ঢাকা | বৃহস্পতিবার ৫ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮, ২৫ জিলহজ ১৪৪২
স্বীকৃতি মিলেছে জিআই পেটেন্ট

রাজশাহীর ঐতিহ্যে মিশে আছে রেশম চাষ

জনাব আলী, রাজশাহী :

প্রকাশনার সময়: ২১ জুন ২০২১, ১৩:৪৩ | আপডেট : ২১ জুন ২০২১, ১৫:২৭

রাজশাহীর ঐতিহ্যে মিশে আছে রাজশাহী সিল্ক (রেশম)। রাজশাহী নামটি শুনলেই চলে আসে রাজশাহী সিল্কের নাম। একে অপরকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। সুপ্রাচীনকাল থেকেই রাজশাহীর আবহাওয়া রেশম চাষের জন্য অনুকূলে।

তন্তু বিচারে রাজশাহী সিল্কের ন্যায় মৌলিক গুনাগুণ ও বিশেষত্ব বিশ্বের অন্য কোনো স্থানেই নেই বলে গবেষণায় প্রমাণিত। দেশের ইলিশ,জামদানি-আমের পরে এবার ব্যান্ডিং স্বীকৃতি মিলেছে রাজশাহী সিল্কের। ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ক এখন ভৌগোলিক নির্দেশক পন্য বা জিআই পেটেন্ট এর স্বীকৃতি পেয়েছে।

রাজশাহীবাসীর জন্য এটি আনন্দ ও গর্বের বিষয়। তবে রাজশাহীতে ঠিক কবে থেকে রেশমের চাষ শুরু হয় তা, সঠিকভাবে বলা সম্ভব হয়নি।

রাজশাহী সিল্কের ইতিহাস প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষক ড. আমিরুল ইসলাম কনক নয়া শতাব্দীকে জানান- রাজশাহী সিল্কের সাথে রাজশাহী নামটি এমনভাবে মিশে আছে যে এদের একেক থেকে অন্যকে পৃথকভাবে কল্পনা করা যায় না। রেশমের শহর রাজশাহীর প্রাচীন জনপদের নাম মহাকালগড়।

এই মহাকালগড় অঞ্চলটি গড়ে ওঠেছিল পদ্মা ও তার শাখা নদী বাহারী, স্বরমঙ্গঁলা,দয়া, জামদহ প্রভূতি নদীর পলি, কাঁদা ও বালু দিয়ে। মহাকালগড়ের পাশ্ববর্তী বেশকিছু এলাকাজুড়ে ছিলো মহানন্দা, প্রাচীন তিস্তা নদীর নি¤œপ্রবাহ এবং আত্রাই নদীর প্লাবন ভূমি।

তিনি রাজশাহী রেশমের ইতিহাস প্রসঙ্গে গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর লেখা বই ‘শহর রাজশাহীর আদি পর্ব’ এর সূত্র উল্লেখ করে বলেন, ব্যবসা কেন্দ্র ও নগর গড়ে ওঠার সঙ্গে রাজশাহী রেশম শিল্প বিকাশের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তৎকালীন বোয়ালিয়ায় বানিজ্যিক রেশম উৎপাদন কেন্দ্র ও নৌবন্দর গড়ে ওঠার সূত্রপাত হয় পদ্মার তীরে ওলন্দাজ বনিকদের মাধ্যমে বড়কুঠি নামক একটি পাকা কারখানা নির্মাণের মধ্য দিয়ে।

রেশম উৎপাদনের আধিক্য, উন্নতমান, সহজলভ্য, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ইত্যাদি বিবেচনা করে ওলন্দাজ বণিকগণ স্থানীয় অধিবাসীদের মাধ্যমে এই কারখানা নির্মাণ করেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলার রেশম বস্ত্র ছিল দিল্লির শাহজাদী এবং বেগমদের পরম আদরের কাঙ্খিত বস্তু। ১৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান মাশহাদীর লিখিত ফরমান জারির পর ওলন্দাজ ব্যবসায়ীগণ রাজশাহীতে কুঠি নির্মাণের উদ্যোগী হন।

রাজশাহীতে স্থানীয়ভাবে রেশম উৎপাদনের ব্যাপকতা লাভ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। নবাব আলীবর্দী খানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে বাংলা, বিহার উড়িষ্যার বিভিন্ন অঞ্চলের মারাঠা বর্গীদের দ্বারা দস্যুতা ও লুষ্ঠনের মতো নানাবিধ সন্ত্রাসী কর্মকা- বৃদ্ধি পেতে থাকে।

বিশেষ করে ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দের পরে অব্যাহত বর্গী হামলার কারণে মর্শিদাবাদ সন্নিহিত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে গোদাগাড়ি, রামপুর বোয়ালিয়া, সারদা,বাঘা,আলাইপুড়, শাহপুর প্রভূতি অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। এদের অধিকাংশই ছিলেন বিত্তবান ব্যবসায়ী।

এই অঞ্চলে আগমন করেই তারা স্থানীয় রেশম চাষের ব্যাপক সম্ভাবনার সুযোগ গ্রহণ করে। এদের ব্যাপক একটি অংশ আগমণ করে ভারতের উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাট থেকে।

এরা রেশমকুঠি ও কারখানা স্থাপন করেছিলেন রাজশাহীর কাজলা, মতিহার, মেহেরচন্ডি, কাপাসিয়া, শাহপুর, রেশমপট্টি, শিরোইল, সপুরা, সাগরপাড়া, শেখেরচক, বায়া প্রভূতি স্থানে। এছাড়া তৎকালীন রাজশাহী জেলার বাঘা, ভোলাহাট, মীরগঞ্জ, তাহেরপুর, প্রেমতলী ও নাটোরে গড়ে উঠেছিল কাঁচা রেশমের বাজার।

১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দের হলওয়েল রির্পোট থেকে জানা গেছে, কেবল নাটোর থেকেই ৬ প্রকারের বস্ত্র ও কাঁচা রেশম ইউরোপের বাজারে বিক্রি হতো। রাজশাহীর রেশম বস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যের বসরা, মক্কা, জেদ্দা ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার পেশু, আচেন ও মালাক্কার বাজারে যেত।

১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দের রাজশাহীর কালেক্টরের বিবরণী থেকে জানা গেছে, কেবল রাজশাহীর ওয়াটসন কোম্পানির কারখানাতেই ৯ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। এখানে বাৎসরিক মূলধন বিনিয়োগ হতো ১৭ লক্ষ টাকা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলুপ্ত করা হলে তাদের সমুদয় কারখানা ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াটসন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়। রবার্ট ওয়াটসন কোম্পানির কারখানা সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫২টি।

তখন রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত দেশীয় এবং ইউরোপীয় কারখানা একত্রে ১৮০ টন কাঁচা রেশম উৎপাদন হতো। ময়মনসিংহ, ঢাকা, পাবনা থেকে ব্যবসায়ীরা স্থায়ীভাবে এখানে বসবাস করতে থাকেন।

ওয়াটসন কোম্পানির সবচেয়ে বড় কারখানা ছিল বোয়ালিয়া পদ্মাতীরের বড়কুঠি এবং সারদার কমার্শিয়াল রেসিডেন্সি। তাদের নিজেদের কারখানায় উৎপাদিত রেশমবস্ত্রও ইউরোপের দেশগুলোতে রফতানি করতেন।

রাজশাহীর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে মেহেরচন্ডি মৌজার আলী শাহ ও তার পুত্র মাদারী শাহ, মতিহার ও কাজলার ফরাসি মালিকনাধীন মেসার্স লুই পেইন অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে যৌথ ব্যবসা করতেন। তরফ পারিলা গ্রামের বানু মন্ডলের ২০ একর জমির ওপর পুকুর ও রেশম কারখানা ছিল।

চিন্নাত আলী মহাজনের নিজস্ব কারখানা ছিল বারাহী নদীর তীরে মতিয়ার বিল নামক স্থানে। শহরের পাশর্^বর্তী বশরীর জমিদার নূরুল ইসলাম মিয়া, সমসাদীপুরের নবীরুদ্দিন মিয়ার কারখানায় শত শত শ্রমিক কাজ করতেন। স্ব স্ব কুঠি, কারখানা এবং রেশমের আড়ৎদারী ব্যবসা করে সপুরার হাজি মনিরুদ্দিন, রেশমপট্টির মিয়াজান দালাল, মহানন্দখালির নফর মন্ডল, বেলঘরিয়ার এনায়েত মন্ডল, কাপাসিয়ার শাহবাজ তালুকদার প্রমুখ বিত্তবান ও জমিদারির মালিক হয়েছিলেন।

১৮৭০ সালের একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলের রেশম উৎপাদনের সঙ্গে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মেসার্স এন্ডারসন, বেঙ্গল সিল্ক কোম্পানি এবং মেসার্স লুই পেইন এন্ড কোম্পানির ১৪টি কারখানায় ১৮৮৮ সালে ১ লাখ ৫৫ হাজার চারশত ৫২ পাউন্ড সুতা উৎপাদিত হয়েছিল।

দেশীয় এবং ইউরোপীয় বনিকগণ চীন, জাপান, কোরিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাঁচা সিল্ক ও সুতা রফতানি করতেন।

চীন, জাপান ও কোরিয়ায় যেখানে রাজশাহী সিল্কের একক আধিপত্য ছিলো, কালক্রমে সেই বাজারের একক আধিপত্য ক্ষীণ হতে থাকে। পাশাপাশি বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পদ্মার ভাঙনে রামপুর বোয়ালিয়াসহ পাশ্ববর্তী অনেক কারখানা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

১৮৯৭ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে সাহেবগঞ্জ, খোজাপুর, বশরী, নবাবগঞ্জ, শাহপুর প্রভূতি এলাকার অনেক কারখানা পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এরপরও সীমিত পরিসরে সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে রামপুর বোয়ালিয়াসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় রেশম উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে কারখানাগুলো সেই সময়ের পরিচয় বহন করে চলেছে।

ড. আমিরুল ইসলাম মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ককে ভৌগোলিক নির্দেশক পন্য বা জিআই পেটেন্ট এর স্বীকৃতি দানের ফলে রাজশাহী সিল্কের অপার সম্ভাবনা আবারো উজ্জ্বল হবে।

রাজশাহী শিরোইল রেশম কারখানার দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ নয়া শতাব্দীকে বলেন, বর্তমানে রাজশাহী রেশম কারখানায় স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে, এই কারখানাটিতে আমাদের যখন যাদেরকে দায়িত্ব দেন, সেভাবে আমরা দায়িত্ব পালন করি।

বর্তমানে কারখানাটিতে ৫০ জন দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে শ্রমিক রয়েছেন। তাদের দিয়ে আমরা কাজ চালিয়ে নিই। বোর্ডের মহাপরিচালক বদলি হয়েছেন, আবার নতুন ডিজি মহোদয় যোগদান করলে রেশমের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের জনসংযোগ কর্মকর্তা সুমন ঠাকুর নয়া শতাব্দীকে বলেন, ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী সিল্ক এখন ভৌগোলিক নির্দেশক পন্য বা জিআই পেটেন্ট এর স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশবাসীর জন্য এটি আনন্দ ও গর্বের বিষয়। রেশমের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এই পাতার আরও খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x