ঢাকা | সোমবার ২ আগস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮, ২২ জিলহজ ১৪৪২

হাওরপারের জীবনযাত্রা

প্রকাশনার সময়: ১৩ জুলাই ২০২১, ১৫:৪৪ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২১, ১৬:১২

হাওর! অপূর্ব সুন্দর এক জনপদ। শুকনো মৌসুমে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি, ধূলোউড়া মেঠোপথ, রুপালী নদী।

আর বর্ষায়? এই রুপোলি নদীগুলোই ফুঁসে উঠে। দুই তীর ছাপিয়ে প্লাবিত করে ফসলি মাঠ। দেখতে একেবারে সাগরের মতো। হাওরে বর্ষা থাকে বছরের প্রায় ছয় মাস। পানি আসতে শুরু করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে। শেষ হয় আশ্বিন-কার্তিকে।

বাকি মাস এখানে শুকনো কাল। সে হিসেবে মূলত হাওরে ঋতু দুটি। একটি বর্ষা, অন্যটি ‘শুকনো’। কথিত আছে, বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি বড় অংশ এক সময় ‘কালীদহ সাগর’ নামে বিশাল জলরাশিতে নিমজ্জিত ছিল।

পরবর্তীতে ভূপ্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে তা পিরিচ আকৃতির নিম্ন সমতলভূমিতে পরিণত হয়, এই সমতলভূমিই এখন হাওর। হাওর শব্দটিও সাগর শব্দের অপভ্রংশ। সাগর থেকে সায়র, সায়র থেকে হাওর।

হাওরের জীবন

ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, ভৈরব, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, কটিয়াদি, নিকলী, কিশোরগঞ্জ সদর, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর, করিমগঞ্জ, তাড়াইলসহ মোট ১৩টি উপজেলায় হাওরের সংখ্যা ৯৭টি।

বর্ষাকাল জুড়ে হাওরের পানিকে সাগর বলে মনে হয় এবং এর মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলোকে দ্বীপ বলে প্রতীয়মান হয়। ভৌগোলিক কারণেই হাওর অঞ্চলের জীবনযাত্রা ভিন্ন। প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা এই অঞ্চলের মানুষদের একটু ভিন্নভাবে পরিচিতি দেয়।

মূলত দুই ধরনের পেশার ওপর হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবিকা চালিত হয়। সেটা হলো কৃষি এবং মৎস্য আহরণ। দুটি পেশার সাথে এই অঞ্চলের নারী-পুরুষের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বেঁচে থাকার তাগিদে ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই সবার শ্রম দিতে হয়। সামাজিক প্রথার কারণে গৃহস্থলির সার্বিক কাজটা সামলে নিয়ে নারীরাও কৃষিকাজে শ্রম দেয়।

হাওরের নারী শ্রমিক একাধারে একজন গৃহিণী এবং কৃষাণীও। মাঠে ধান আর গলায় গান বৈশাখ মাসে হাওর অঞ্চলে এ যেন এক অভাবনীয় দৃশ্য। বছরের পরিক্রমায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওর অঞ্চল এক অনিশ্চয়তা আর হতাশার নাম। মাঝে-মাঝে হাওরের প্রকৃতি অবশ্য ভয়াবহ রূপ নেয়। বাতাস ছুটলে হাওরের পানিতে ঢেউ ওঠে। এসময় চলাচলকারী নৌকাগুলোকে তীরে এসে আশ্রয় নিতে হয়। না হয় হিজল গাছের সাথে বেঁধে রাখতে হয়।

বাতাস দীর্ঘস্থায়ী হলে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে গ্রামগুলোর ওপর। এ সময় বাড়িঘর ভাঙতে থাকে। হাওরের লোকেরা এ দুর্যোগকে বলে ‘আফাল’। এই ‘আফাল’ থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য রীতিমতো লড়াই করতে হয় হাওরবাসীকে। ভাঙন প্রতিরোধে বাঁশ, কচুরিপানা ও বিভিন্ন প্রকার জলজ উদ্ভিদ দিয়ে বাড়ির চারপাশে নির্মাণ করতে হয় শক্ত বাঁধ।

স্থানীয় ভাষায় এটাকে বলে ‘ঘায়েল’। রাত জেগে ‘ঘায়েল’ পাহারা দেয় গ্রামবাসী। এখন অনেক গ্রামেই সরকারিভাবে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। ‘হাওর এলাকায় আগাম ওতপ্রোতভাবে প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্প’, ‘হাওর এলাকায় বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন প্রকল্প’ এর মাধ্যমে সরকার কাজ করে যাচ্ছে যা প্রশংসনীয়। এছাড়াও নদী শাসন ও হাওরের জীবনযাত্রা কথা বিবেচনা করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলার খাদ্য গুদাম হাওর

হাওরের মাটি পলিগঠিত বিধায় খুবই উর্বর এবং প্রচুর ধান জন্মে। ধানই অত্র এলাকায় একমাত্র ফসল। হাওরাঞ্চলকে বাংলাদেশের খাদ্য গুদামও বলা হয়ে থাকে। এ অঞ্চলের ৭০% মানুষ কৃষিজীবী। ধবধবে সাদা কাশফুল, চারদিকে শুধু মাঠ, আকাঁবাঁকা সরুপথ, গরুগুলো দুর্বা ঘাস চিবুচ্ছে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে। কৃষকের কলরবে সারা মাঠ মুখরিত হয়ে উঠে। পৌষ, মাঘ মাসে শীতের পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায় কৃষকের ঘরে। মাঠগুলো তখন সরিষা ফুলের হলুদ রঙে রঙিন হয়ে উঠে। উপরে আকাশ নীল, নিচে হলুদের ছড়াছড়ি। বসন্তে সবুজ হতে শুরু করে বৃক্ষরাজি ও তরুলতা। তখন কোকিলের ডাকে জাগিয়ে তুলে বসন্তের আগমনীর বার্তা। কী যে অপরূপ দৃশ্য তা লিখে প্রকাশ করা যায় না।

বৈশাখ মাসে পাকা ধানের সোনালি রঙে সারা মাঠ সোনালি আকার ধারণ করে। কৃষাণ কৃষানিরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে শুধু কাজ আর কাজ করে চলে দিন ভর। তবে চৈত্র মাসে আগাম পাহাড়ি ঢালে হাওরে বছরের একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সব সময় কৃষকদের তাড়া করে। ফাল্গুন মাসে কিশোরগঞ্জের হাওরসমূহে পানির জন্য হাহাকার দেখা দেয় প্রায়ই।

চারদিকে খাল বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। এঁটেল এবং দো-আঁশ মাটির এসব এলাকায় মাটি ফেটে ধানক্ষেতে গর্তের সৃষ্টি হয়। খাল এবং বিলে পানি না থাকার কারণে বিপাকে পড়েন জেলার ইটনা, মিঠাইমন, অষ্টগ্রাম, বাজিতপুর, নিকলী উপজেলার কৃষক পরিবার।

পাশাপাশি ইঁদুর কেটে সাবাড় করে উঠতি ধানের গোছা। অধিকাংশ নদ-নদীতে পলি পড়ে নাব্যতা হারিয়ে গেছে, কোন কোন স্থানে চর জেগে ওঠেছে। ফলে বর্ষা মৌসুম ছাড়া নদীগুলো নৌপথের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

তেমনি নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বোরো মৌসুমে বেশিরভাগ নদ-নদীর অংশ খাল-বিল কার্যত পানি সেচে কৃষকদের ফসল উৎপাদনে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না। অনেকের বোরো জমি থাকলেও সেচের অভাবে বছরের পর বছর অনাবাদি রাখতে বাধ্য হয়। সেচের অভাবে প্রতিবছর ৫-৬শত একর ফসলি জমি এ হাওরে অনাবাদি থেকে যায়।

হাওরের কৃষকরা তাদের ফসল নিয়ে যে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন তাতে ভারসাম্য আনতে বোরো ধান রক্ষা করা এবং ভাঙনের তান্ডবে বিলীন হয়ে যাওয়া গ্রামগুলো পুনরুদ্ধারকল্পে ‘কালনী-কুশিয়ারা প্রকল্প’ হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক কাজ বাস্তবায়ন হলে হাওরবাসীর নৌ-পথে যোগাযোগসহ বোরো জমিতে সেচের সমস্যা দূর হবে।

হাওরের মৎস্য সম্পদ

দেশের বৃহত্তম মৎস্য ভান্ডার কিশোরগঞ্জের হাওর। প্রচুর জলাশয় থাকার ফলে অনেক মাছ উৎপন্ন হয়। প্রচুর শামুক ঝিনুকও উৎপন্ন হয় হাওরাঞ্চলে। যা প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। ঝড় নাই বৃষ্টি নাই জীবনের মায়া উপেক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে জেলেরা বেরিয়ে পড়ে মৎস্য শিকারে। কেউবা ডিঙি নৌকা নিয়ে কেউ ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে। ভয় নেই ভীতি নেই তাদের শুধু একটা চিন্তা মাছ শিকার। অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেক সময় হাওরের কাঁচা ও আধা পাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়।

তখন ধান পচে পানি দূষিত হয়ে পড়লে সাধারণ কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেসময় হাওরের মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী মারা যায়। মড়ক ঠেকাতে কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

হাওরে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা ও তীরবর্তী মানুষের দাবি, হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য অভয়াশ্রমের সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তাতে হাওর তীরের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের পাশাপাশি গোটা দেশের মানুষের মাছের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হবে হাওরের মাছ। তবে তার আগে হাওর খেকো অসাধুচক্রের হাত থেকে মুক্ত করতে হবে হাওর। মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের জন্য প্রকৃত জেলেদের মধ্যে জলমহাল ইজারা দিতে হবে।

মৎস্য সমবায় সমিতিগুলোতে প্রতীকী নাম ব্যবহার করে এক শ্রেণির অসাধু লোক জলমহাল ইজারা নিয়ে আড়ালে জলমহালের সুবিধা ভোগ করে। অর্থ প্রদান করে জলমহালের মালিক বনে যায়। এতে প্রকৃত জেলেরা লভাংশ থেকে বঞ্চিত হন। বৈশাখ থেকে আষাঢ়, এই তিন মাস প্রতি বছর মাছ ধরা বন্ধ রাখতে পারলে অনেকাংশে মাছের বংশবিস্তার বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশের মৎস্য আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই, এটি জোরদার করতে হবে।

হাওরের সংস্কৃতি

হাওর এলাকায় হাওর সৃষ্টির বহু বছর পূর্ব হতেই মানুষজনের বসবাস। বর্তমানে কেউ হাওর পারের মানুষ, অনেক মানুষ হাওরের ভিতরে বসবাস করেন। এক সুপ্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক সমৃদ্ধ জনপদ। মোগল বাদশাহ আকবরের অন্যতম প্রতিদ্বন্দী বাংলার বারভূঁইয়াদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও যোগ্যতম মসনদ-ই- আলা ঈশা খাঁর যাবতীয় খ্যাতি ও কার্যাবলী হাওর জনপদ আবর্তিতই ছিল।

ধারণা করা হয়, বখতিয়ার খিলজী বঙ্গ বিজয় করতে এসে রাজধানী জয় করে পরবর্তী সময় যে অঞ্চলে বিপত্তির সম্মুখীন হন, আর এগুতে পারেন নি, সে অঞ্চলটি হল: এই হাওরাঞ্চল; যাকে নিম্নভূমি কিংবা জলাভূমিও বলা হয়ে থাকে। বৃটিশরা যে অঞ্চল নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল এবং ইংরেজ বিরোধী এখানকার ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র বিদ্রোহ, বিপ্লব ছিল স্বার্থক। বাঙালির হাজার বছরের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতি তার এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে হাওর পাড়ের মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প, আনন্দ-বেদনা ও জীবনযাপনের বর্ণিল উৎসব আয়োজন। বাউল গান, সারিগান, জারি গান, বিয়ের গীত, দেহতত্ত্ব, শরিয়তি, মারফতি, মুর্শিদি, মরমি, লোকগীতি, ভাটিয়ালি, পালাগান, ঘেটুগানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গানের বিশাল সম্ভার এই হাওরাঞ্চলে। হাওরের উর্বর মাটির বুকে জন্ম নিয়েছেন সাহিত্যিক, মনীষীরা। হাওরাঞ্চলের অন্যতম বিয়ের আনন্দ হলো লাইট্টা বারি (লাঠি বারি) খেলা। পালকি দিয়ে বউ নিয়া আসা এখনো দেখা যায় হাওরের বুকে। গবেষণা, চর্চা, সংরক্ষণ এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সব কিছুই কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, পানির সঙ্গে সংগ্রাম করে বছরের ৬-৭ মাস টিকে থাকা, হাওরের আফাল (ঢেউ)-এর সঙ্গে হাওরবাসীর মানিয়ে নেয়া জীবন শৈল্পিকতা, হাওরের সংস্কৃতি, গান, বিচিত্র পেশা, হাওরের মৎস্য সম্পদ, হাওরের সোনার ফসল, হাওরের সম্ভাবনা, হাওরাঞ্চলের জলেভাসা দ্বীপ ছোট ছোট গ্রাম, ঢেউয়ের গর্জন, হিজল-করচের বাগ, হাওরে চাঁদনি উদযাপন প্রভৃতি আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার কৃষ্টি-সভ্যতার অংশ। হাওরের বরপুত্র বলে খ্যাত রাষ্ট্রপতিও হাওরের জ্যোৎস্না জলের মানুষ।

হাওরের পর্যটন দিল্লির আখড়া

প্রকৃতি ছাড়াও হাওরে পর্যটকদের দেখার মতো বেশ কিছু জায়গা রয়েছে। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নের ‘দিল্লির আখড়া’এর মধ্যে অন্যতম। এখানে রয়েছে শত শত হিজল গাছ। চারশো বছরের পুরনো এই আখড়া সম্পর্কে সুন্দর একটি গল্প আছে। এক সাধক নাকি এখানে এসেছিলেন ধ্যান করতে। তার ধ্যান ভাঙার জন্য কিছু দৈত্য তাকে নানাভাবে বিরক্ত করতো। একদিন এই সাধক মহাবিরক্ত হয়ে তার দিক্ষাগুরুর মন্ত্রবলে এই দৈত্যগুলোকে হিজল গাছ বানিয়ে রাখেন।

জায়গাটির নাম দিল্লির আখড়া কিভাবে হলো?

সে আরেক গল্প। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীরের লোকজন একদিন ওই ধ্যানমগ্ন সাধকের পাশ দিয়ে নৌকার বহর নিয়ে নদীপথে যাচ্ছিলেন। এ সময় সোনার মোহর ভর্তি একটি নৌকা পানিতে ডুবে যায়। নৌকার যাত্রীরা মোহর তোলার জন্য নদীপাড়ে আসে। ডুব দিয়ে তারা দু-একটি মোহর তুলেও আনে। কিন্তু সেই মোহরগুলোও চোখের ইশারায় পানিতে ফেলে দেন ওই সাধক। পরে নৌকার যাত্রীদের অনুরোধে তিনি সোনার মোহরগুলো মাছের ঝাঁকের মতো পানির উপর ভাসাতে থাকেন। মোহরগুলো তুলে নেন যাত্রীরা। এই ঘটনা শুনে সম্রাট জাহাঙ্গীর অভিভূত হন। পরে ৩’শ একর জমি তাম্রলিপির মাধ্যমে সেই সাধুর আখড়ার নামে দান করে দেন। সেই থেকে এটি দিল্লির আখড়া।

সাধুর বানিয়ে রাখা সেই হিজল গাছগুলো এখনও দাঁড়িয়ে আছে

হিজল গাছের সারি তিনশো একরের পুরো আখড়া এলাকা জুড়েই! শত শত হিজলগাছ! দেখলে ধারণা হতেই পারে, একসময় এগুলো সত্যি সত্যিই দৈত্য ছিলো! সারা বর্ষায় এগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

বর্ষা কিংবা শুকনো। একবার ঘুরে আসা যেতে পারে সেই আখড়া থেকে। হিজলের বন ভেদ করে একবার আখড়ায় পৌঁছতে পারলেই দেখা যাবে সেই সাধুর স্মৃতি। আখড়ার নির্জনতায় আপনারও মনে হবে, সত্যি এটি ধ্যান করার মতো চমৎকার একটি স্থান বটে।

আখড়ায় রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা ও বৈষ্ণবদেব থাকার ঘর। বর্তমানে আখড়ায় মোহন্ত নারায়ণ দাসসহ তিনজন বৈষ্ণব আছেন। এখানে আশ্রিত হয়ে আছে ৪০-৫০ জন শ্রমজীবী মানুষ। সবাই নিরামিষভুজি। থাকে একটি যৌথ পরিবারের মতো। রাতে এখানে দর্শনার্থীদের থাকারও ব্যবস্থা আছে। আখড়ার পাশে রয়েছে ঘের দেয়া দুটি পুকুর। ইচ্ছে করলে পুকুরের ঘাটলায় বসে কাটিয়ে দেয়া যাবে একটা বিকেল। দিল্লির আখড়ার পাশেই রয়েছে বিথঙ্গলের আখড়া ও বন। এখানে মোগল আমলে তৈরি একটা স্থাপনা রয়েছে। তবে সংরক্ষণের অভাবে সেটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দিল্লির আখড়া কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলায় পড়লেও বিথঙ্গলের আখড়ার অবস্থান হবিগঞ্জের বানিয়াচং এ। এ দুটি আখড়াই পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।

এছাড়া অষ্টগ্রামের প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরনো পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট কুতুব শাহ মসজিদ, আওরঙ্গজেব মসজিদ, ঈশাখাঁ’র সময়ে নির্মিত ইটনার শাহী মসজিদ ও মোঘল আমলে নির্মিত নিকলীর গুরুই মসজিদ হাওর পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে।

বেড়িবাঁধে ভীড়

কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা মিঠামইন নিকলীতে রয়েছে বেশ কয়েকটা বেড়িবাঁধ । এসব বেড়িবাঁধে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকালে ৩০-৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গ্রাম চোখে পড়ে না। বাঁধে দাঁড়িয়ে হাওর দেখা সাগর দেখার মতোই উপভোগ্য। এসব বেড়িবাঁধে বর্ষায় শত শত পর্যটক এসে ভিড় জমান। গতবছর ঈদের ছুটিতে নিকলীর বেড়িবাঁধে গিয়ে দেখা গেলো, পর্যটকেরা হাওর উপভোগ করতে এসেছেন। এবারও পানি আসার সাথে সাথে লোকজন আসতে শুরু করেছে।

শুধু কি হাওর দেখা? ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে গোসল, জলকেলি ও সাঁতারও চলে সেখানে।

প্রয়োজন কিছু উদ্যোগ

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিশোরগঞ্জে হাওরের পর্যটন বিকাশে নেই সরকারি কোনো পরিকল্পনা। হাওরে পর্যটনের এ বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এ এলাকায় গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র, হোটেল, মোটেল। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পারে বলে হাওরবাসীরা মনে করেন। তবে কিছু ট্যুরিজম কোম্পানী হাওর নিয়ে এখন কাজ করছে। চিন্তা ভাবনা করছে হাওরে হোটেল মোটেল স্থাপনের। তেমনি একটি সংস্থা ‘ taabu tour’। তারা হাওরে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সুবিধার্তে ইতিমধ্যে বেশ কিছু নান্দনিক নৌকা তৈরি করেছে।

যেগুলোতে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। ঢেউবান্ধব এসব নৌকা হাওরের সৌন্দর্যকে যেন আরো বাড়িয়ে তুলেছে। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাফর হায়দার তুহিন বলেন, ‘হাওরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার-প্রচাারণা চালালে কক্সবাজার সমুদ্র-সৈকতের মতো হাওর এলাকাও একদিন দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠবে। এ ছাড়া দিল্লির আখড়ার হিজল গাছগুলোর যত্ন নিলে রাতারগুলের চেয়েও এ এলাকায় লোকজন আসবে বেশি। প্রতিবছর স্থানীয়রা হিজলের ডাল-পালা কেটে গাছগুলোর সৌন্দর্য নষ্ট করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ঘুরে আসতে পারেন আপনিও

বর্ষা চলছে। পানি ও বাতাসের সাথে লড়াই করছেন হাওরবাসী। এই যুদ্ধক্ষেত্রটা একবার দেখে এলে কেমন হয়? একটি রাত ও একটি দিন কাটানো যেতেই পারে হাওরে। সেটা ঈদের ছুটিতেও হতে পারে। অতটা ভয়ের কিছু নেই। আবহাওয়া খারাপ না থাকলে ঢেউগুলো অতটা রুদ্রমূর্তিতে দেখা দেবে না। তাছাড়া, ‘আফাল’ না থাকলে তো একেবারেই সুবোধ হয়ে থাকবে। ২৪ ঘন্টার জন্য নৌকাই হতে পারে বাড়ি, নৌকাই হতে পারে ঘর। হাওরে নাওয়া, নৌকাতে খাওয়া, আর নৌকাতেই ঘুম। আর কী চাই?

যেভাবে যাবেন

কিশোরগঞ্জে বেশ কয়েকটি রুটে হাওরে যাওয়া যায়। তবে সহজ হলো সায়েদাবাদ বা গোলাপবাগ থেকে বাসে অথবা কমলাপুর থেকে ট্রেনে সরাসরি কিশোরগঞ্জ শহরে। স্টেশনে নেমে রিকশায় মিনিট দশেক, এর পর একরামপুর। ওখান থেকে অটো-রিকশায় করে মরিচখালি বাজার। ব্যস, এই বাজারটিই হলো এই পথে হাওরের দরজা। মরিচখালি বাজার মানেই হাওরের চৌকাঠে পা রাখা। চৌকাঠ পেরিয়ে সোজা নৌকায়। এর পর শুরু হবে ধুকপুক ধুকপুক, মানে ইঞ্জিনের শব্দ। এই শব্দের ওপরেই থাকতে হবে চব্বিশ ঘন্টার মতো। প্রথমে বিরক্তিকর মনে হলেও পরে কানের সাথে মানিয়ে যাবে। নৌকায় উঠেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আগে কোথায় যাবেন। তবে প্রথমে মহামান্য রাষ্ট্রপতির দহলিজে একটু হাজিরা দিয়ে গেলেই ভালো। এর পর সোজা দিল্লির আখড়া। দিল্লির আখড়া পরিদর্শন শেষে পরের সময়টা কাটাতে পারেন একেবারেই পরিকল্পনা ছাড়া। সব কিছুই নির্ভর করবে পরিস্থিতি ও আবহাওয়ার ওপর। তবে সময়গুলো কাটবে হাওরের ভাসা পানিতেই। বৃষ্টি না হলে ট্রলারের ছাদেই রাত কাটিয়ে দিতে পারেন তাছাড়া ট্রলারের ভেতরে তো ঘুমানোর ব্যবস্থা আছেই। ইচ্ছে করলে ডাকবাংলোতেও রাত কাটানো যায়। এরপর ভাসমান তাবু নিয়ে ধুকপুক করতে করতে নৌকার নাক ঘুরিয়ে দিতে পারেন হাওর উপজেলা ইটনা, কিম্বা অষ্টগ্রামের দিকে।

নয়া শতাব্দী/জেআই/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এই পাতার আরও খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x