ঢাকা | শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

স্কুল মাঠ যেন পাথরের খনি

প্রকাশনার সময়: ২৪ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৪৮

শিশুর শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য খেলার মাঠ অপরিহার্য। মাঠে খেলাধুলা করা শিশুরা মেধা ও মননে ঘরবন্দি শিশুদের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু শিশু-কিশোরদের একমাত্র খেলাধুলার মাঠটি গত এক বছরের অধিক সময় ধরে পাথরের বিশাল সব স্তুপের নিচে চাপা পড়েছে। সেখানে রাত-দিন চলছে পাথর ভাঙার কাজ। দেখে মনে হয় এ যেনো স্কুল মাঠ নয়, পাথরের খনি। এমন অবস্থা ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার তালদিঘী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠের। দিনরাতে মিলিয়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টা পাথর ভাঙার কাজ চলে মাঠটিতে। ফলে উড়ে আসা পাথরের গুঁড়া আর পাথরভাঙা কলের বিকট শব্দে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যঘাত ঘটছে।

এখানে রয়েছে পাশাপাশি দুটি স্কুল। একটি মাধ্যমিক আর অন্যটি প্রাথমিক। স্কুল দুটি লাগোয়া বড় একটি খেলার মাঠ। কিন্তু পাথরের বিশাল সব স্তুপের নিচে চাপা পড়েছে মাঠটি। পরিবেশ বিধ্বংসী এই যজ্ঞ চালাতে স্কুল কর্তৃপক্ষই মাঠটি ভাড়া দিয়েছে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে। খেলার মাঠ সড়কের সংস্কারকাজে ভাড়া দেয়ায় এতে স্কুলের শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী পড়েছে দুর্ভোগে। শিক্ষার্থীরা মাঠে খেলতে পারে না। আর আশপাশের বাসিন্দাদের বাড়িতে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারাকান্দা উপজেলার সবচেয়ে বড় খেলার মাঠ এটি। উপজেলার বড় বড় খেলার আয়োজনগুলো এ মাঠে হতো। এটি তারাকান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মাঠ। মাঠটি ভাড়া দেওয়ায় সব ধরনের খেলার আয়োজন বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাঠটি ভাড়া নিয়ে চারদিকে টিনের সীমানাপ্রাচীর দিয়েছে। প্রাচীরের ভেতর পাকা ভবন করে সেখানে অফিসও করেছে। মাঠে পাথর ভাঙার কাজ করার শব্দ আর ধুলার কারণে এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। পাথর ভাঙার শব্দ আর ধুলার কারণে মাঠের পাশের তিনটি বাড়ির মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে।

বিদ্যালয়ের পাশের বুলবুল মিয়া নামে এক বাসিন্দা বলেন, পাথরের ধুলা আর রাত-দিন পাথর ভাঙার বিকট শব্দে বাড়িতে থাকা এখন দুস্কর হয়েছে পড়েছে। দিন কোনোরকমে পার করতে পারলেও শব্দে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বিকল শব্দের কারণে শহীদুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি নিজের বাড়ি ছেড়ে তারাকান্দা উপজেলা সদরে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন বলে তিনি জানান। স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে স্কুল কর্তৃপক্ষ মাঠটি ছয় মাস মেয়াদে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিডেট এর কাছে ভাড়া দেয়। ছয় মাসের ভাড়া বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেয়। ২০২১ সালের মার্চে ছয় মাস মেয়াদ পূরণ হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরও এক বছরের জন্য মাঠটি ভাড়া নেয়। এক বছরের জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ মাঠের ভাড়া বাবদ নেয় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা।

রানা বিল্ডার্সের ময়মনসিংহ-শেরপুর মহাসড়ক সংস্কারকাজের প্রকল্প পরিচালক সোহেল রানা বলেন, কাজ শুরুর সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একটা জায়গা দরকার ছিল। ওই সময় বর্ষাকাল থাকায় চারদিকে জমিতে পানি ছিল। যে কারণে স্কুলের মাঠটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ওই সময় করোনার কারণে স্কুলও বন্ধ ছিল। এখন স্কুল খুলে গেলেও জুন মাস পর্যন্ত এখানে পাথর ভাঙার কাজ হবে।

বুধবার সরেজমিনে তালদিঘী গ্রামে দেখা যায়, স্কুলের মাঠটিতে পাথরের বিশাল স্তুপ। পাশেই চলছে পাথর ভাঙার কাজ। মাঠের ভেতর রয়েছে ভারী ভারী যন্ত্র। স্কুলের মাঠ থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত সড়কটি ভেঙে গেছে। ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাথরবোঝাই ট্রাক। তালদিঘী গ্রামের বাসিন্দারা জানান, খেলার মাঠটিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পাথর ভাঙার কাজের জন্য শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিতে রয়েছে। সারাক্ষণ বড় বড় ট্রাক চলাচল করায় ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

উপজেলার ক্রিড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী তুষার ও সাবেক খোলোয়ার আ.লীগ নেতা মোজাম্মেল সরকার জান্নান, ভাসা সৈনিক ফুটবল ও বঙ্গবন্ধু কাপ খেলার আয়োজন করা হয়েছে এ মাঠে। এসব খেলায় প্রায় ১০-থেকে২০ হাজার লোকজন উপস্থিত থেকে খেলা উপভোগ করেছে। মাঠটি ভাড়া দেয়ায় খেলার আয়োজন করা যাচ্ছে না।

তালদিঘী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দুলাল চন্দ্র সরকার বলেন, তারাকান্দার সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) অনুমতি নিয়েই মাঠটি আমরা ভাড়া দিয়েছি। ভাড়ার টাকায় স্কুলের উন্নয়নকাজ হবে। মার্চ মাসে ভাড়ার মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে আর ভাড়া দেওয়া হবে না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিজাবে রহমত বলেন, ভাড়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে এটি কেন ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন