ঢাকা | বৃহস্পতিবার ৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮, ২৫ জিলহজ ১৪৪২

রাতের আধারে পাতা তোলে বদলে যাচ্ছে চা শ্রমিকদের জীবন

পঞ্চগড় প্রতিনিধি

প্রকাশনার সময়: ০৯ জুলাই ২০২১, ১০:১২ |

ঘড়ির কাটায় রাত দুটো বাজার সঙ্গে সঙ্গে সরব হয়ে উঠে দেশের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের চা বাগানগুলো। বাগান জুড়ে চলছে আলোর খেলা। রাতের আঁধারের মাঝে ছোট ছোট বাতি নড়াচড়া করছে। দূর থেকে হঠাৎ কেউ দেখলে ভূত পেতনি ভেবে ভয় পেয়ে যেতে পারেন। কল্পনায় যাদের ভূত পেতনি ভাবছেন এরা মূলত পঞ্চগড়ের রাতের চা শ্রমিক। মাথায় টর্চ লাইট বেঁধে চা পাতা তোলার কাজ করছেন তারা।

এক সময়ে দিনের বেলাতে সূর্যের কড়া তাপ সয়েই তারা চা পাতা তোলার কষ্টসাধ্য কাজ করেছেন। এতে যেমন ভোগান্তি পোহাতে হতো তাদের তেমনি শুকিয়ে যেতো পাতা। কারখানা মালিকরাও নিতে চাইতেন না শুকনো পাতা।

গত দু’বছর ধরে শ্রমিকরা মধ্য রাত থেকে পাতা তোলার কাজ শুরু করে। দিন দিন বাড়তে থাকে রাতের শ্রমিকদের সংখ্যা। প্রতিটি দলে শ্রমিক থাকে ১০ থেকে ১৫ জন। প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতা তোলার বিনিময়ে বাগান মালিকরা শ্রমিকদের মজুরি দেন ৩ টাকা। একজন রাতের শ্রমিক প্রতিদিন পাতা তুলতে পারেন দুইশ থেকে আড়াইশ কেজি। সেই হিসেবে তাদের দৈনিক আয় হয় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত।

শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাত ৯ টা থেকে ১০ টার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন তারা। রাত ২ টা বাজার সাথে সাথে উঠে পড়েন। তারপর হাতে চা পাতা কাটার চাকু আর মাথায় টর্চ লাইট বা মোবাইলের লাইট বেঁধে নেমে পড়েন চা বাগানে।

রাতের নীরব শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে চলতে থাকে চা পাতা তোলার কাজ। সকাল ১০ টার মধ্যেই পাতা তুলে তা কারখানায় পাঠানোর পর বাড়ি ফিরেন তারা। পরে তারা দিনের বেলা আবার অন্য কাজ করেন।

এদিকে রাতের বেলা চা পাতা তোলার কাজ করে দিনের বেলা পরিবার কিংবা অন্য কাজ করতে পারেন এই শ্রমিকরা। এতে রোদের তাপ থেকে যেমন তারা রক্ষা পাচ্ছেন তেমনি কারখানায় সতেজ পাতা সরবরাহ করতে পারছেন তারা। দ্বৈত আয়ে সুন্দরভাবে চলছে তাদের সংসার। অর্থকষ্টে থাকা এই শ্রমিকদের এখন স্বচ্ছলতা এসেছে।

শ্রমিকরা জানান, শুরুতে রাতে চা পাতা তুলতে পোকা মাকড়ের ভয় হলেও দলবেধে পাতা তোলায় কোন অপ্রীতিকর পরিস্রি শিকার হতে হয় নি তাদের। এছাড়া রাতে পাতা তোলায় দুর্ভোগ কমে আসার পাশাপাশি আয় বেড়েছে দ্বিগুণ।

জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকার রাতের চা শ্রমিক জাকির হোসেন বলেন, আমি দুই বছর ধরে রাতে চা পাতা তোলার কাজ করছি। রাত ২ টা থেকে সকাল ১০ টা পর্যন্ত কাজ করি আমরা। এতে জনপ্রতি ৬০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পাই। আবার দিনের বেলায় অন্য কাজ করতে পারি। এই দুইভাবে কাজ করে আমাদের সংসার ভাল চলছে।

একই কথা জানান,সদর উপজেলার তালমা এলাকার চা শ্রমিক রাজু ইসলাম বলেন, আমি রাতের বেলা চা পাতা তোলার কাজ করি আর দিনের বেলা কৃষি কাজ করি। সব মিলে যা আয় হয় তা দিয়ে সুন্দরভাবে সংসার চলে যায়।

ফারুক ইসলাম বলেন, আগে দিনে চা পাতা তোলার কাজ করতাম। কিন্ প্রচন্ড রোদের কারণে বেশিক্ষণ তোলা যেতো না। বেশি পাতা তুলতেও পারতাম না। রাতে পরিবেশ শান্ত থাকে, রোদের ভয় নাই তাই রাতে চা পাতা তোলা শুরু করি। মাথার মধ্যে লাইট বেঁধে নিয়ে কাজ শুরু করি। রাতে দ্রুত ও আরামে কাজ করা যায়।

মহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা দল বেঁধে রাতে চা পাতা তোলার কাজ করি। প্রতিটি দলে থাকে ১০ থেকে ১৫ জন। চা মৌসুমে প্রতিদিন রাতে মাত্র ৮ ঘন্টা কাজ করে আমাদের ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা আসে।

মোমিনুর রহমান বলেন, প্রথম দিকে ভয় ভয় লাগতো। পোকামাকড় ভয় পেতাম। কিন্ সবাই একসাথে কাজ করায় ভয় কেটে গেছে। এছাড়া আমাদের সবার সাথে টর্চ লাইট থাকায় পোকামাকড় থাকলেও চলে যায়। এখন পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখী হতে হয় নি।

জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার আজিজনগর এলাকার চা চাষী তাজ উদ্দিন তাজ বলেন, রাতে চা পাতা তোলায় শ্রমিকদের যেমন কষ্ট কম হচ্ছে তেমনি আমরাও সতেজ পাতা কারখানায় দিতে পারছি।

একই কথা বলেন আরেক চা চাষী ইলিয়াস আহম্মেদ বকুল,তিনি বলেন,রাতে চা পাতা তোলার ফলে আমাদের পাতা সতেজ থাকে আর এ পাতার চাহিদা কাড়রখানায় বেশী। আগে দেখা দিনের বেলা চা পাতা তোলার কারনে কারখানায় বিভিন্ন অজুহাত দিতো পাতা শুকিয়ে গেছে,ভেজা,ময়লা আর এভাবে কর্তন করতো কিন্তু রাতের যে পাতা আমরা কারখানায় নিয়ে যাই এটাতে তেমন কোন অভিযোগ করে না।এতে আমরাও লাভবান হয় শ্রমিকরাও লাভবান হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, পঞ্চগড়ের চা শিল্পে চাষিদের পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থা হয়েছে। তারা আগে অলস সময় কাটাতো। তাদের কোন কাজ ছিলো না। এখন চা বাগানে কাজ করে তারা স্বচ্ছলতা পেয়েছে। বিশেষ করে যারা রাতে চা পাতা তোলার কাজ করছেন তারা বেশি লাভবান হচ্ছেন। তারা রাতে চা বাগানে পাতা তোলার কাজ করছেন এবং দিনের বেলায় অন্য কাজ করছেন। এই দ্বৈত আয়ে সংসার ভাল চলছে।

এবিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সোহাগ চন্দ্র সাহা জানান,দেশের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের ৫ উপজেলার মধ্যে প্রথম চাষের চাষ শুরু হয় তেঁতুলিয়ায়। চা চাষে চাষীর যেমন লাভবান হচ্ছে পাশাপাশি শ্রমিকরাও লাভবান হচ্ছে। তবে গত দুবছ ধরে দিনের পাশাপাশি রাতেও শ্রমিকরা বাগানে চা পাতা তোলার কাজ করেন । আর এতে তারা মজুরী ও পাতা বেশী তোলতে পারে আয়ও বেশী করছে। এবং রাতে চা পাতা তোলাতে চাষীরাও সকাল সকাল চা পাতা সতেজ থাকায় কারখানায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে পারে। আর এভাবেই চা শ্রমিকদের জীবন কাটছে।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এই পাতার আরও খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x