ঢাকা | রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮

জয়পুরহাটে স্কুল পড়ুয়াদের বাল্যবিয়ের হিড়িক

জয়পুরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশনার সময়

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৯:২২

জয়পুরহাটে করোনাভাইরাসের বিস্তারের এ সময় স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বাল্যবিয়ের হিড়িক পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গ্রামীণ পরিবারগুলোতে কন্যা শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষেরা এ সময়টায় দেশে ফিরছেন।

সমাজ বাস্তবতায় প্রবাসে কাজ করা ছেলের ‘পাত্র’ হিসেবে চাহিদা বেশি। আর এই অবরুদ্ধ অবস্থায় বিয়ে দিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন অভিভাবকেরা। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এখন কম হচ্ছে। এ সময়টায় মানুষের চলাফেরা কমে গেছে। তাই খুব বেশি মানুষকে আপ্যায়ণ করতে হচ্ছে না। এতে তাদের খরচও কমে যাচ্ছে। সেই সুযোগও কাজে লাগাচ্ছে কেউ কেউ। সমাজের দরিদ্র অনেক অভিভাবকই এ সময় মেয়ের বিয়ে দিয়ে ফেলছেন।

এ বিষয়ে জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক মোঃ শরিফুল ইসলাম জানান, গোপনে বাল্য বিবাহ হওয়ার পর আর কিছুই করার থাকে না, তাই বাল্য বিবাহের খবর পাওয়া মাত্র ইউএনও অথবা থানায় খবর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার সোনামুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী নুরী বেগম। তার ইচ্ছে ছিল পড়াশুনা করার। সেই স্বপ্ন আর পুরণ হলো না। অল্প বয়সেই বিয়ের পিড়িঁতে বসতে হয়েছে তাকে। পিতার মাতার অবাধ্য হয়ে বিয়ে বন্ধ করতে পারেনি সে। কোন আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই করেনাকালে গোপনে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন তার পরিবার।

পাশেই অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী বিথি। তার পরিবারের ধারণা স্কুল বন্ধ থাকায় মেয়ের পড়াশুনা আর হবে না। ভাল ছেলে পেয়েছে তাই বিয়ে দিয়েছেন তার মেয়েকে।

শুধু নুরী কিংবা বিথিই নয়, করেনার এই কয়েক মাসে জেলার সোনামুখি বিদ্যালয় থেকে ১৬জন, কাশিড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২৩জন, ইটাখোলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২৬জনসহ জয়পুরহাট জেলার ২৮১টি বিদ্যালয়েই এভাবে (১৪৬মাধ্যমিক, ১১৪টি এবতেদায়ি ও ২১টি ভোকেশনাল) আশংকাজনক ভাবে বাল্য বিবাহের শিকার হয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

সিআরডি স্কুলের পরিচালক মাহমুদুল করিম জানালেন বাল্য বিবাহ বন্ধে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।

বাল্য বিবাহের শিকার শিক্ষার্থীরা বলছেন বয়স কম হওয়ায় অভিভাবকে বুঝিয়েও লাভ হয়নি। তাই সব কিছু বিসর্জন দিয়ে পিতা মাতাকে সম্মান জানিয়েছেন তারা।

বাল্য বিবাহের শিকার ছিট হেলকুন্ডা গ্রামের মেসেরের মেয়ে সীমা। তিনি কেবল ভর্তি হয়েছেন জয়পুরহাট বেসরকারী কলেজে, এরই মধ্যে তার বিয়ে হয়েছে।

অভিভাবকরা বলছেন, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ, কত দিন পর খুলবে, আর খোলার পর পড়াশুনা ঠিকমত হবে কি না, তাই ভাল ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি।

স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা জানান, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় এভাবে বাল্য বিবাহ হয়েছে তা বুঝতে পারেনি তারা। এ্যাসাইমেন্ট জমা দেওয়ার পর জানতে পারছেন বাল্য বিবাহের ভয়াবহতা।

বাল্য বিবাহ রোধে কাজ করা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাবিনা সুলতানা বলছেন, করেনাকালে স্কুল বন্ধ ও বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ কমিটির তৎপরতা কম থাকায় আগের চেয়ে বাল্য বিবাহ আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, লকডাউনে ঘরের মধ্যে পরিচিত মানুষের মাধ্যমে মেয়ে শিশুরা যৌন হয়রানির শিকার বেশি হচ্ছে। এই দিকটাও বাল্যবিবাহ দেওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করছে অনেক ক্ষেত্রে। তাই সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে বাল্য বিবাহ বন্ধের দাবী সকলের।

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x