ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২, ১৪ আষাঢ় ১৪২৯, ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

বন্যায় বাড়ছে দুর্গতি

প্রকাশনার সময়: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:৩৭

ফেনীর মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফুলগাজীর আরো ৭ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত তিস্তা ও গঙ্গাধরে চলছে নদী ভাঙন, মাদারীপুরে বন্যার পানিতে বিদ্যালয়ের যাতায়াতের রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, টাঙ্গাইলে ৪ নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে, শরীয়তপুরে পদ্মার পানি বেড়ে বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সিরাজগঞ্জে বন্যার পানি ২২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, বগুড়ায় যমুনার পানি ৪৪ সে.মি. কমে বিপদসীমার ২৪ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ও জামালপুরে পানি কমায় ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

ফেনী : ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে ফেনীর মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৪০ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার জয়পুর অংশে ৩য় দফায় আবারো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে এবারো ৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

গতকাল সোমবার দুপুর পর্যন্ত মুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে রোববার সকাল থেকে লোকালয়ে পানি ঢুকে ৪ গ্রাম ও সোমবার নতুন করে ৩টি গ্রামসহ ৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে ফেনী পরশুরাম সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার সকালে পাহাড়ি ঢল ও উজানের পানির চাপে মুহুরী নদীর ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের জয়পুর অংশের একটি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।

ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের, পশ্চিম ঘনিয়ামোড়া, পূর্ব ঘনিয়ামোড়া ও কিসমত ঘনিয়ামোড়া, জয়পুর, উত্তর দৌলতপুর দক্ষিণ দিনাজপুর বৈরাগপুর প্লাবিত হয়েছে। ফুলগাজী পশুরাম আঞ্চলিক সড়ক পানিতে ডুবে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়াও বন্যার পানিতে পুকুরের মাছ, ফসলের জমি এবং অনেকের বাড়িঘর ডুবে গেছে।

কুড়িগ্রাম : সব নদ-নদীর পানি কিছুটা কমলেও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সোমবার দুপুরে ধরলা নদীর পানি অনেকটা কমে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর এবং ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে নদ-নদীর চরাঞ্চল ও দ্বীপচরগুলোসহ নিম্নাঞ্চলসমূহ পানিতে তলিয়ে আছে। রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর নিমজ্জিত থাকায় বন্যার্তরা রয়েছেন বিপাকে। গত দুই সপ্তাহ ধরে জেলার ৫ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ৪ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি জীবনযাপন করছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাাবিত হচ্ছে প্রতিদিন। এসব এলাকার অন্তত ৮০ হাজার মানুষ নানা সংকটে দিন পার করছেন। এদিকে, তিস্তা, দুধকুমার ও গঙ্গাধর নদীর পানি কমে চলছে কয়েকদিন ধরে নদী ভাঙন। গত এক সপ্তাহ ধরে রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের ৩টি গ্রাম, সদরের জয়কুমর ও সারডোব এবং গঙ্গাধর নদীর ভাঙনে নাগেশ্বরীর কয়েকটি স্থানসহ ১২টি পয়েন্টে চলছে নদী ভাঙন।

মাদারীপুর : করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকার পর আগামী ১২ সেপ্টেন্বর বিদ্যালয় চালুর খবরে মাদারীপুরের রাজৈর ও পার্শ্ববর্তী মুকসুদপুর উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে নানা প্রস্তুতি। করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ গঠনে চলছে নানা কর্মকা-। তবে বন্যার কারণে পাঠদানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে দুই উপজেলায় ১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয় । এর মধ্যে মুকসুদপুর উপজেলায় ৮টি ও রাজৈর উপজেলায় ৪টি। এসব বিদ্যালয়ের মাঠ ও যাতায়াত পথ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় দীর্ঘ দেড় বছর পর আগামী ১২ সেপ্টেন্বর থেকে বিদ্যালয় চালু হলে এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক।

এদিকে রাজৈর উপজেলার ১২নং রাঘদী নাগরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অঞ্জলী রানী বৈদ্য জানান, মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার ১২নং রাঘদী নাগরদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হরিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিজলবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

টাঙ্গাইল : যমুনা, ধলেশ্বরী এবং ঝিনাই নদীর পানি কমলেও বেড়েছে বংশাই নদীর পানি। তবে এখনো ৪ নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বর্তমানে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। পানি কমলেও কমেনি বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সোমবার যমুনা নদীর পানি ২৪ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার, ঝিনাই নদীর পানি ১১ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৭৬ সেন্টিমিটার এবং ধলেশ^রী নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া বংশাই নদীর পানি ৪ সে.মি. বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে পানি কমতে থাকায় বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। ভাঙনের ফলে নদী তীরবর্তী এলাকায় ইতোমধ্যে তিন শতাধিক বসতভিটা, রাস্তাসহ নানা স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া কাঁচা-পাকা রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে রয়েছে। অপরদিকে মাঠ ঘাট তলিয়ে থাকায় বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের সংকট। এ ছাড়া ৯৮০ হেক্টর রোপা আমন বন্যার পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পানি নেমে গেলে নিমজ্জিত ৫০ ভাগ রোপা আমনের ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হবে বলে কৃষি বিভাগ জানায়।

শরীয়তপুর : পদ্মা নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে পানি প্রবেশ করছে জেলার নি¤œাঞ্চলে। হুমকির মুখে পড়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা।

গতকাল সোমবার জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার (পানি পরিমাপক) শিল্পী জানান, ‘সকাল ১০টার দিকে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে দুপুর ১২টা থেকে পানি ২৫ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।’ জানা যায়, নদী তীরবর্তী জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা, পালেরচর, বিলাশপুর, জাজিরা, কুন্ডেরচর ইউনিয়ন ও নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে পানি ঢুকছে। পদ্মায় পানি বাড়তে থাকায় অব্যাহত আছে নদী ভাঙন। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, ‘জেলার নদী তীরবর্তী নি¤œাঞ্চলে পানি প্রবেশ করছে। ভাঙন রোধে জিওব্যাগ ও জিওটিউব ফেলার কাজ চলেছে।’

সিরাজগঞ্জ : যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ২২ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নদ-নদী ও চলনবিলের পানিও কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে জেলায় এখনো পানিবন্দি রয়েছেন প্রায় লাখো মানুষ। তলিয়ে গেছে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ফসল।

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টায় সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন এবং সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বগুড়া : গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ৪৪ সে.মি. কমে বিপদসীমার ২৪ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার সকালে ৬৮ সে.মি. বিপদসীমার ওপর দিয়ে যমুনা নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে যমুনা নদীর পানি কমলেও বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। পানি বৃদ্ধির ফলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা এবং ধুনট উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের ১০১টি গ্রামে পানি প্রবেশ করেছে। এতে তিন উপজেলার ১৬ হাজার ৮০০টি পরিবারের ৬৭ হাজার ৩০০ জন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জামালপুর : গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে ৩৬ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। নদী ভাঙা পরিবারগুলো বিভিন্ন সড়ক বাঁধে ও বিভিন্নস্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

নয়া শতাব্দী/এমআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ