ঢাকা, শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশখালীর ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প 

প্রকাশনার সময়: ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:০৯ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২২, ১৩:১৯

একটা সময় বাঁশখালীর মৃৎশিল্পের নাম-ডাক ছিল বেশ। নান্দনিক কারুকার্য ও বাহারি নকশার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাহিদাও ছিল ব্যাপক। প্রতিটি ঘরে ঘরে ছিল মৃৎশিল্পের তৈরি আসবাবপত্র। এই মৃৎশিল্পে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত অসংখ্য কুমার-কুমারী। অথচ কালের বিবর্তনে, শিল্পায়নের যুগে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রাম বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি আজ বিলুপ্তির পথে।

বর্তমানের আধুনিক বাজারে এই শিল্পের যথেষ্ট চাহিদা না থাকা, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত মাটির মূল্য বৃদ্ধি, কাজে নতুনত্বের অভাব, আয়ের সঙ্গে ব্যয় বেশি হওয়া, পর্যাপ্ত কাঁচামালের অভাব ও উৎপাদিত সামগ্রী পরিবহনে নানা সমস্যার কারনে আজ গ্রাম বাংলার বহু বছরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটি হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু কি তাই? বর্তমানের আধুনিক বাজারে প্লাস্টিক, স্টিল, ম্যালামাইন, সিরামিক ও সিলভারসহ বিভিন্ন সহজলভ্য ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি করা তৈজসপত্রের নানাবিধ সুবিধার কারণে দিন দিন আবেদন হারাচ্ছে মাটির তৈরি এই মৃৎশিল্প।

এক সময় এই উপজেলা মৃৎশিল্পের জন্য বেশ সুপ্রসিদ্ধ ছিল। উপজেলার পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালিপুর, বৈলছড়ি জলদী, শিলকূপ, চাম্বল, ও পুইছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল অসংখ্য মৃৎশিল্পীদের বাসস্থান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকার এসে ভিড় জমাত এই গ্রামগুলোতে। বাসন-কোসন, সরা, সুরাই, হাঁড়ি-পাতিল, পেয়ালা, মটকা, ব্যাংক, থালা, বাটি, ফুলের টব, কলসি, পিঠা তৈরির ছাঁচসহ নিত্য প্রয়োজনীয় এসব জিনিসের চাহিদাও ছিল আকাশচুম্বী। তখন এই শিল্পের অসংখ্য কারিগররাও ছিল বেশ ব্যস্ত। অথচ কালের বিবর্তনে এখন গ্রামগুলোতে শুধু মাত্র ১০-থেকে ১২টি পরিবার এই পেশায় কাজ করে কোনমতে জীবিকা নির্বাহ করে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালিপুর, বৈলছড়ি, জলদি, চাম্বল, শিলকুপ, পুকুরিয়া ও পুইছড়ি সহ বিভিন্ন এলাকায় এ পেশার সাথে সম্পৃক্ত কয়েকশ' মৃৎশিল্পীর পরিবার এখন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। বেচাবিক্রি ও পণ্যের চাহিদা না থাকায় তাদের হাতে কোনো কাজ নাই। এসব মাটির তৈরি জিনিসগুলো বিক্রি না হওয়ায় বাঁশখালীর ঐতিহ্যবাহী কুমারপাড়াও এখন অনেকটা নীরব। উপজেলার কয়েকশ' মৃৎশিল্পীর পরিবার এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেউ কেউ আবার বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশা বেঁচে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

বাঁশখালী উপজেলার কালিপুরের কুমার পাড়ার হরিপদ রুদ্র বলেন, ‘একটা সময় আমরা পাঁচ ভাই সহ পরিবারের ১৪ জন সদস্য এই মৃৎশিল্পের সাথে যুক্ত ছিলাম। তখন এই শিল্পের চাহিদাও ছিল ব্যাপক। কিন্তু বর্তমান বাজারে এই পণ্যগুলোর চাহিদা না থাকা এবং আয়ের চেয়ে খরচ বেশি হয়ে যাওয়ায় আমরা অন্য পেশা বেঁচে নিতে বাধ্য হয়েছি। শুধু আমরা নই, আমাদের পাড়া সবাই এখন অন্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ জীবনযাপন করে।’

সাধনপুর রুদ্র পাড়ার বিশ্বনাথ রৌদ্র বলেন, ‘মৃৎশিল্প আমাদের গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের একটি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির সাথে আমি আমার জীবনের ৬১ বছর ধরে জড়িত। এই পেশা আমার বাপ-দাদার ঐতিহ্যের পেশা। এখনো আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য কে ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। বর্তমানে আমরা ৩ ভাই সহ আমাদের এলাকার ২-৩ টি পরিবার এই মাটির শিল্পে কাজ করে কোনমতে সংসার চালায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই মৃৎশিল্পের প্রধান কাঁচামাল এটেল মাটি। এই মাটি এখন সহজে পাওয়া যায় না। গভীর জঙ্গল বা পাহাড় অঞ্চলের ৬০-৭০ ফুট গভীর গিয়ে সেখান থেকে অনেক কষ্টে এই মাটি সংগ্রহ করতে হয়। পরিবহন খরচও আগের তুলনায় অনেক বেশি। কাজ শেষে হিসেব করে দেখা যায় আয়ের চেয়ে ব্যায় হয় বেশি। বাজারে এই পণ্যের চাহিদা না থাকা, পর্যাপ্ত কাচাঁমালের অভাব এবং পরিবহন সমস্যার কারনে বাপ-দাদার ঐতিহ্যের এই পেশাটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছি।’

বাঁশখালী কুমার পাড়া এলাকার ইউপি সদস্য সানন্দ রুদ্র জানান, ‘একটা সময় এই শিল্পের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কাজও ছিল বেশি। আমার ওয়ার্ডের শতাধিক পরিবার এই পেশার সাথে জড়িত ছিল। বর্তমান আধুনিকতার ছোঁয়ায়, শিল্পায়নের এই যুগে তাদের কাজের সেই জৌলুস ও ব্যস্ততা এখন আর নেই। বাঁচার তাগিদে অনেকেই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। বেঁচে নিয়েছেন অন্য পেশা। অনেকে আবার এই পেশায় কাজ করে কোনমতে জীবিক নির্বাহ করে।’

পুকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসহাব উদ্দীন বলেন, ‘অতীতে আমার গ্রামে কয়েকশ’ পরিবার এই পেশার সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু বর্তমান বাজারে প্লাস্টিক ও অন্যন্য জিনিসপত্র বের হওয়ার কারণে এসব মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় এই পেশা বিলুপ্তির মুখে। তা ছাড়া করোনার কারনে দীর্ঘ সময় ধরে কোনো ধরনের মেলা বা সামাজিক অনুষ্ঠান না হওয়ার ফলে মৃৎশিল্পীরা পরিবার নিয়ে আর্থিক সঙ্কটে দিন কাটচ্ছেন। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এ পেশার শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে এখনই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করি। দেশের বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করে মাটির জিনিসপত্রের প্রয়োজনীয়তা জনসাধারণের কাছে তুলে ধরা দরকার। তা না হলে মৃৎশিল্পীদের স্থান হবে শুধুই বইয়ের পাতায়।’

নয়া শতাব্দী/এম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ