ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯, ১৭ মহররম ১৪৪৪

চ্যালেঞ্জ ছিল পাইলিং

প্রকাশনার সময়: ২৫ জুন ২০২২, ১৫:২১ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২২, ১৫:২৩
ফাইল ছবি

নানান প্রতিকূলতা পাশ কাটিয়ে অবশেষে নির্মাণ করা হয়েছে পদ্মা সেতু। কিন্তু নির্মাণের কোনো অংশে এর মানের সঙ্গে কখনই আপস করা হয়নি। রক্ষা করা হয়েছে বিশ্ব মানদণ্ড। পদ্মা সেতু নির্মাণে এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পাইলিং। কিছু জায়গায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দৈর্ঘ্যের পাইল দিয়েও মাটির নিচে শক্ত স্তর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না শক্ত স্তর। পরে স্কিন গ্রাউটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে বসানো হয় এসব পাইল। মজার বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি বিশ্বের কোথাও প্রয়োগ হয়নি, এমনকি কোনো পাঠ্যবইয়েও নেই।

প্রমত্তা পদ্মা কতটা ভয়ঙ্কর জানে এ দেশের মানুষ। তাই তো এখানে কেউ সেতু নির্মাণের কথা কখনো ভাবেনি। প্রতিটি সেতু বেস গ্রাউটিং বা ভিত্তির ওপর নির্ভর করে নির্মাণ করা হয়। যাতে, সেতু দেবে না যায়। পদ্মা সেতুতেও প্রথমে তেমনটাই ভাবা হয়। দৃশ্যমান এই সেতুতে ৪২টি পিলারের ওপর বসেছে ইস্পাতের ৪১টি স্প্যান। আবার, প্রতিটি পিলারের নিচে ৬২ মিলিমিটার পুরুত্ব তিন মিটার ব্যাসার্ধের পাইল রয়েছে কমপক্ষে সাতটি। সর্বোচ্চ ১২৫ দশমিক ৪৬ মিটার গভীরতা নিয়ে পাইল বসেছে ২৬৪টি। প্রতিটি পাইল ৮ হাজার ২৫০ টন ভার বহনে সক্ষম। এত গভীরে পাইল বসাতে আনা হয় ১ হাজার ৯০০ থেকে সাড়ে তিন হাজার কিলোজুল ক্ষমতার হাইড্রোলিক হ্যামার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এফ এম সাইফুল আমিন বলেন, ‘পৃথিবীর সর্বশক্তিমান হ্যামার দিয়ে সেই পাইল ড্রাইপ করতে গিয়েও দেখা যায় সমস্যাটা সমাধান করতে পারছি না। এক্ষেত্রে আমাদের কিছু নতুন টেকনিক অ্যাপ্লাই করতে হয়েছে। যেটাকে আমরা বলি স্কিল ফিকশন ইমপ্রুভ টেকনিক। যেটা স্টিল পাইলের ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোনো টেক্সট বুকে নেই।’

বলা হয়ে থাকে পদ্মা হলো আনপ্রেডিক্টেবল রিভার। যার কূল-কিনারা কেউ কখনো করতে পারেনি। যেটা দেখেছে এই নির্মাণে জড়িত দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা। পাইলিং করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকমের মাটি, নদীর বিভিন্ন রূপের কারণে মূল নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছে, পরিকল্পনা করতে হয়েছে।

সাধারণত মাটির গভীরে পাথর বা মাটির শক্ত স্তর না পাওয়া পর্যন্ত পাইলিং করতে হয়। কিন্তু মাওয়া প্রান্তে ৬ ও ৭ নম্বর খুঁটিতে পাইল করতে গিয়ে পাওয়া যায় মাটির নরম স্তর। ফলে এ প্রান্তে কাজ বন্ধ রাখে নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা।

পদ্মা সেতুর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘সেতুর ভিত্তি নির্মাণ করতেও কষ্টকর হয়েছে। তারপরে মাটির নিচে কী ধরনের মাটি আছে সেটা আমরা জানতাম না। আমরা কিছুটা ধরা খেয়েছি। নিচে ক্লেসহল চলে আসার জন্য।’

পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যখন দেখলাম সয়েলের ভিন্নতা পাওয়া গেল। তো আমরা যে ডিজাইন করেছিলাম সে ডিজাইন ২২টা পিয়ালে ভারবহন নিতে পারছে না এবং এই ডিজানটার মটিফিকেশনের প্রয়োজন হলো।’

এভাবেই ১৪টি পাইলের নিচে মেলে নরম মাটি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পিলারের গোড়ায় খাঁজকাটা পাইল দিয়ে অতিমিহি সিমেন্টের মিশ্রণে নরম মাটি শক্ত করার প্রযুক্তি স্কিন ফ্রিকশন গ্রাউটিংয়ের সিদ্ধান্ত আসে স্থপতি জামিলুর রেজা চৌধুরী ও সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে।

অধ্যাপক ড. এ এফ এম সাইফুল আমিন বলেন, ‘যত বেশি লেভিতে পাইলিং দিতে পারব তত আমি স্কিন ফ্রিকশন ক্যাপাসিটিটা বেশি পাব। কিন্তু বেশি লেন্থের পাইল দেয়ার কারিগরি সীমাবদ্ধতা বর্তমানে আছে। স্কিন ফ্রিকশন ক্যাপাসিটিটা বাড়ানোর জন্য কিছু কিছু পাইলে গ্রাউটিং করতে হয়েছে। তিন পাইলের মধ্যে এ ধরনের স্কিন গ্রাউটিং করাটা একদম নতুন ছিল।’

এদিকে পদ্মা সেতুর কোথাও কোথাও বসানো হয় অতিরিক্ত পাইল। মূল সেতুর ২২টি পিলারে বসে সাতটি করে পাইল।

পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে একটা ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের রুম বিশিষ্ট ৪০তলা বিল্ডিং যেরকম হয় একটা পাইল এ রকমই।’

পাইলিং জটিলতায় পিছিয়ে যায় কাজ। পরে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শুরু হয়ে পাইলিং শেষ হয় ২০১৯ সালে। আর পিলার বসানো শেষ হয় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

নয়া শতাব্দী/জেআই

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ