানার টাঙানো রয়েছে। ব্যানারে স্পষ্টভাবে লেখা আছে কত মিনিট থেকে কত মিনিট থাকলে কত টাকা দিতে হবে। সেখানে প্রবেশ করলে ৫/১০ মিনিটেই হাতিয়ে নিচ্ছে ২০ টাকা। সচেতন মহল মনে করেন, তাহলে এখানে প্রশ্ন থেকে গেল যে সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ হয় কী না?

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দর্শনার্থী রাজিব রাজ, গোলাম মোর্তুজা সরকার ও জনপ্রিয় স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন ত্রিশাল হেল্পলাইনের সম্পাদক রিয়াদ বলেন, আমাদের ত্রিশালে শাপলা ফুলের সৌন্দর্যের জন্য আরেক নাম চেচুয়া বিল। বর্তমানে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে টুরিস্ট গ্রুপ হয়ে এই সৌন্দর্য দেখতে আসছে এই চেচুয়া বিলে। তবে কিছু অসাধু নৌকাওলা বা মাঝি তারা মিলে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছে এবং এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা বিভিন্নভাবে পর্যটকদের কাছ থেকে ২০ মিনিট নৌকা দিয়ে বিলের মাঝখানে নিয়ে যাবে আবার নিয়ে আসবে ভাড়া ৫০ টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে জোরপূর্বক।

দর্শনার্থী রিক্তা আবেদীন বলেন, আমরা নৌকায় দুইজন করে উঠেছিলাম। ৩০ মিনিট আমাদের নৌকায় ঘুরিয়ে জোরপূর্বক ২০০ টাকা করে রেখেছে। চেচুয়া বিলে এখন শাপলার হাসি। বিলের চারদিকে সবুজ আর মাঝখানে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত লাল শাপলায় ঘেরা। এ যেন জাতীয় পতাকার প্রাকৃতিক রুপ। বিলের মাঝে মনে হয় লাল গালিচা পাতা। এই অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে প্রতিদিন কাক ডাকা ভোর থেকেই ছুটে আসছে নানা বয়সের দর্শনার্থী। প্রিয় মূহূর্তগুলোকে স্মৃতি করে রাখছেন দর্শনার্থীরা।

২০১৮ সালে চেচুয়া বিল নিয়ে সারাদেশে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বিলের পানি ও মাটিতে সর্ব রোগের ঔষধ হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে এ বিল পরিচিত হয় গুজবের বিল নামে। সর্ব রোগের ওষুধ জেনে হাজারও লোকের ভিড় জমেছিল যে বিলে সে বিলেই দেখা মিলে রক্তিম লাল শাপলা। এ বিলে লাল, সাদা, হলুদ, বেগুনী রংয়ের লাখো শাপলা দেখতে সূর্য উদয় থেকে শুরু করে সুর্যাস্ত পর্যন্ত মানুষের ঢল নামে। বিলকে ঘিরে ভ্রমণ পিপাসুদের আনাগোনা, আনন্দ-উল্লাস ও মানুষের ঢলের জন্য অঘোষিত পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ শাপলা বিলের সৌন্দর্য্য দেখতে ভিড় জমান। সাথে ভাসমান কচু ফুলের সাদা আভা সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুন।

ময়মনসিংহ শহর থেকে ঘুড়তে আসা কুয়াশা-মৌ দম্পত্তি বলেন, আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও অনেকের কাছে শুনে শাপলার সৌন্দর্য দেখতে আসছি। নৌকা দিয়ে পুরো বিলটা ঘুরে দেখে অনেক আনন্দ লাগছে। বাচ্চারাও বায়না ধরেছিল এখানে এসে কাছ থেকে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছি। এ এলাকাটিকে পর্যটন এলাকা হিসাবে ঘোষণা করা যেতে পারে।

দর্শনার্থী তৌকির আহম্মেদ বলেন, মনোরম পরিবেশে শাপলা ফুল দেখে খুব ভালো লাগছে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখে আমি ও আমার বন্ধুরা ঢাকা সাভার থেকে আসছি। এই শাপলা বিলে এসে দেখি ছবিতে যতটা সুন্দর,বাস্তবে তার থেকেও বেশি সুন্দর। আমরা মনে করি সকলের এ সৌন্দর্য্য উপভোগ করা প্রয়োজন।

সারাদেশের মানুষ এ বিলকে চিনেছে একটি অলৌকিক ঘটনার গুজবকে কেন্দ্র করে। একদিন রাত পেরিয়ে সকাল হতেই কিছু লোক দেখতে পায় সেখানে থাকা জমাট বাধা কচু হঠাৎ সরে গিয়ে অনেকটা জায়গা ফাঁকা হয়েছে। এটাকে অলৌকিক ভেবে কয়েকজন এখানে গোসল করে ও এর পানি খেয়ে রোগ থেকে মুক্ত হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের হাজার হাজার মানুষ এই কাঁদা মাখা পথ পেরিয়ে কাঁদা মাখা পানিতে গোসল, গড়াগড়ি ও কাদাযুক্ত পানি সংগ্রহ করতে ভিড় করতে থাকে।

এমন গুজবও ছড়ানো হয়েছিল বিলের পানিতে এক ডুবেই সেরে যাবে যেকোনো রোগ। এখানকার মাটি ও পানি নাকি সর্বরোগের ওষুধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবে হাজারো মানুষের তথাকথিত তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছিল এ চেচুয়া বিল। ঐসময় উপজেলা প্রশাসন, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে চেচুয়া বিলের পানি, মাটি, কচুরিপানা ব্যবহার না করার জন্য প্রথমে মাইকে আহবান জানান।

বিলটিতে যেন সারা বছর শাপলা ফুল থাকে তার সৌন্দর্য রক্ষায় বিলে ফুল তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে সারা বছর মানুষ শাপলা সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারবে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্থান করে নিবে।

দর্শনার্থীদের নিয়মানুবর্তিতায় হয়তো এভাবেই প্রতি বছর বিলটি হয়ে উঠবে একটি সৌন্দর্যপূর্ণ স্থান হিসেবে, যা ত্রিশাল উপজেলার নতুন দর্শনীয় স্থানের সূচনা করবে। ফুলের বাহারি সৌন্দর্য্য দেখতে হলে ছুটে আসুন ত্রিশালে।

নয়াশতাব্দী/জেডআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ