ঢাকা | সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৫ আশ্বিন ১৪২৮

কমছে করোনা বাড়ছে ডেঙ্গু

মো. শফিকুল ইসলাম

প্রকাশনার সময়

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:০৩

দীর্ঘ দুই মাস সংক্রমণ-মৃত্যুর ভয়ংকর পরিস্থিতি শেষে কমতে শুরু করেছে করোনাভাইরাস। গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন মৃত্যু নেমে এসেছে একশ’র নিচে। স্বাভাবিক রূপে ফিরতে শুরু করেছে রাজধানীসহ সারাদেশ। গণপরিবহনসহ সবকিছুই রয়েছে চালু। করোনা রোগী কমতে থাকায় হাসপাতালগুলোতে ফাঁকা রয়েছে অনেক বেড-আইসিইউ। করোনার সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমলেও খবর যখন স্বস্তির তখন অস্বস্তি বাড়াচ্ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ।

নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু। প্রায় প্রতিদিন রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা। এসব রোগীর শরীরে দ্রুত কমে যাচ্ছে প্লাটিলেট। গত কয়েক দিনে করোনার সংক্রমণ নিন্মমুখী হলেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। ইতোমধ্যে চলতি বছরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ৪৯ জন। ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ায় অস্বস্তি আর আক্রান্তের শঙ্কায় দিন পার করছেন রাজধানীবাসী।

আক্রান্ত ও মৃত্যুহার বাড়ায় জনমনে বাড়াচ্ছে উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরজুড়ে মশক নিধন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়নি। পাশাপাশি এডিস মশা সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় এ সংক্রমণ বাড়ছে। এজন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে দায়ী করছেন তারা। শিশুদের জন্য করোনাভাইরাসের চেয়ে ডেঙ্গু বেশি বিপজ্জনক বলছেন তারা। এ বছর ডেঙ্গু ‘ডেনভি-৩’ ধরন সবচেয়ে মারাত্মক। মৃত্যুর ঝুঁকিও বেশি। এদিকে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু কমছে অনেক।

সব মিলিয়ে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। তবে, ভারতে ডেল্টা প্লাস সংক্রমণ আবার বাড়ছে। সেখানে অক্টোবরে আরেকটি নতুন ওয়েভের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও দ্বিতীয় টেউ শুরু হয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট দিয়েই। সীমান্ত এলাকা দিয়ে এই ভ্যারিয়েন্ট সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ভারতে ফের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করায় দেশেও তা নিয়ে আছে আতঙ্ক। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মারা গেছেন ৭০ জন। যা গত ৭২ দিনের মধ্যে সর্বনিন্ম মৃত্যু। এ নিয়ে টানা ৭ দিন ধরে মৃত্যু একশ’র নিচে। আগের দিনের চেয়ে মৃত্যু বেড়েছে ১৮ জনের। নতুন মৃত্যুসহ এখন পর্যন্ত করোনায় কমছে করোনা বাড়ছে দেশে মোট প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ হাজার ৪৩২ জন। সংক্রমণ কমেছে ২৬৯ জন।

নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ১৬৭ জন। নতুন শনাক্তসহ মোট রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ১০ হাজার ২৮৩ জন। নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ২৯ হাজার ৪৩৮টি। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। সুস্থ হয়েছেন ৪ হাজার ৬৯৭ জন। মোট সুস্থ হয়ে উঠেছেন ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৮২ জন। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ২৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫ জন, রাজশাহীতে ৪, খুলনা ১২, বরিশাল ৪, সিলেট ৮ ও রংপুরে ৩ জন মারা গেছেন।

জানতে চাইলে করোনাসংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বিএসএমএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনা সংক্রমণ আরো কমবে। গত বছরও এই সময়েই সংক্রমণ কমে গিয়েছিল। তবে এর কারণ কী সে সম্পর্কে আমাদের কোনো গবেষণা নেই। তবে এবার একটা গবেষণা শুরু করেছি। ভ্যাকসিন যদি দ্রুত দিয়ে দেয়া যায় তাহলে অনেক ভালো হবে। আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

এটা আরো কড়াকড়ি করতে হবে। ভারতে আবার ওয়েভ শুরু হলে বাংলাদেশেও হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার সেরকম হবে বলে মনে করি না। তবে উচিত হবে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ এখন কমছে। করোনার গতি ঢেউয়ের মতো কখনো ওঠে আবার কখনো নামে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ আরো কমবে। যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানি, টিকা না দিতে পারি তাহলে আগামী চার থেকে ছয় সপ্তাহ পর বাড়তে পারে। সেটি ১২ সপ্তাহ পর ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেটা ঠেকাতে হলে আমাদের এখনই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ভারতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে আবারো বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। তাই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

জানা যায়, এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের হার অন্য সব বারের তুলনায় অনেক বেশি। সেই সঙ্গে বাড়ছে জটিলতাও। ভাইরাসটির ধরন পরিবর্তনের কারণে এবার জ¦র ভালো হওয়ার পরও শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। একটু অসচেতন হলেই রোগীর জীবন পড়ে যাচ্ছে হুমকির মুখে। আক্রান্ত যেসব শিশু মারা গেছে তাদের বেশিরভাগই পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে মারা গেছে। তাই জর হলেই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ চিকিৎসকদের।

সরেজমিনে ঢাকা শিশু হাসপাতালে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তেজগাঁও এলাকার শিশু ইব্রাহিম চার দিন ধরে ভর্তি শিশু হাসপাতালে। স্বাভাবিক জর ভেবে চিকিৎসকরে পরামর্শে প্রথম থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো শুরু করেন। কিন্তু চার দিনেও জ্বর না কমে উল্টো বাড়তে থাকায় ডেঙ্গু টেস্ট করানো হয়। এরই মধ্যে প্লাটিলেট কমে যায়। দেখা দেয় নানা জটিলতা।

ইব্রাহিমের মা সুলতানা পারভীন বলেন, প্রথমে মনে করেছি ডেঙ্গু পজেটিভ হবে না। পরবর্তীতে অবস্থা খারাপ দেখে হাসপাতালে ইমাজেন্সিতে আসলে ডাক্তার বলেন ভর্তি করাতে কবে। বাচ্চার অবস্থা খুবই খারাপ। একই অবস্থা মিরপুরের মরিয়ম আক্তারের। প্রথম দিকে গুরুত্ব না দেয়ায় তার মেয়ের অবস্থাও খারাপ হয়েছে। তিনি বলেন, দুই দিন বৃষ্টিতে ভিজছিল বাচ্চা। তাই মনে করছিলাম স্বাভাবিক জ¦র। আমরা বাচ্চাকে একেবারে মরা অবস্থায় নিয়ে আসছিলাম। পরে দ্রুতই আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। এখন কিছুটা সুস্থ।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে গড়ে হাসপাতালে ভর্তি পাঁচজন। জুনে গড়ে ১৪ জন। জুলাই মাসে সেই সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গড়ে ১০৫ জন। আর আগস্ট মাসে ৩০০ জনের বেশি। আক্রান্তের এই গ্রাফ এখনো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। যারা ভর্তি হচ্ছে তাদের বেশিরভাগের বয়স ৫-১৮ বছর বয়সী। শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শফি আহমেদ বলেন, এবার আক্রান্তদের প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে দ্রুতই। এবারের পরিস্থিতি ২০১৯ সালের চেয়ে বেশি ভয়াবহ। কারণ নতুন বৈশিষ্ট্যর ডেঙ্গুর আবির্ভাব। যাতে বেড়েছে জটিলতা। একটু অসচেতন হলেই শক সিনডোমে চলে যাচ্ছে শিশুরা। জর কমলে অনেকটা রিলাক্স হয়ে যাই। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। তিন দিন আমাদের গুরুত্বর সঙ্গে দেখতে হবে। বাচ্চাটির হাত-পা কখনো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কিনা অথবা শারীরিক দুবর্লতা বা তার মাথা ঘুরছে কিনা এসব বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

শিশুদের জটিলতার পেছনে অনেক ক্ষেত্রে মা-বাবার অসচেতনকে দায়ী করছেন চিকিৎসকরা। জ¦রের প্রথম দিনেই চিকিৎসকের পরামর্শ না নেয়া, ব্যথানাশক ট্যাবলেট ও অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়ার পরামর্শ তাদের। এ বিষয়ে ঢাকা শিশু হাসপাতালের রোগতত্ত্ববিদ ডা. কিংকর ঘোষ বলেন, এ বছর ডেঙ্গুতে শুরুতেই তীব্র জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা ও বমির উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে পেটব্যথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জ্বর এলে অনেকে বাসায় বসে পরীক্ষা করছেন। তবে তারা জানেন না কয়দিনের জ্বরে কোনটা করা হবে। এটা কিন্তু অনেক সময় অভিভাবকেরা বোঝেন না। তখন জটিলতা বাসা থেকেই তৈরি হয়। হাসপাতালে এলে অনেক সময় ডাক্তারদের করার আর কিছুই থাকে না। তাই জ্বর হলে দ্রুতই হাসপাতালে এলে চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।

এদিকে গতকালের স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৫৫ জন। নতুন ভর্তি রোগীদের বেশিরভাগই ঢাকার বাসিন্দা। ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৩৩ জন এবং ঢাকার বাইরে ২২ জন রোগী। নতুন করে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন এক জন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মারা গেলেন ৪৯ জন। চলতি মাসে প্রথম তিন দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি ৮৮০ জন। মারা গেছেন ৭ জন। সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে হাসপাতালে ভর্তি ২৯৩ জনের বেশি। আগস্টে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭ হাজার ৬৯৮ জন। মারা গেছেন ৩০ জন। গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে শনাক্ত হন ২ হাজার ৬৫৮ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ২৫৭ জন।

ঢাকার ৪১টি হাসপাতালে এক হাজার ১২০ জন। অন্যান্য বিভাগে চিকিৎসাধীন ১৩৭ জন। চলতি বছরে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ২৩৬ জন। এদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়প্রাপ্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৯২৭ জন। লেলিন চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রধান কাজ হচ্ছে মশা নিয়ন্ত্রণ করা। বছরজুড়ে মশা নিধন করা দরকার ছিল, সেটি হয়নি। যদিও বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এবার ডেঙ্গু ভয়াবহ হবে।

কারণ সমীক্ষায় এডিস মশার উপস্থিতি অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু সিটি করপোরেশন কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। যখন ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে তখন ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও তা অপ্রতুল। এডিস মশার লার্ভা বা চারণভূমি কোনো কিছুই ধ্বংস করা হয়নি। মশার মারার ওষুধ কাজ করে না নগরবাসীর এই অভিযোগও আমলে নেয়া দরকার। ডেঙ্গু মশার চার ভাগের তিন ভাগই হচ্ছে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত স্থাপনায়। আর এক ভাগ বাসাবাড়িতে।

তাই সিটি করপোরশনকে সব জায়গায় একই সঙ্গে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালাতে হবে। নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। তিনি আরো বলেন, হাসপাতালে যে ভর্তি দেখি এটা এক-চতুর্থাংশ। ১০০ জন আক্রান্ত হলে ৮০ জনের কোনো উপসর্গ থাকে না। বাকি ১৫ জনের মধ্যে মৃদু ও মধ্যম উপসর্গ থাকবে। আর ৪-৫ জনের মধ্যে শরীরে তীব্র জ্বর থাকবে। হাসপাতালে ভর্তি হবে দুই থেকে চারজন। অর্থাৎ প্রকৃত রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।

নয়া শতাব্দী/এসএম

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়
বেটা ভার্সন
x