ঢাকা, শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

নামেই ড্রাইভিং স্কুল

প্রকাশনার সময়: ১৩ মে ২০২২, ১৩:১২

নজরদারি নেই দেশের ১৩৯ ড্রাইভিং স্কুলে। আর এই সুযোগে টাকার বিনিময়ে অপেশাদার চালকদের হাতে চলে যাচ্ছে পেশাদার লাইসেন্স। ফলে ঘটছে দুর্ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে প্রশিক্ষণ নিতে আসা চালকরা চুক্তিবদ্ধ হয়ে এসব স্কুলগুলোর মাধ্যমে লাইসেন্স নিয়ে থাকেন। এতে সহযোগিতা করে বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স দেয়ার অভিযোগে ১০ দালালকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা বিআরটিএর অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে অভিজ্ঞতা ছাড়াই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভুয়া ঠিকানার কাগজপত্র দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স বানিয়ে দেয়ার কাজ করে আসছিল বলে স্বীকার করেন এবং ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে থাকা কয়েকটি স্কুল থেকে এসব লাইসেন্স করে দেয়ার কন্ট্রাক্ট দেয়া হয় বলে জানান। স্পর্শকাতর এমন বিষয়ে নড়েচড়ে বসেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এরপর ১৩৯ স্কুলের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়া হয়। সেখানে বিআরটিএর নজরদারি না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) পরিচালক শেখ মো. মাহবুব-ই-রব্বানী নয়া শতাব্দীকে বলেন, বেসরকারি এসব স্কুলের লাইসেন্স দেয়া হয় বিআরটিএ থেকে। লোকবলের কারণে অনেক সময় দেখভাল করা সম্ভব হয় না। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা হয় এবং দোষী প্রমাণিত হলে তাদের লাইসেন্স বাতিলও করা হয়। জানা গেছে, কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ দেশে আছে ১৩৯টি প্রশিক্ষণ স্কুল। স্কুলগুলো আবার রেজিস্ট্রেশনভুক্তও। তবে সেখানে নেই কোনো উন্নতমানের প্রশিক্ষণ। মাঝে মধ্যে চলে নামকাওয়াস্তে প্রশিক্ষণ। থাকে না নামধারী কোনো প্রশিক্ষক। সার্বক্ষণিক টাকার ধান্ধায় থাকছে স্কুলগুলো। নেই কোনো নজরদারি। টাকা দিলেই বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে পেয়ে যাচ্ছে লাইসেন্স। ফলে অপেশাদাররা পেয়ে যাচ্ছে পেশাদারি লাইসেন্স। ওইসব চালকের আসনে বসে সড়ক-মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। প্রশিক্ষণের নামে স্কুলগুলো মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

সম্প্রতি পুলিশ সদর দফতর স্কুলগুলো নিয়ে একটি গোপন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র হয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— স্কুলগুলো নানা কায়দায় অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা বিআরটিএ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই কারবার চালিয়ে আসছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার কে এম হাফিজ আক্তার জানান, ড্রাইভিং স্কুলগুলো প্রশিক্ষণের প্যাকেজ হিসেবে অনেক সময় লাইসেন্স করে দেয়ার চুক্তি করে। এই সুযোগে বিভিন্ন অপরাধীচক্র লাইসেন্স করে নিচ্ছে। এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি। নিয়মকে অনিয়মে পরিণত করে তারা। কোনো প্রকার ট্রেনিং ছাড়াই অদক্ষ ড্রাইভারদের লাইসেন্স তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। ফলে লাইসেন্স পাচ্ছেন অদক্ষ ড্রাইভার। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। এ কাজে সহযোগিতা করছেন বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তা। বিষয়টি তাদের কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানায়, হাইওয়ে পুলিশ ও বিআরটির গাফিলতি, উদাসীনতা ও অবহেলার কারণেই ঘটছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সড়ক দুর্ঘটনা। বেশিরভাগ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেই চালকদের প্রতিযোগিতার বিষয়টি প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। অথচ লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রধান শর্ত প্রতিযোগিতা থেকে বিরত থাকা। অনেক সময় যাত্রীরা বারণ করলেও চালকদের কানে পৌঁছে না যাত্রীদের সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কোনো চালকেই আইন মানছে না। এতে প্রাণহানি ঘটছে উদ্বেগজনকহারে।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চালকরা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ না নিয়েই চালাচ্ছে ভারী যানবাহন। আবার অনেকে শিক্ষানবিশ সার্টিফিকেটও ব্যবহার করছেন। আর এ কাজে সহযোগিতা করছে কতিপয় ড্রাইভিং স্কুল। এসব স্কুল মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে স্কুলের রেজিস্ট্রেশন করছে। অথচ তাদের অনেকেরই অফিস পর্যন্তও নেই। একটি ভাঙাচোরা গাড়িই তাদের স্কুল হিসেবে ব্যবহার হয়। প্রশিক্ষণের স্থান বলতে ব্যস্ততম সরকারি সড়ক। বিআরটিএর দেয়া, তথ্যমতে বর্তমানে দেশে ১৩৯টি প্রশিক্ষণরত স্কুল আছে। তবে বেশিরভাগ স্কুলের ঠিকানা ভুয়া। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফুটপাতের রাস্তা দখল করে স্কুলের কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরও ওইসব স্কুল নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে, প্রশিক্ষণরত চালকদের লাইসেন্স দেয়ার কথা বলে ২০ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকাও হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। লাইসেন্স প্রাপ্তিদের বেশিরভাগ বিদেশগামী ও বাস লেগুনা চালক। আবার অনেক সময় ভুয়া লাইসেন্স দিয়েও চালকদের রাস্তায় নামানো হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, ড্রাইভিং স্কুলগুলোর নজরদারি না থাকার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখানে এসব অপকর্মে যুক্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশিরভাগ স্কুলের ঠিকানা নেই। ফুটপাতের উপর ছোট টংঘর বসিয়ে চালকদের নামকাওয়াস্তে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। মিরপুরের একটি স্কুলের কর্ণধার জানান, বিআরটিএ ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই চলতে হয়। প্রশিক্ষণ নিতে আসা চালকদের চাহিদা অনুযায়ী লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে দেই। এটি করতে অনেক জায়গায় টাকা দিতে হয়। যার কারণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও বেশি টাকা নিতে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, স্কুলের অনুমতি নিতে হলে একটি ঠিকানা ব্যবহার করতে হয়। পরে ওই ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলে অনেকে। জানা গেছে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১০ দালালকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারের পর তারা অভিজ্ঞতা ছাড়াই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভুয়া ঠিকানার কাগজপত্র দিয়ে ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স বানিয়ে দেয়ার কাজ করে আসছিল বলে স্বীকার করে। এদের মধ্যে লিটন পাইক ও মিস্টার দালাল অন্যতম। তাদের সঙ্গে স্কুল মালিকদের সুসম্পর্ক আছে। মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে স্কুলমালিকদের হয়ে তারা এসব অপকর্ম করে আসছিল বলে জানান। এ ঘটনার আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর বিআরটিএ কার্যালয় থেকে ১৩ দালালকে গ্রেফতার করে র‍্যাব। তারাও প্রশিক্ষণকরত স্কুলের হয়ে লাইসেন্স তৈরির কাজ করে আসছিল বলে জানান। একই সঙ্গে ওইসব স্কুল নামকায়াস্তে প্রশিক্ষণ দেয় বলে জানান।

ডিবির লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার রাজীব আল মাসুদ জানান, অবৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বাণিজ্যের সঙ্গে তুরাগের বিআরটির কয়েক কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ওইসব কর্মকর্তা জেনেশুনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য অবৈধ কাগজপত্র জমা নিতেন। তারা প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে মাঠে যান চালানোর পরীক্ষায় পাস করিয়ে দিতেন। এ পর্যন্ত ওই চক্রের মাধ্যেমে দালালরা পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছেন বলে তদন্তে উঠে আসে।

নয়া শতাব্দী/এস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ